বৈষয়িক লাভালাভ নয় মনুষ্যত্ব অর্জনই যেনো মুখ্য হয়———মো. আলী আশরাফ খান


আমাদের জীবনের লক্ষ্য এবং এ জীবনে আমাদের করণীয় কি কি? বৈষয়িক লাভালাভের মধ্যেই কি আমরা মজে থাকবো? নাকি আমাদেরকে কর্মের মাধ্যমে মনুষ্যত্ব অর্জন করে ‘মানুষই শ্রেষ্ঠ’ তা প্রমাণ করতে হবে? এসব বিষয়ে এ লেখায় আজ কিছুটা আলোকপাত করার চেষ্টা করবো। প্রত্যেক মানুষকেই জীবনের শুরুতে অর্থ্যাৎ সাবালকত্ব অর্জন করার সঙ্গে সঙ্গে তার জীবনকে কিভাবে সাজাতে হবে এবং তার এ জীবনে ব্যক্তি, পারিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি কি কি দায়-দায়িত্ব-কর্তব্য ও করণীয়, এ সম্পর্কে বোঝা এবং এর যথাযথ সমাধানে জ্ঞানার্জন এবং সঠিক পথ নির্ধারণ করা অতিব জরুরি। এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোয় আমরা কি করবো, কিভাবে করবো এবং কখন কখন করবো এর একটা প্রাথমিক ছক আমাদেরকে এঁকে নিতে হবে-নিজেদের উন্নতির জন্যই। যদিও এ অঙ্কিত ছক সময়ের প্রয়োজনে সংযোজন ও বিয়োজন হওয়াই স্বাভাবিক-তবুও ছক এঁেকই সামনের দিকে তাকে এগিয়ে যেতে হবে।
পরীক্ষার প্রশ্নের উত্তর দিতে ‘জীবনের লক্ষ্য’ শীর্ষক রচনাটি পড়েননি এমন শিক্ষার্থী সম্ভবত খুঁজে পাওয়া বিরল। সকল শিক্ষার্থীকেই পরীক্ষার পূর্বে উচ্চকণ্ঠে মুখস্থ করতে দেখা যেত এ রচনাটি। পরীক্ষায় শুধু পাশ করাই নয়, তখন তার জীবনের লক্ষ্যও নির্ধারিত হয়ে যেতে-এ রচনা আয়ত্ব করতে গিয়ে। একেক জনের একেক লক্ষ্য। লক্ষ্যের বৈচিত্রতা ভিন্ন। কেউ হবে ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ উকিল, কেউ শিক্ষক, কেউ বিজ্ঞানী, কেউ বা পাইলট এঁটাই স্বাভাবিক। হ্যাঁ, এটা ভাবা কোনো অমূলক নয়। কিন্তু এর পাশাপাশি কি আরো কিছু ভাবতে পারে না তারা? তারা কি ভাবতে পারে না, বড় হয়ে সমাজসেবক, দেশপ্রেমিক, সমাজ-দেশ ও মানবজাতির জন্য এমন কিছু করে যাবে, যাতে মৃত্যুর পরও মানুষ এর সুফল ভোগ করতে পারেন এবং মানুষ তাদের মনে রাখবে-অনুশীলন করবে তাদের সৃজনশীল কর্মকে। মোটকথা, মানব কল্যাণে নিজেদের নিবেদিত করা কি তাদের জীবনের মূল লক্ষ্য হতে পারে না?
যতই দিন অতিবাহিত হচ্ছে ততই মানুষের দৈনন্দিন জীবন কঠিন ও কঠোর থেকে হচ্ছে কঠোরতম। মানুষ এখন সবকিছুতেই অর্থনৈতিক লাভালাভের ব্যাপারটি সর্বাগ্রে চিন্তা করছে। সকলের অবস্থান থেকে সকলেই লাভ আর লাভের বিষয়ে মরিয়া হয়ে ওঠছে। এখানে শুদ্ধ আর অশুদ্ধের যেনো কোনো বালাই নেই। যে যেমন পারছে বৈধ-অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জনের মহাপ্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছে। অভিভাবকরা যেমন তাদের সন্তান-সন্তুতিদের নিয়ে বিরাট বিরাট স্বপ্ন দেখছেন এবং কাড়ি কাড়ি টাকা কামাই করার জন্য উৎসাহিত করছেন, তেমনি সন্তানরাও অভিভাকদের প্রতি চাহিদার মাত্রা দিনে দিনে বাড়িয়ে দিচ্ছেন এবং নানান অজুহাতে খষিয়ে নিচ্ছেন অর্থকড়ি। কিন্তু কেউ তারা ভাবছেন না এ অসুস্থ চিন্তা ও অশুভ প্রতিযোগিতায় কখনো প্রকৃত মানুষ তৈরি হয় না-বেরিয়ে আসে না শুদ্ধ মানুষ এবং এপথে উপার্জিত অর্থও টেকসই হয় না। তারা ভেবে দেখছেন না যে, অর্থনৈতিক বিষয়টিকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে তারা হারিয়ে ফেলছেন মহামূল্যবান সম্পদ নিজেদের মনুষ্যত;¡ বিসর্জন দিচ্ছেন সততা, ন্যায়-নিষ্ঠা ও নীতিবোধকে।
অস্বীকার করার কি কোনো সুযোগ আছে, দেশজুড়ে যে আজ সামাজিক মূল্যবোধের হয়েছে চরম অবক্ষয়? হিংসা-অহংকার, সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজি, দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতি, চুরি-ডাকাতি, দলাদলি-হানাহানি, খুনাখুনিসহ সকল অপকর্মের চলছে হলিখেলা। মানুষ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, মনুষ্যত্ব-মানবতাবোধকে নিয়ে ভাবার সময় যেনো নেই কারো! কোনো শুদ্ধস্বপ্ন অনুশীলনের সুযোগ এখন পায় না কেউ! সকলের মধ্যেই কেমন যেনো একটা না পাওয়ার হাহাকার! যথেষ্ট থাকার পরেও পাইনি-খাইনির নাদানখুরী ভাব জেঁঁকে বসেছে মানুষের ঘাড়ে। জাতিকে এ রাহুরদশা থেকে মুক্ত হতে হলে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন অত্যাবশ্যকীয় হয়ে পড়েছে। জাতি বা সমাজ গঠনে বর্তমান ও পরবর্তী প্রজন্মকে নিয়ে একটা শুদ্ধ নকশা তৈরির অতিব প্রয়োজন হয়ে পড়েছে এখন। এ নকশা তৈরি ও বাস্তবায়নের জন্য কিছু ব্যতিক্রমী উদ্যোগি মানুষ খুঁজে বের করা জরুরি মনে করছি। ভয়ের কোনো কারণ নেই, এ কাজটি তেমন কোনো জটিল কিংবা কঠিন নয়। প্রথমে যে কেউ মডেল হিসেবে দাঁড়ালেই দেখা যাবে অন্যসব সৃষ্টিশীল লোকেরা ওই পতাকা তলে সমবেত হয়ে শুদ্ধ লোকের পাল্লা ভারি হতে শুরু করেছে। সুতরাং শুরু করার লোকটি পাঠক আপনিও হতে পারেন। আপনার জীবনের ব্রত হতে পারে সুন্দর ও আলোকময়। আপনি যদি মনে করেন, আপনি একজন ভালো মানুষের মডেল হয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেবেন, এটা অনায়াসে সম্ভব। আপনার ইচ্ছাশক্তি ও প্রকৃত মনুষ্যত্ববোধের জাগরণের মাধ্যমে এটা আপনি সহজেই করতে পারেন। আসুন, আমরা ‘বৈষয়িক লাভালাভ নয় মনুষ্যত্ব অর্জনই যেনো মুখ্য হয়’ এ ব্রত নিয়ে জীবনের বাকি ক’টা দিন কাটিয়ে দিই।
আমার কথা হলো, সন্তানদের নিয়ে অভিভাবকরা অবশ্যই স্বপ্ন দেখবেন। স্বপ্ন দেখবেন নিজেদেরকে নিয়েও। আপনার সন্তান ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, জর্জ-ব্যারিস্টার, পাইলট প্রভৃতি হবে, এমন স্বপ্ন দেখা দোষের কিছু নয়। কিন্তু এ স্বপ্নের সঙ্গে আপনি আপনার সন্তানদের মধ্যে প্রকৃত মনুষ্যত্ববোধকে যোগ করে দিতেই হবে। তারা যেনো প্রত্যেকেই তাদের দায়িত্ব-কর্তব্য, সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে নিজ কর্ম সম্পাদন করে-এ মন্ত্র তাদের পাঠ করিয়ে দিতে পারলে এবং তারা তা জীবনের সর্বক্ষেত্রে প্রয়োগ করলেই যেমন তারা সফল হবে তেমনি আপনিও সফল হতে পারবেন। তারা তাদের পেশাকে শুধু অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে নয়, দেশ-জাতি ও সমাজের কল্যাণের জন্য নিজেদের যখন নিবেদিত করবে তখন দেশের সর্বত্র যোগ হবে এক আলোর মিছিল। সমাজে থাকবে না কালো আধাঁর সর্বনাশের ঘনঘটা।
অভিভাবকদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে, আপনার সন্তান ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, ডিসি-এসপি, রাজনীতিবিদ-এমপি-মন্ত্রী প্রভৃতি হবে। ডাক্তার হবে প্রকৃতই মানুষের সেবা করার জন্য। উকিল পেশাটি গ্রহণ করবে সকল মানুষকে ন্যায় বিচার পাইয়ে দেবার জন্য। ডিসি-এসপি হবে সঠিক দায়িত্ব পালন করার মাধ্যমে দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতিমুক্ত সমাজ উপহার দেয়ার জন্য। রাজনীতিবিদ হবে সকল মানুষের অধিকার রক্ষায় বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর। এমপি-মন্ত্রী হবে সুশাসন ও গণতন্ত্র রক্ষার মাধ্যমে ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত সাম্যবাদের জন্যে। এমনি করে সকল পেশাই হবে জনকল্যাণার্থে। এতে মানবকল্যাণের পাশাপাশি সকলেরই অর্থনৈতিক অবস্থারও উন্নতি হবে-তা আমি হলফ করে বলতে পারি। আমার অনুরোধ সকলের প্রতি, আমরা যেনো আর মরীচিকার পিছনে না ঘুরে প্রকৃত মানুষ হওয়ার ব্রত গ্রহণ করি। আমাদের নিজেদের মধ্যে জ্বেলে দিই দ্বীপ্ত আলোকশিখা এবং আমাদের সন্তানদেরকেও বৈষয়িক লাভালাভ নয় প্রকৃত মনুষ্যত্ব অর্জনের শিক্ষা দিই।

লেখক: কবি,কলামিস্ট ও সংগঠক
গৌরীপুর, দাউদকান্দি, কুমিল্লা।

Check Also

মিনি ওয়াক-ইন-সেন্টারের মাধ্যমে রবি’র গ্রাহক সেবা সম্প্রসারণ

ঢাকা :– গ্রাহক সেবাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে মোবাইলফোন অপারেটর রবি আজিয়াটা লিমিটেড সম্প্রতি মিনি ওয়াক ...

Leave a Reply