হলমার্ক গ্রুপের তানভীর সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য উপদেষ্টার দেওয়া বক্তব্যের মিল খোঁজে পাচ্ছেন না এলাকাবাসী

ব্রাহ্মণবাড়িয়া/ ৯ অক্টোবর (কুমিল্লাওয়েব ডটকম)———-
কয়েকমাস আগে হলমার্কের তানভীর মাহমুদ তফসির ও তার স্ত্রী জেসমিন ইসলামের এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠান হয়েছিল তাদের গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আশুগঞ্জ উপজেলার তারুয়া এলাকায়। সেই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হয়ে এসেছিলেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য উপদেষ্টা সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য উপদেষ্টা গ্রামবাসীর কাছে তানভীর ও তার স্ত্রী জেসমিন ইসলামকে নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দিয়ে তাদের দু’জনকে সোনার মেডেল পড়িয়ে দেন। এসময় তিনি বলেছিলেন, এই গ্রামের কৃতি সন্তান তানভীর মাহমুদ তফসির হলমার্ক গ্রুপের এমডি এবং তার স্ত্রী জেসমিন ইসলাম এই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান। হলমার্ক দেশের গার্মেন্ট শিল্পে বিশেষ অবদান রেখেছে। ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠানটি জাতীয় পুরস্কারও অর্জন করেছে। তারা কয়েক হাজার বেকার ছেলেমেয়ের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে এবং দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। তানভীর ও হলমার্ক সম্পর্কে সৈয়দ মোদাচ্ছের আলীর সেই কথাগুলো নিয়ে তারুয়া গ্রামবাসীদের মধ্যে চলছে নানা মুখরোচক আলোচনা সমালোচনা। এখন অনেকে প্রকাশ্যেই বলছেন ওই অনুষ্ঠানে তানভীর মাহমুদ ও তার স্ত্রী সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য উপদেষ্টার দেওয়া বক্তব্যের সাথে তানভীরের বর্তমান পরিস্থিতির কোনো মিল খোঁজে পাচ্ছেন না তারা।

মঙ্গলবার (৯ অক্টোবর) আশুগঞ্জের তারুয়ায় গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের সর্বত্রই আলোচনার মূল বিষয় ছিল তানভীর ও তার স্ত্রী জেসমিন ইসলামকে নিয়েই । এসময় অনেককে বলতে দেখা গেছে, হাজার কোটি টাকার ব্যাংক জালিয়াতির ঘটনায় শুধু তানভীর একা দায়ী নয়, অবশ্যই এর নেপথ্যে অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত রয়েছে । জাহাঙ্গীর আলম নামে এক ব্যক্তি উদাহারণ টেনে বলেন, লাখ টাকার সম্পত্তির কাগজপত্র ব্যাংকে জমা রেখে হাজার টাকা ঋণ নিতে অনেকের কাছে ধর্ণা দিতে হয়। আর হাজার কোটি টাকা ঋণ, বাপরে……। তারুয়া ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. রাহুল হক বলেন, তানভীর মাহমুদ এ গ্রামের সন্তান হিসেবে আমরা তাকে ভাল মানুষ হিসেবে জানি। তিনি গ্রামের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অনেক অনুদান দিয়েছেন। গরীবের সহায়তায় এগিয়ে আসেন তিনি। এ টাকা কোথা থেকে এসেছে তা আমরা খতিয়ে দেখেনি। এদিকে এলাকাবাসী অনেকেই জানান, তানভীরের সঙ্গে মন্ত্রী, এমপিসহ অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের উঠবস ছিল। এ গ্রামে তার সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর উপদেস্টা সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী প্রধান অতিথি হয়ে এসেছিলেন। এ অনুষ্ঠানে স্থানীয় মহাজোট এমপি জাপার কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জিয়াউল হক মৃধা সহ প্রশসানের কয়েকজন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। স্থানীয় এমপির সাথে তানভীরের ঘনিষ্টতা ছিল। এদিকে রবিবার রাতে তানভীর গ্রেফতার, হাজার কোটি টাকা জালিয়াতির ঘটনা স্বীকার ও পরবর্তীতে তাকে পুলিশ রিমান্ডে নেওয়ার খবর বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে দেখেছে গ্রামবাসী। গ্রামের যাদের সাথে কথা হয়েছে তাদের একই কথা । এ এলাকার সন্তান তানভীর মাহমুদ। সে বুদ্ধি খাটিয়ে ঋণ নিয়েছে। এতে যদি দোষ হয়ে থাকে তাহলে ঋণকারী প্রতিষ্ঠান সহ অনেকেই এ জালিয়াতির সাথে জড়িত। তারাও সমান দোষী। তাদেরকেও বিচারের আওতায় আনতে হবে। গ্রামে তানভীরের বিলাসবহুল বাড়ির আলীশান ভবনে তালা ঝুলছে। তার পিতা নূরুল ইসলাম কালু মিয়া কয়েকদিন আগে হজ্ব পালনে সৌদি আরব গিয়েছেন বলে প্রতিবেশী লোকেরা জানিয়েছেন। এ বাড়িটি এখন স্থানীয় মসজিদের ইমাম মাওলানা মো. রহমতউল্লা দেখা শোনা করছেন। তানভীরের মা মারা গেছেন অনুমান ৬/৭ বছর আগে। তার ভাই মাহবুবুল আলম হলমার্ক গ্রুপের পরিচালক হিসেবে কর্মরত। তিন বোন শিউলী, পারুল ও নাসরিন বেগমকে আশুগঞ্জ উপজেলার মধ্যেই বিয়ে দেওয়া হয়েছে। তারা সকলেই যার যার শ্বশুরবাড়িতে থাকেন। তানভীর মাহমুদের আত্মীয়স্বজনরা এ বিষয়ে মুখ খুলতে নারাজ। তারুয়া ইউনিয়ন পরিষদের ৪ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. নোয়াব মিয়া বলেন, গ্রামে তানভীর নয় তাকে সকলে তফসির হিসেবেই চিনেন। আমরা জানি সে ভাল মানুষ। এ গ্রামের সন্তান জালিয়াতির দায়ে গ্রেফতার হয়েছে এতে আমরা সকলেই দুঃখ পেয়েছি। তিনি বলেন, হাজার হাজার কোটি টাকা জালিয়াতি হয়ে থাকলে তা একদিনে হয়নি।

আর এ জালিয়াতি তফসির একা করেনি। সংশ্লিস্ট ব্যাংকের দায়িত্বশীল ব্যক্তিসহ অনেকেই এতে জড়িত । তিনি এ ঘটনার যথাযথ তদন্তও দাবি করেন। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা তাজুল ইসলাম বলেন, তফসির এলাকার অনেক লোককে তার হলমার্ক প্রতিষ্ঠানে চাকরী দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য উপদেষ্টা এ গ্রামে অনুষ্ঠানে এসে তানভীর মাহমুদ তফসিরের বেশ সুনাম করে গেছেন। তারুয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বাদল সাদির বলেন, এ এলাকার মানুষ তানভীর মাহমুদকে ভাল মানুষ হিসেবেই জানেন। ব্যাংক কর্মকর্তারা কিভাবে এতো টাকা ঋণ দিলেন সেটাই এখন প্রশ্ন। তিনি বলেন, ব্যাংকের টাকা জনগণের টাকা সে টাকা ফেরৎ পাওয়া প্রয়োজন। তাই ঘটনার যথাযথ তদন্ত দরকার। এ ব্যাপারে স্থানীয় সংসদ সদস্য জাপা নেতা অ্যাডভোকেট জিয়াউল হক মৃধা, তানভীর সম্পর্কে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, বিষয়টি তদন্তাধীন তাই কিছু বলবো না।

এদিকে এলাকা ঘুরে হলমার্ক কেলেঙ্কারির নায়ক তানভীর মাহমুদ তফসির সম্পর্কে যা জানা গেছে, ছোট বেলা থেকেই আলিশান গাড়ি ও বাড়ির মালিক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন তানভীর। তার পিতা মো. নূরুল ইসলাম কালু মিয়া অ্যালুমোনিয়ামের হাড়ি-পাতিলের ব্যবসা করতেন। পিতার সাথে তানভীর মাহমুদও এ ব্যবসা করতেন। ২০০০ সালে তিনি ঢাকায় যান। মাত্র তিন হাজার টাকা বেতনের চাকুরী থেকে তানভীর শিল্পপতি বনে যান। তার স্ত্রী ও হলমার্ক গ্রুপের চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলামের পরিচয় ঘটে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য উপদেষ্টা মোদাচ্ছের আলীর সঙ্গে। এই পরিচয় সূত্র ধরে সরকারের ঘনিষ্ঠ অনেকের সাথে সখ্যতা গড়ে উঠে তানভীর মাহমুদ ও তার স্ত্রী জেসমিন ইসলামের। সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের প্রভাব খাটিয়ে তারা ব্যাংক থেকে ঋণ নেয় হাজার হাজার কোটি টাকা। ১৫ থেকে ২০ বছরের ব্যবধানে এখন দেশের মিডিয়ার অন্যতম আলোচিত বিষয় এই তানভীর মাহমুদ। মালিক হয়েছেন হাজার কোটি টাকার।

(আরিফুল ইসলাম সুমন, স্টাফ রিপোর্টার ব্রাহ্মণবাড়িয়া)

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply