মহাজোট সরকারের চার বছরঃ আ’লীগের শীর্ষ তিন নেতার কাছে জিম্মি ছিল সরাইলের প্রশাসন ও সাধারণ মানুষ

সরাইল / ১৭ নভেম্বর (কুমিল্লাওয়েব ডটকম)———-
আওয়ামীলীগ নিয়ন্ত্রিত মহাজোট সরকারের প্রায় চার বছর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল শাসন করেছেন স্থানীয় আওয়ামীলীগের শীর্ষ তিন নেতা। এলাকাবাসীর অভিযোগ, সদ্য বিলুপ্ত উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি আবদুল হালিম, সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান রফিক উদ্দিন ঠাকুর এবং সাংগঠনিক সম্পাদক মাহফুজ আলী এই তিন নেতার কাছে জিম্মি ছিল এখানকার প্রশাসন সহ সাধারণ মানুষ। থানাপুলিশ ছিল তাদের হাতের মুঠোয়। স্থানীয় মহাজোট সংসদ সদস্যও দাপুটে এই তিন নেতার সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে সরাইলে কোনো উন্নয়ন কর্মকান্ড করতে পারতেন না। কারণ আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই নেতারা এক শক্তিশালী বলয় গড়ে তোলেন। তাদের নানা তৎপরতায় সরাইল থমথমে হয়ে উঠেছিল। এমন অভিযোগ দলের ত্যাগী অনেক নেতা-কর্মীরও।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২১ অক্টোবর নিজ দলের নেতা খুনের মামলায় আসামি হয়ে দাপুটে এই নেতারা এখন পলাতক জীবন কাটাচ্ছেন। তিনজনই হারিয়েছেন দলীয় পদ। অপরদিকে ক্ষোভে ঘৃণায় সরাইলের বিক্ষুব্ধ মানুষ এসব নেতাদের ঘর-বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, আবদুল হালিম, রফিক উদ্দিন ঠাকুর ও মাহফুজ আলীর কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছিল এখানকার প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারী সহ এলাকার সহজ-সরল মানুষ। তাদের মনগড়া অনৈতিক সিদ্ধান্তের বাইরে সরকারী বিধি মোতাবেক কাজ করতে গিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী এই তিন নেতার হাতে নানাভাবে নাজেহাল হয়েছেন। তাদের দুর্বার অত্যাচারে দুই বছরে চারজন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বাধ্য হয়ে এখান থেকে বদলী নিয়ে অন্যত্র চলে যেতে হয়েছে। শুধু রফিক উদ্দিন ঠাকুরের হাতেই দু’জন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (বর্তমানে বদলী) লাঞ্ছিত হয়েছেন। এছাড়া আবদুল হালিম ও মাহফুজ আলী এবং তাদের লেলিয়ে দেয়া ক্যাডার বাহিনীর হাতে এখানকার প্রশাসনের বিভিন্ন দফতরের বেশকয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত সহ মারধোরের শিকার হয়েছেন। এসবের হাতেগোনা ক’টি ঘটনায় থানায় মামলা হলেও, বাকি ঘটনা তারা নিজেরাই ধামাচাপা দিয়েছেন। উপজেলার বিভিন্ন এলাকার সাধারণ মানুষ এখানকার সরকারি দফতর থেকে নাগরিক সুবিধা পেতে অনেকে এই তিন নেতার শরনাপন্ন হতে হয়েছে। অন্যতায় এসব মানুষ নানাভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন। উপজেলা আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি হাজী ইকবাল হোসেন জানান, হালিম, রফিক ও মাহফুজ আলী পুরো সরাইল নিয়ন্ত্রন করতো। স্থানীয় মহাজোট এমপিও এ নেতাদের নানা অনৈতিক কর্মকান্ডে ত্যক্ত-বিরক্ত ছিলেন। তাদের গোপন বৈঠক হতো সরাইল থানা কম্পাউন্ডে বসেই। থানার ওসি গিয়াস উদ্দিনের (সদ্য প্রত্যাহার হওয়া) সাথে এই আলোচিত তিন নেতার দহরমমহরম ছিল। ওসি গিয়াস উদ্দিন উপজেলা চেয়ারম্যান রফিক উদ্দিন ঠাকুরকে ‘বড় ভাই’ হিসেবে ডাকতেন। এ বড় ভাইয়ের ফোনে ওসি গিয়াস ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। অনেককে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে নানাভাবে শায়েস্তাও করেছে তারা।
যুবলীগ নেতা মো. শের আলম জানান, এই তিন নেতার হাতে জিম্মি ছিল এখানকার আওয়ামীলীগ রাজনীতিও। এসব নেতাদের সীমাহীন অপকর্ম ও দুর্নীতির প্রতিবাদ করতে গিয়ে প্রকাশ্যে রাজপথে নৃশংসভাবে খুন হন উপজেলা আওয়ামীলীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি এ.কে.এম ইকবাল আজাদ। ঘটনার পর আবদুল হালিম, রফিক উদ্দিন ঠাকুর, মাহফুজ আলীসহ অভিযুক্ত নেতারা উপজেলা আওয়ামীলীগ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। এই নেতাদের নানা অপকর্ম ও দুর্নীতির কথা এখন সরাইলের মানুষের মুখে মুখে। আওয়ামীলীগ নেতা অ্যাডভোকেট আশরাফ উদ্দিন মন্তু জানান, আলোচিত এ তিন নেতার নির্দিষ্ট কোন পেশা নেই। তারা রাজনীতিবিদ- এটাই তাদের বড় পরিচয় ছিল। আর এই পরিচয়কে পুঁজি করেই এলাকায় উন্নয়নে আসা সরকারের নানা বরাদ্দে লুটপাট, সরকারি মূল্যবান জায়গা দখল, টেন্ডারবাজি, সালিশ বৈঠকের নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে টাকা-পয়সা। এছাড়াও সরকারি পুকুর-জলাশয় ইজারা পাইয়ে দেয়ার কথা বলে অনেকের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়েছে তারা। সরকারি কর্মকর্তার বাসা, অফিস সবই ছিল তাদের দখলে। দলের ত্যাগী একাধিক নেতা ও স্থানীয় লোকেরা জানান, সভাপতি আবদুল হালিম ছিলেন সরাইলের বড় নেতা। আওয়ামীলীগ থেকে দুই বার মনোনয়ন পেয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচন করেছিলেন তিনি। এছাড়াও ২০০৮ সংসদ নির্বাচনে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে তিনি মহাজোট প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে ‘আনারস’ প্রতিক নিয়ে নির্বাচন করেন। কিন্তু কোনো নির্বাচনেই তিনি জয়লাভ করতে পারেননি। এলাকায় চাউর আছে, এসব নির্বাচনে হালিম বার বার ফেল মারলেও, অর্থনৈতিকভাবে তিনি লাভবান হয়েছেন ঠিকই। তাছাড়া টাকা পেলে আবদুল হালিম সব করতে পারেন। যে টাকা দিয়েছে তার পক্ষেই কাজ করেছেন তিনি। বিভিন্ন ভূয়া প্রকল্পের নামে টিআর-কাবিখার বরাদ্দ নিয়ে আত্মসাত করেছেন তিনি। চাহিদা মোতাবেক টিআর বরাদ্দ না দেওয়ায় মহিলা এমপিকে হুমকি দিয়েছেন এই নেতা। সর্বশেষ নিজ স্ত্রীর মৃত্যু বার্ষিকী অনুষ্ঠান করতে স্থানীয় এমপির কাছে টিআর বরাদ্দ চেয়ে বসেন তিনি। আওয়ামীলীগ নেতা অ্যাডভোকেট জয়নাল উদ্দিন জানান, ২০১১ সালের ২৯শে জুলাই উপজেলা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় সভাপতি আবদুল হালিমের বিরুদ্ধে পুকুর ইজারার নামে ৮০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ আনেন নিজ দলের তৃণমূল এক নেতা। তাছাড়াও ’৯৬ সালে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় থাকাকালে আবদুল হালিমকে আত্মসাত করা ৫২ টন চাল ফেরত দিতে বলা হয়েছিল।
এদিকে সর্বভূক নেতা বলে পরিচিত সদ্য বিলুপ্ত উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান রফিক উদ্দিন ঠাকুর। তার নানা অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে গত বছর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দেন এলাকার লোকেরা। এতে সরকারি সম্পদ দখল, ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে এলজিএসপি’র ৮৬ লাখ টাকা, টিআরের ৯৮ টন চাল আত্মসাত। সরাইল হাসপাতাল মোড়ে বেবিস্ট্যান্ড করার নামে সরকারি বরাদ্দ অপচয় লুটপাট। প্রাতঃবাজার বেবিস্ট্যান্ড নির্মাণে অর্থ বাণিজ্য এবং শহীদ মিনার থেকে উপজেলা পরিষদ পর্যন্ত সড়ক নির্মাণের নামে মোটা অঙ্কের টাকা আত্মসাতের অভিযোগও আছে তার বিরুদ্ধে। গত বছর জেলা পরিষদ ডাক বাংলোর পেছনে উপজেলা চেয়ারম্যান কোটি টাকা ব্যায়ে নতুন বাড়ি করেছেন। তার বাড়ির সামনে জেলা পরিষদের ২০ ফুট জায়গা দখল করে নিয়েছেন তিনি। তার একটি বয়লার লেয়ার পোল্ট্রি ফার্মে দেড় লাখ টাকা বিদুৎ বিল বকেয়া থাকলেও, এই বকেয়া বিল আদায় করতে এখানকার বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ সাহস পায়নি। রফিক উদ্দিন ঠাকুর উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর তার স্বজনরা টেন্ডারবাজি সহ নানা উন্নয়ন খাতে লুটপাটে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। উপজেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতেও তাদের স্থান করে দেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা চেয়ারম্যানের সকল দু’নম্বরি কাজে সহায়তা করতেন উপজেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ম সম্পাদক ও সদর ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল জব্বার। রফিক উদ্দিন ঠাকুরের বিভিন্ন কর্মকান্ডের অবৈধ টাকা-পয়সা লেনদেন করতেন আব্দুল জব্বার। নিজের স্বার্থ হাসিলে উপজেলা পরিষদের দুই ভাইস চেয়ারম্যানকেও কোণঠাসা করেন রফিক উদ্দিন ঠাকুর। মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান মাহমুদা পারভীন বলেন, এই ৪ বছরে উপজেলা চেয়ারম্যান আমাদের নিয়ে কোন পরামর্শ-পরিকল্পনা করেননি। উপজেলা পরিষদের সব কিছু থেকেই তিনি আমাদেরকে বঞ্চিত রেখেছেন। এমনকি উপজেলার বিভিন্ন কমিটি থেকেও আমাদের দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে। জলমহাল কমিটিতে আমাদের দুই ভাইস চেয়ারম্যানকে বাদ দিয়ে অন্যদের রাখা হয়।
এদিকে অপর শীর্ষ নেতা মাহফুজ আলী উপজেলা প্রশাসনের নানা দফতরে একছত্র আধিপত্য গড়ে তোলে। জানা গেছে, তার সকল অপকর্মের মদদ দিতেন আবদুল হালিম ও রফিক উদ্দিন ঠাকুর। মাহফুজ আলীর দাপুটে এখানকার সরকারি দফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তটস্থ ছিলেন। নিজে একটি সরকারি অফিসে বসেই বিভিন্ন দপ্তরের সরকারি কর্মকর্তাদের খবরদারি করতেন তিনি। টেন্ডার থেকে শুরু করে সব বাগ-বাটোয়ারার নেতৃত্বে থাকতেন মাহফুজ আলী। সরকারি বিভিন্ন অনুষ্ঠান কিভাবে হবে সেটাও ঠিক করে দিতেন তিনি। প্রাইমারি স্কুলের গন্ডি পেরোতে না পারলেও মাহফুজ আলী স্থানীয় এমপির সহযোগিতা নিয়ে সরাইল ডিগ্রি কলেজের হিতৈষী সদস্য পদ দখল করেন। শুধু তাই নয়, তিনি উপজেলা এসি ল্যান্ডের জন্য বরাদ্দ করা সরকারি বাসায় পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন। উপজেলা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হওয়ার পাশাপাশি তিনি যুবলীগের আহবায়ক পদও আকঁড়ে ধরে রাখেন। এলাকার নানা শ্রেণী পেশার মানুষের দাবি, শুধু রাজনৈতিক নেতারা নয়, এসব নেতাদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছিল এখানকার অনেক সাধারণ মানুষসহ সরকারি দফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারী। আজ তারা মাঠে নেই, তাই অনেকে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন। এসব নেতাদের অচিরেই দৃষ্টান্তমূলক বিচার করবে সরকার এ প্রত্যাশাই এখন সরাইলবাসীর।

আরিফুল ইসলাম সুমন

Check Also

দেবিদ্বারে অগ্নিকান্ডে ১কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি

দেবিদ্বার প্রতিনিধিঃ– কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার ফতেহাবাদ ইউনিয়নের জগন্নাথপুর গ্রামে রান্না ঘরের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরনে ১৫টি ...

Leave a Reply