জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষায় অনৈতিকতা ও শিক্ষার মান ——————-মো. আলী আশরাফ খান

আমরা যেহেতু শিক্ষার মান সংরক্ষণ ও নকল প্রতিরোধ আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে প্রায় ১ যুগ ধরে বৃহত্তর দাউদকান্দিতে কাজ করছি, সেহেতু বাংলাদেশ তথা বৃহত্তর দাউদকান্দির শিক্ষাক্ষেত্র সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা রাখার চেষ্টা করে আসছি। পাঠক নিশ্চয়ই অবগত আছেন, এ যাবৎ প্রায় ১ ডজন শিক্ষানীতি বিভিন্ন সময়ে সময়ে এদেশের সরকার প্রণয়ন করেছেন; করেছেন সংযোজন ও বিয়োজন। আসলে এতে করে আমাদের মূল শিক্ষাক্ষেত্রটির তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নয়ন আমরা দেখছি না; যদিও সরকার থেকে বেশ পরিবর্তন করা হয়েছে এক্ষেত্রটিকে, আসলে কাজের কাজ তেমন যে একটা হয়নি-হচ্ছেনা তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
একটু গভীরে গিয়ে বললে, দেশের শিক্ষার মান যে উন্নয়ন হয়নি এটির বাস্তব প্রমাণ আমাদের লেজুরভিত্তিক শিক্ষানীতি ও আমলাতান্ত্রীক জটিলতা। আমরা মনে করি, জেএসসি-জেডিসি’র মত একটি পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠানের পূর্বে সরকারকে আরো প্রস্তুতি নেওয়ার প্রয়োজন ছিল। যদিও গত বছরের ন্যায় এবারও দেশব্যাপি অনুষ্ঠিত হল জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষা-২০১২। এ নতুন ধারার পরীক্ষাটি ছাত্র-শিক্ষকদের জন্য যেমন নতুন ও ব্যতিক্রমী তেমনি অভিভাবকদের জন্যও ছিল ভাবনার বিষয়। তারপরও সরকারের আন্তরিকতায় দ্বিতীয় বারের মত এ পরীক্ষা অনুষ্ঠান আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রের কিছুটা হলেও অগ্রগতি হয়েছে তা বলা যায়। কিন্তু গত বছরের মতো এবারো দেশের ভিবিন্ন স্থানে এ অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় ঘটেছে নানা রকম অপ্রীতিকর ঘটনা। আমরা লক্ষ্য করেছি, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মাঝে অসুদপায় অবলম্বনের একরকম অশুভ প্রতিযোগিতা। আমরা পত্র-পত্রিকায় এবং বাস্তÍবেও দেখেছি, দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ কিছু পরীক্ষার্থী ও শিক্ষক বহিস্কারের ঘটনা ঘটেছে। যা সত্যিকার অর্থে আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রের জন্য চরম লজ্জার বিষয়।
দেশের অন্যান্য স্থানের মতো দাউদকান্দি, তিতাস ও মেঘনায়ও এবারের জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষায় বিভিন্ন পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোয় বিস্তর অনিয়ম লক্ষ্য করা গেছে। একযোগে দেশে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে ৪ নভেম্বর পরীক্ষা শুরুর পর থেকেই বিশেষ করে মাদরাসা কেন্দ্রগুলোতে অনিয়ম ছিল উল্লেখ্য করার মতো। দাউদকান্দি উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ আনোয়ারুল নাসের বরাবরই শিক্ষার প্রতি আন্তরিক হওয়ার কারণে প্রতি বছরের ন্যায় এবারো এ পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠানের পূর্বে শিক্ষার মান সংরক্ষণ ও নকল প্রতিরোধ আন্দোলনের আহ্বায়ক ও কিছু বস্তু-নিষ্ঠু সাংবাদিকদের অনুমতি দিয়ে দিয়েছিলেন পরীক্ষা কেন্দ্রগুলো পরিদর্শনের জন্য। তারা পরীক্ষা কেন্দগুল্রো পরিদর্শণ-পর্যবেক্ষণ করার সময় বেশ কিছু অপ্রত্যাশিত তথ্য সংগ্রহ করেন স্থির চিত্রসহ।
প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয়, উপজেলার পাচঁগাছিয়া ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ের ভ্যানু কেন্দ্র কাউয়াদি মাদরাসায় গিয়ে দেখা যায়, একই স্কুলের পরীক্ষার্থী ও শিক্ষকের মিলন মেলা! যদিও নিয়ম অনুযায়ি যে স্কুলের পরীক্ষার্থী সে স্কুলের শিক্ষক পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। কিন্তু তাদের বেলায় এটা দোষের কিছু ছিল না! শুধু এটাই নয়, ওই কেন্দ্রটিও ছিল দাউদকান্দির একেবারেই শেষ প্রান্তে। যার ফলে দূরবর্তী শিক্ষার্থীদের ওই কেন্দ্রে যাওয়া আসা ছিল বেশ কষ্টসাধ্য। এরপর দাউদকান্দি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ভ্যানুকেন্দ্র দাউদকান্দি আমেনা সুলতান বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সদস্যগণ কেন্দ্রে বেপরোয়াভাবে গমণ অতঃপর পরীক্ষার পরিবেশ নষ্ট করতে দেখা গেছে। গৌরীপুর সুবল-আফতাব উচ্চ বিদ্যালয়ের ভ্যানু কেন্দ্র গৌরীপুর বিলকিস-মোশাররফ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে অসদুপায় অবলম্বনের জন্য ছাত্র-শিক্ষক অর্থাৎ পিতা-পুত্রকে বহিস্কারের ঘটনাটি ছিল অত্যন্ত লজ্জাজনক। ইলিয়টগঞ্জ রা.বি উচ্চ বিদ্যালয়ের ভ্যানু কেন্দ্র ইলিয়টগঞ্জ ড.খন্দকার মোশররফ হোসেন কলেজ, বরকোটা স্কুল এন্ড কলেজের ভ্যানু কেন্দ্র শ্রিচাইল মোহাম্মদপুর ইসলামিয়া মাদরাসা, পাঁচগাছিয়া ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়, দাউদকান্দি মদিনাতুল উলূম সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসা, সিংগুলা ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা, দশপাড়া হযরত কবিরউদ্দিন কামিল মাদ্রাসা, পিপুইয়াকান্দি আমানুল উলূম সিনিয়র মাদ্রাসায় তিনজন বহিস্কারসহ পরীক্ষা চলাকালীন প্রায় প্রতিটি কেন্দ্রের অবস্থা ছিল নাজুক। পরীক্ষার্থীরা একে অপরের খাতা দেখে লেখাই নয়, শিক্ষকরা পর্যন্ত পরীক্ষায় নানা ভাবে সহযোগিতা করতে দেখা গেছে। সর্বশেষ তিতাসে ছাত্র-শিক্ষক বহিস্কারের ঘটনাই প্রমাণ করে এবারের পরিক্ষায় অনৈকতায় ডুব দিয়ে ছিল কিছু অসাধু ছাত্র-শিক্ষক।
মোটকথা, দাউদকান্দি, মেঘনা ও তিতাস উপজেলার প্রায় সবক’টি পরীক্ষা কেন্দ্রের অবস্থা একই রকম ছিল। ওইসব পরীক্ষা কেন্দ্রে পাশের হার বাড়ানোর লক্ষ্যে শিক্ষকরা মরিয়া হয়ে এ অনৈতিক পন্থা অবলম্বন করেন। এছাড়াও দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধি ও হল সুপারগণ কোনো কোনো ক্ষেত্রে সঠিক দায়িত্ব পালন করেননি বলে অভিযোগ উঠেছে। পরীক্ষার্থীরা একে অপরের খাতা দেখে লিখলে এবং শিক্ষকগণ অনিয়ম করলেও তারা উল্লে¬খযোগ্য কোনো ভূমিকা নেননি। সুধীজন ছাত্র-শিক্ষকদের এসব অনৈতিকতার বিষয় নিয়ে অত্যন্ত হতাশা ব্যক্ত করেন। তারা মনে করেন, ছাত্রদের পাশাপাশি শিক্ষকরা যে অসদুপায় অবলম্বন করছেন এতে করে আবারো প্রমাণিত হয়, আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রটিকে চরমভাবে কলুষিত করছে-এসব দুর্নীতিবাজ শিক্ষকরা। শিক্ষকতা মহান পেশাটিকে তারা পদদলিত করে নিজেরাই নিজেদের পায়ে কুঠারাঘাত করেছেন।
আমরা যতটুকু দেখেছি, বিশেষ করে ৮০ দশকের পর নকলের মহোৎসব শুরু হয় এ দেশে। এ ব্যাধি একপর্যায়ে আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রে এক ভয়াবহ রূপ নেয়। পুরো জাতির ললাটে কলঙ্ক লেপন করে মহাবিপর্যয়ে পর্যবসিত করে। এ বিপর্যয় থেকে উত্তরণে আইনও প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু ওই আইনটির যথাযথ প্রয়োগ হয়নি। যার ফলে, ছাত্রছাত্রীদের প্রকৃত মেধা ও মননের বিকাশ ঘটেনি, আমরা পৌঁছতে পারিনি কাঙ্খিত লক্ষ্যে। ওই দীর্ঘসময়ে আমাদের দেশের শিক্ষার মান অনেকটা পিছিয়ে পড়েছিল। লজ্জাকর পরিস্থিতির স্বীকার হয়েছিল, ছাত্র-শিক্ষক, অভিভাবক এবং রাষ্ট্রীয় কর্ণধাররাও। আর শিক্ষার এ অবক্ষয়ে আমরা অনেকেই ছাত্রছাত্রীদেরকে দায়ি করতাম। অথচ, এর জন্য অভিভাবক, শিক্ষক সর্বোপরি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও আমলাতান্ত্রীকতাই দায়ি ছিল। এদেশের ভ্রান্তধারার রাজনীতি চর্চার ফলেই প্রায় সকল ক্ষেত্রের মত শিক্ষা ক্ষেত্রেরও বারোটা বেজেছিল। রাজনীতির ছত্রছায়ায় ব্যক্তি-দল এবং যারা ক্ষমতায় আসীন হয়েছিল, তারাও ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করতে সাধারণ জনগণকে এমন কিছু অপকৌশলের জালে আবদ্ধ করে ফেলেছিলে, যা থেকে বের হওযা সম্ভব হয়নি। যদিও ভালো কাজ করতে কোনো ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান বা প্রশাসনের কেউ এগিয়ে আসেন. তাকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়, কোনো ক্ষেত্রে বিপন্ন্ পর্যন্ত হয় তাদের জীবন।
তবে নকল প্রতিরোধ তথা বন্ধের ক্ষেত্রে ওইসময়ে সরকারের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। সরকারের পাশপাশি এ ক্ষেত্রে ‘ছাত্রবন্ধু মিয়া আবদুলল¬াহ ওয়াজেদ’-এর কথা বলতেই হয়। তিনি ব্যবসায়ী হয়েও দেশের শিক্ষাক্ষেত্রকে মহাবিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে নকলমুক্ত পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠানের পরিবেশ সৃষ্টির জন্য ১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ দেশব্যাপি জোরালো আন্দোলন শুরু করেছিলেন। এর ফলে এবং সরকারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সম্ভব হয়েছিল দেশে নকলমুক্ত পরীক্ষা অনুষ্ঠানের পরিবেশ সৃষ্টি করার। এরপর থেকেই পাবলিক পরীক্ষায় নকল প্রবণতা হ্রাসের সঙ্গে সঙ্গে বহিস্কারের সংখ্যাও অনেকে কমে গেছে। অন্যদিকে বাড়ছে পাসের হার এবং জিপি-এ-৫। বাড়ছে মেয়ে পরীক্ষার্থীর সংখ্যাও। আশার কথা হলো, এবার জেএসসি/জেডিসিতে উল্লে¬খযোগ্য পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছে। যা আমাদের জন্য অত্যন্ত সুসংবাদ বহন করে।
যদিও নকল বিরোধী আন্দোলন শুরু হবার পর প্রথম কয়েক বছর এসএসসি’র ফলাফল খারাপ হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে আমরা ভাল ফলাফল পেয়েছি-পাচ্ছি। যা দেশ ও জাতির জন্য এক নতুন মাত্রার যোগ করেছে। ধীরে ধীরে এখন তো অভাবনীয় পর্যায়ে এসেছে। এতে সহজেই বোঝা যায়, শিক্ষার্থীরা আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় এখন পাঠে অধিক মনোযোগি। সঙ্গে সঙ্গে নকল প্রবণতা কমার কারণে বহিস্কারের সংখ্যাও অনেক কমে গেছে। যা আমাদের আশার আলো দেখাচ্ছে। যদিও আমরা ’৯৯ সাল থেকে শিক্ষার উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছি কিন্তু ২০০২-’০৩ সাল থেকে আমরা দাউদকান্দির প্রায় পরীক্ষা কেন্দ্র পরিদর্শন করছি। ওইসময় কিছু কিছু ক্ষেত্রে কিছু অনিয়ম লক্ষ্য করলেও ২০০৬ সাল থেকে ’১০ ইং সাল পর্যন্ত প্রায় নকলমুক্ত পরিবেশে ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষা দিতে দেখা গেছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত সকলেই সঠিক দায়িত্ব পালন করেছেন।
কিন্তু ২০১০,’১১ ও ’১২-এর পরীক্ষাগুলোয় এসে বেশ কিছু অনিয়ম লক্ষ্য করছি আমরা। আমরা আশা করবো, আসছে ২১ নভেম্বর দেশব্যাপি সমাপনী ও নিকটবর্তী এসএসসি পরীক্ষার ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা যেনো সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে স্ব-স্ব দায়িত্ব পালন করেন। দাউদকান্দি, তিতাস ও মেঘনার সবক’টি কেন্দ্রের কর্তাব্যক্তিরা কোনো অনিয়ম-অনৈতিকতার আশ্রয় নেবেন না বলেই আমাদের বিশ্বাস। আমরা চাই, সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দাউদকান্দি, তিতাস ও মেঘনার শিক্ষার পরিবেশ ও শিক্ষার মান এমন একটি পর্যায়ে উন্নীত হোক -যেনো সমগ্র দেশবাসী আমাদেরকে নিয়ে গর্ব করতে পারে।

লেখকঃ আহ্বায়ক,
শিক্ষার মান সংরক্ষণ ও নকল প্রতিরোধ আন্দোলন
বৃহত্তর দাউদকান্দি, কুমিল্লা।

Check Also

আজ শোকাবহ ১৫ আগস্ট : বাঙালির অশ্রু ঝরার দিন

  কুমিল্লাওয়েব ডেস্ক:– আজ শোকাবহ ১৫ আগস্ট। জাতীয় শোক দিবস। বাঙালির অশ্রু ঝরার দিন। ১৯৭৫ ...

Leave a Reply