লুটপাট আর টেন্ডারবাজির প্রতিবাদ করতে গিয়েই খুন হন সরাইলের আওয়ামীলীগ নেতা ইকবাল আজাদ

ব্রাহ্মণবাড়িয়া / ৩ নভেম্বর (কুমিল্লাওয়েব ডটকম)———-
৭৩ সালের পর ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে আর ক্ষমতার শ্বাদ পায়নি আওয়ামীলীগ। সর্বশেষ ২০০৮ এর নির্বাচনে এখান থেকে বিজয়ী হন জাতীয় পার্টি দলীয় মহাজোট প্রার্থী অ্যাডভোকেট জিয়াউল হক মৃধা। কিন্তু ক্ষমতার চার বছরে তাঁকে সিড়ি করে টেন্ডারবাজি, লুটপাট, দুর্নীতিসহ নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়ে সরাইল আওয়ামীলীগ নেতারা। উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক এবং সাংগঠনিক সম্পাদকের বিরুদ্ধে রয়েছে অনিয়মের এন্তার অভিযোগ। তৃণমুল নেতাকর্মীদের অভিযোগ, তাদের কাছে জিম্মি ছিল এখানকার আওয়ামীলীগের রাজনীতি। সর্বশেষ গত ২১ অক্টোবর উপজেলা আওয়ামীলীগের সিনিয়র সহসভাপতি এ.কে.এম ইকবাল আজাদকে আগাম ঘোষনা দিয়ে খুন করে নিজ দলের নেতা-কর্মীরা। এ ঘটনায় ওই তিন নেতাসহ আওয়ামীলীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ নেতাদের আসামী করে মামলা দেন নিহতের ছোট ভাই জাহাঙ্গীর আজাদ। এ খুনের প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠে পুরো সরাইল। পরে জেলা ও কেন্দ্রের শীর্ষ নেতারা এ খুনের সাথে জড়িতদের দল থেকে বহিস্কার সহ সরাইল আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের সকল কার্যক্রম স্থগিত করেন। অপরদিকে নিহত নেতার পরিবার এবং অনুসারীদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ নামধারী দুর্নীতিবাজদের অপকর্ম আর দুর্নীতির প্রতিবাদ করতে গিয়েই খুন হন ইকবাল আজাদ। তিনি ছিলেন আওয়ামী রাজনীতির মূল ধারার অনুসারী। তাছাড়া আগামী সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন তিনি।
সাবেক ছাত্রলীগ নেতা অ্যাডভোকেট জয়নাল উদ্দিন বলেন, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল হালিম, সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান রফিক উদ্দিন ঠাকুর, সাংগঠনিক সম্পাদক মাহফুজ আলী নানা কর্মকান্ডে অনিয়ম-দুর্নীতির রামরাজত্ব কায়েম করেছিল। তাদের সীমাহীন দুর্নীতিতে সাধারণ মানুষসহ ত্যাগী নেতা-কর্মীরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠে। ইকবাল আজাদ দলীয় কাজে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গেলেই তৃণমূল নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা এসব বিষয় নিয়ে প্রায়ই ক্ষোভ প্রকাশ করতেন। তিনি আরো বলেন, স্থানীয় এমপির বরাদ্দের টিআর, কাবিখা খাদ্যশস্য নিয়ে হেরফের এবং সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয়েছে। তাছাড়া ইকবাল আজাদ নিহত হলে একবার লোক দেখাতে ফুল নিয়ে আসলেও পরে এই বিষয়ে আর কোন খোঁজই নেননি মহাজোটের এই এমপি। কারণ একসময় খুনিরা ছিল তার প্রশ্রয়ে।
সদ্য বিলুপ্ত যুবলীগের প্রথম যুগ্ম আহবায়ক অ্যাডভোকেট আশরাফ উদ্দিন মন্তু বলেন, উপজেলার শীর্ষ তিন দুর্নীতিবাজের মধ্যে বিশেষ করে মাহফুজ আলীর সাথে স্থানীয় এমপির দহরমমহরম ছিল। আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বোর্ডের নীতিমালা ছুঁড়ে ফেলে স্বজনপ্রীতি ও নানা অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে ছোট ভাইকে সরাইল ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ বানিয়েছেন মহাজোট এমপি জিয়াউল হক মৃধা। তার এ কাজে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছে মাহফুজ আলী, আব্দুল হালিম ও রফিক উদ্দিন ঠাকুর। উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি ইকবাল আজাদ খুন হলেও, মহাজোটের এই এমপি একেবারে নীরব। যেদিন ইকবাল আজাদ খুন হন, সেদিন এমপি এলাকাতেই ছিলেন। কিন্তু অজানা কারণে তিনি ইকবাল আজাদকে দেখতে হাসপাতালে যাননি। জেলা শহরে নিহত নেতার জানাযায়ও তিনি যাননি। সরাইলের জানাযায় তিনি আসলেও পরবর্তীতে নিহতের পরিবারকে সান্তনা কিংবা এ বিষয়ে কোন কিছুতেই এমপিকে দেখা যায়নি। কিন্তু ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য র.আ.ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীসহ জেলা ও উপজেলার বহু নেতা-কর্মী নিহতের পরিবারের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। এখানকার আওয়ামী রাজনীতির অনেক ত্যাগী নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের দাবি, আওয়ামী লীগের কাঁধে ভর করেই জিয়াউল হক মৃধা এমপি হয়েছেন। আওয়ামী লীগের জনপ্রিয় নেতা ইকবাল আজাদ দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে নৃশংসভাবে খুন হন। অথচ মহাজোটের এই এমপি এ বিষয়ে একেবারে নীরব হয়ে পড়েছেন। এ খুনের সাথে যারা জড়িত একসময় তাদের সাথে এমপির ব্যক্তিগত সু-সম্পর্ক ছিল। এমপির বরাদ্দের বেশিরভাগ টিআর কাবিখাসহ নানা অর্থ তারাই ভাগিয়ে নিতেন। তারা আজ মাঠে নেই। তাহলে কি এমপি, যারা খুনের দায়ে এলাকা ছেড়েছেন তাদের শোকে কাতর হয়ে নীরবতা পালন করছেন। এসব কথাই এখন সরাইলের সর্বত্রই আলোচনা হচ্ছে। এদিকে সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট জিয়াউল হক মৃধার ঘনিষ্ঠ এক সূত্র জানিয়েছে, তিনি নিরাপত্তাজনিত কারণে এ বিষয়ে তেমন খোঁজখবর নিতে পারছেন না। এ ঘটনায় তিনি নিজেও অনেকটা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে আছেন। ওইদিন গভীররাতে তিনি সদর হাসপাতালে গিয়ে নিহত ইকবাল আজাদের লাশ দেখে এসেছেন।

আরিফুল ইসলাম সুমন

Check Also

কুমিল্লায় তিন গৃহহীন নতুন ঘর পেল

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ– কুমিল্লা সদর উপজেলায় গ্রামীণ উন্নয়ন সংস্থার উদ্যোগে ৪নং আমড়াতলী ইউনিয়নের গৃহহীন নুরজাহান বেগম, ...

Leave a Reply