সংঘর্ষের ক্ষত সরাইলের ঘরে ঘরে

ব্রাহ্মণবাড়িয়া / ৫ অক্টোবর (কুমিল্লাওয়েব ডটকম)———-
কোনো এলাকায় সংঘর্ষের খবর শুনলেই কলিজাটা কাঁপুনি দিয়ে উঠে। কাজ আর হাতে উঠতে চাই না। বার বার শুধু মৃত ছেলের কথা মনে পড়ে। এ কথাগুলো সরাইল উপজেলার কালীকচ্ছ ইউনিয়নের ধর্মতীর্থ গ্রামের সিএনজি অটোরিকশা চালক মো. মহরম মিয়ার। তিনি জানান, প্রায় তিন বছর আগে সদর ইউনিয়ন এবং কালীকচ্ছ ইউনিয়নের মধ্যে ঘটে যাওয়া সংঘর্ষের ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় তার ছেলে কালীকচ্ছ পাঠশালা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৬ষ্ট শ্রেণীর ছাত্র মো. শাহআলম। সংঘর্ষ দেখতে গিয়ে সে গুলিবিদ্ধ হয়েছিল। এদিকে একই দিনের ঘটনায় পা হারান কালীকচ্ছ নন্দীপাড়া এলাকার কাসেম মিয়া (৪০) নামে এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। এখন আর মারামারিতে যাওয়ার শক্তি নেই তার। বাড়ির সামনে একটি টং দোকান দিয়ে কোন রকমে পেটের ভাত জোগাড় করেন তিনি। দোকানে যুবক ছেলেরা এলে মারামারিতে জড়াতে নিষেধ করেন সবাইকে। শুধু মহরম মিয়া আর কাসেম মিয়ার পরিবার নয়। সংঘর্ষের ক্ষত সরাইলের ঘরে ঘরে। প্রায় পরিবারেই রয়েছে এমন ক্ষতের চিহ্ন। আম পাড়া, আধিপত্য বিস্তার, জায়গা নিয়ে বিরোধ, পূর্ব শত্রুতার জের, সিডি ক্যাসেট বাকিতে না দেওয়াসহ তুচ্ছ বিষয় নিয়ে সংঘর্ষ সরাইলে নিত্যদিনের ঘটনা। এমকি ঈদের জামাতে বসা নিয়েও দেশীয় অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে এখানে। সচেতন মানুষের ধারণা, গ্রাম্য আধিপত্য আর সালিশে নেতৃত্বের লোভের কারণেই রোধ করা যাচ্ছে না এসব সংঘর্ষ।

৮ মাসে নিহত ৯, আহত শত শত:
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এ বছরের জানুয়ারি থেকে আগষ্ট পর্যন্ত সরাইলে কমপক্ষে এক’শ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে শত শত মানুষ আহত হওয়ার পাশাপাশি খুন হয়েছেন ৯ জন। তাছাড়া অনেক অঙ্গহানির ঘটনাও ঘটেছে। এরমধ্যে ১৪ জুলাই উপজেলার শাহজাদাপুরে প্রেমের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে খুন হন কৃষক হিরা মিয়া(৪৬)। ১৫ জুন শাহবাজপুর দীঘিরপাড় গ্রামে জায়গা সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে সংঘর্ষের ঘটনায় বড় ভাই হান্নান মিয়ার (৭০) হাতে খুন হয় ছোট ভাই শাহজাহান মিয়া (৫৫)। ২১ মে উপজেলার টিঘর গ্রামে খড় (বন) নেয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে লাঠির আঘাতে মারা যান নবী হোসেন (৩৫) নামে এক ব্যাক্তি। ১০ মে পূর্ব বিরোধের জের ধরে অরুয়াইল ইউনিয়নের ধামাউড়া গ্রামের দিনমজুর আলী হোসেনের পুত্র নবী হোসেনকে (২৩) হত্যা করে লাশ বোয়ালিয়া নদীর পাড়ে ফেলে রাখে প্রতিপক্ষ। ৯ এপ্রিল নারী সংক্রান্ত ঘটনাকে কেন্দ্র করে ধামাউড়া গ্রামের দু’গোষ্ঠীর সংঘর্ষে বাম পায়ে টেডা বিদ্ধ হন ছয় সন্তানের জনক জজ মিয়া (৪৫)। ছয় দিন পর তিনি মিয়া মারা যান। ৮ এপ্রিল টিঘর গ্রামে জায়গা নিয়ে বিরোধের জের ধরে বকুল মিয়া ও জিল্লু মিয়ার লোকজনের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে টেটাবিদ্ধ হয়ে মারা যায় বকুল মিয়ার ঘুমন্ত শিশু কন্যা ফিরোজা বেগম (৮ মাস)। ২২ জানুয়ারি ধামাউড়া গ্রামে কানের দুল চুরির ঘটনায় দু’গোষ্ঠীর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে বুকে বল্লম বিদ্ধ হয়ে মারা যান বোরহান উদ্দিন (৫৫) নামের এক ব্যক্তি। ৪ জানুয়ারি কুট্টাপড়া গ্রামের দু’গোষ্ঠী সংঘর্ষে পরিবহন শ্রমিক রিপন (২৮) নিহত হয়। ১ জানুয়ারি উপজেলার দেওড়া গ্রামে প্রতিপক্ষের হামলায় মারা যান সোহরাব উল্লাহ ঠাকুর (৪৫)। সরাইল সদর ইউনিয়নের স্বল্প নোয়াগাঁও গ্রামের দিনমজুর মোশারফ মিয়া (২৮) বলেন, কয়েক মাস আগে গোষ্ঠির খাতিরে মারামারিতে গিয়ে গুলাইলের(গুলাইন) আঘাতে আমার চোখ হারিয়েছি। এখন ঠিকমত কাজ কর্ম করতে পারি না। বৌ-বাচ্চা লইয়া বড়ই বিপদে আছি।

আতঙ্কে টিঘর গ্রামের মানুষ:
সর্বশেষ সংঘর্ষের আশঙ্কায় টান টান উত্তেজনা বিরাজ করছে উপজেলার পানিশ্বর ইউনিয়নের টিঘর গ্রামে। একটি খাস পুকুরের ইজারা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে দ্বন্ধের সূত্রপাত। দু’পক্ষই বর্তমানে মারমুখি অবস্থানে রয়েছে।

সংঘর্ষের প্রস্তুতি:
কোন ঘটনার সাথে সাথে ঘোষনা দিয়ে মাঠে নামে এখানকার মানুষ। এসময় সবার হাতে থাকে দেশীয় নানা জাতের অস্ত্র। বাঁশ, লাঠিসোটা, দা, বল্লম ব্যবহার করা হয়। অনেক সংঘর্ষের সময় যুবকরা মাথায় হেমলেট, বুকে বিশেষ ধরনের বর্ম এবং পায়ে বিশেষ প্যাড ব্যবহার করতে দেখা যায়। এাছাড়া সংঘর্ষ প্রবন এলাকাগুলোর বাড়িতে সর্বসময়ই প্রস্তুত থাকে একদিকে কাটা মুলি বাঁশ।

প্রশাসন এবং জনপ্রতিনিধিরা যা বলেন:
সরাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গিয়াস উদ্দিন বলেন, সাধারণত গোষ্টি প্রাধান্য টিকিয়ে রাখতেই এসব সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। তাছাড়া আর্থিক লাভ হয় বলে সর্দাররা সংঘর্ষ লাগিয়ে রাখতে চান। এখানকার মানুষের সভ্যতারও অভাব রয়েছে। তবে আগের তুলনায় সংঘর্ষের পরিমান কমে এসেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সদ্য বদলী হওয়া সরাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবু সাফায়াৎ মুহম্মদ শাহে দুল ইসলাম বলেন, সংঘর্ষের জন্য এখানকার মানুষের মানসিকতা প্রধানত দায়ী। গ্রাম্য সর্দাররা নিজেদের লাভের জন্য সংঘর্ষ জিইয়ে রাখেন। তাছাড়া সরাইলে শিক্ষার হার মাত্র ৩৪ শতাংশ। শিক্ষায় অনঅগ্রসরতাও সংঘর্ষের অন্যতম কারণ। এসব সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রনে আনতে হলে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও শক্ত ভূমিকা রাখতে হবে বলে মতামত প্রকাশ করেন তিনি।
এ ব্যপারে সরাইলের স্থানীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট জিয়াউল হক মৃধা বলেন, মানুষের হাতে টাকা পয়সা আসলে স্বভাবের পরিবর্তন ঘটে। অনেকেই দল তৈরি করে ঝগড়া লাগিয়ে রাখেন। তিনি সরাইলের মানুষের প্রতি ঝগড়া ফ্যাসাদ থেকে ফিরে আসার আহবান জানান।

আরিফুল ইসলাম সুমন

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply