সরাইলে ধান-চাল সংগ্রহে দুর্নীতির অভিযোগ : কৃষকদের কাছ থেকে একমুঠো ধানও কেনা হয়নি

ব্রাহ্মণবাড়িয়া / ৫ অক্টোবর (কুমিল্লাওয়েব ডটকম)———-
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলায় সরকারীভাবে ধান এবং চাল সংগ্রহ কার্যক্রমে চরম অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার খাদ্য ও গুদাম কর্মকর্তারা চলতি মৌসুমে স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকে একমুঠো ধানও তারা সংগ্রহ করেনি। খাদ্য কর্মকর্তারা এখন ধানের পরিবর্তে চাতাল কল থেকে আতপ চাল কেনার ঘোষণা দিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, তারা চাতালকল মালিকদের কাছ থেকে টন প্রতি ১ হাজার টাকা কমিশন পেয়ে শুধু চাল সংগ্রহ করেই চলতি মৌসুমের ধান-চাল সংগ্রহ কার্যক্রমের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করার উদ্যোগ নিয়েছে। এতে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের সরকারি এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এলাকার কৃষকদের স্বার্থে ধান কেনার তাগিদ দিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যানসহ সরকারদলীয় কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা উপজেলা খাদ্য ও গুদাম কর্মকর্তাদের সাথে একাধিবার কথা বলেছেন। কিন্তু ওই দুই কর্মকর্তা ধানের পরিবর্তে চাতাল কল থেকে আতপ চাল কেনার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন।
উপজেলার কয়েকজন জনপ্রতিনিধিসহ রাজনৈতিক নেতা অভিযোগ করে বলেন, এখানকার গুদাম কর্মকর্তা নিজেকে পররাস্ট্রমন্ত্রী ডাঃ দিপু মনির আত্মীয় পরিচয় দিয়ে প্রভাব খাটিয়ে যাচ্ছেন। তিনি মনগড়াভাবে গুদামের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। লোকজন কৃষকদের স্বার্থে তাকে কিছু বলতে গেলেই তিনি মন্ত্রীর ভয় দেখান। উপজেলার কালীকচ্ছ এলাকার কৃষক মো. শওকত মিয়া, আবু ছায়েদ, বাচ্চু মিয়া, ইউসুফ আলী, আলী মিয়া এবং নোয়াগাঁও এলাকার কৃষক ছোটন মিয়া, হেলিম মিয়া, সিরাজ মিয়াসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকার একাধিক কৃষক অভিযোগ করে জানান, সরকারী মূল্য পেতে তাদের উৎপাদিত ধান ভাল ভাবে শুকিয়ে তারা এ ধান বিক্রির করতে খাদ্য গুদামে গিয়েছিল। কিন্তু গুদামের লোকেরা কৃষকদের ফিরিয়ে দেন। গুদাম থেকে কৃষকদের জানিয়ে দেয়া হয় তারা ধান কিনবে না। পরে অসহায় কৃষকরা কম মূল্যে চাতালকল মালিকদের কাছে এ ধান বিক্রি করে। উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে এই উপজেলা থেকে ৩ হাজার ২শত ২৯.২০ মেট্রিক টন বোরো সিদ্ধ চাল এবং ৪শত ৪৭ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহ করতে সরকার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়। প্রতি মণ ধান ৭২০ টাকা দরে কৃষকদের কাছ থেকে ক্রয় করার নির্দেশও দেয়া হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলার খাদ্য কর্মকর্তারা সরাইল ও আশুগঞ্জ উপজেলার ৫০টি চাতাল কল থেকে টন প্রতি হাজার টাকা কমিশন পেয়ে চাল ক্রয় করেন। কৃষকদের কাছ থেকে তারা একমুঠো ধানও ক্রয় করেননি। এখন খাদ্য বিভাগের লোকেরা নতুন করে ধানের পরিবর্তে চাতাল কল থেকে ৮শত ৫০ মেট্রিক টন আতপ চাল ক্রয় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, গত ২৭ সেপ্টেম্বর উপজেলা মাসিক সমন্বয় সভায় এলাকার কৃষকদের সুবিধার্থে ধান ক্রয়ের পর আতপ চাল ক্রয় করার দাবি জানানো হয়েছে। এদিকে উপজেলার অনেক চাতাল কল মালিকের দাবি তারা টন প্রতি ১ হাজার টাকা কমিশন দিয়েই গুদামে চাল বিক্রি করতে হয়েছে। এ বিষয়ে সরাইল উপজেলা খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আসাদ উদ্দিন ভূঁইয়া চলতি মৌসুমে ধান না নেয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, কৃষক ধান দিতে আসে না। এছাড়া ধান সংগ্রহে ঝামেলাও অনেক। তাই ধান নেওয়া হয়নি। চাল ক্রয়ে কমিশন নেওয়া এবং মন্ত্রীর পরিচয়ে প্রভাব খাটানো প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বিষয়গুলো এড়িয়ে যান। উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, গুদামে জায়গার অভাবে ধান নেওয়া সম্ভব হয়নি। এখন ৮শত ৫০ মেট্টিক টন আতপ চাল ক্রয় করবো। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. শাহজাহান ভূঁইয়া বলেন, কৃষকদের কাছ থেকে ধান ক্রয় করতে নির্দেশনা দেয়া আছে। গুদামে জায়গা না থাকলে, জায়গার ব্যবস্থা করা হবে। কিন্তু ধান নেবে না কেন। তিনি বলেন, ইতিমধ্যে নাসিরনগর ও কসবা উপজেলায় কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করা হচ্ছে। সরাইল উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা খাদ্য ক্রয় কমিটির উপদেষ্টা হাজী রফিক উদ্দিন ঠাকুর খাদ্য কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন রাখেন, গুদামে ধান রাখার জায়গা না থাকলে ৮শত ৫০ টন আতপ চাল কোথায় রাখবেন। উপজেলা চেয়ারম্যান বলেন, উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক এবং গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দু’জনে মিলে অজানা কারণে তারা এলাকার কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করছে না। ধানের পরিবর্তে তারা এখন আতপ চাল ক্রয় করার পরিকল্পনা করেছে। তিনি আরো বলেন, শুনেছি গুদাম কর্মকর্তা নিজেকে পররাস্ট্রমন্ত্রী ডাঃ দিপু মনির নিকট আত্মীয় পরিচয় দিয়ে এখানে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছেন।

আরিফুল ইসলাম সুমন

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply