আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস ও আমার ভাবনা —————————–মো. আলী আশরাফ খান

ফরাজ আলী বয়সের ভারে ন্যুব্জ। তারপরেও তিনি দীর্ঘদিন ধরে রিক্সা চালান। ৪ ছেলে ২ মেয়ে তার। সবাই এখন বড়। বিয়েশাদি করে যে যার মত সংসার করছেন। মেয়েদের বিয়ে দিতে অনেক দারদেনা করেছেন ফরাজ আলী। এ ঋণের বোঝা কবে শেষ হবে জানেন না তিনি। ৩ ছেলেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করিয়েও তার কোনো লাভ হয়নি। ছেলেরা তার কোনো খোঁজ-খবর নেয় না। এক ছেলে তো বাবার পরিচয় দিতেই লজ্জা পায়! ঢাকায় তার বসবাস। ভুলেও কোনো দিন বলেনি বাবা-মাকে তার বাসায় যেতে। অন্য ছেলেরাও প্রায় একই রকম। ফরাজ আলী তার স্ত্রীকে নিয়ে দু’চালা ভাঙ্গা ঘরে থাকেন। সকালে বাড়ি থেকে বের হন সন্ধ্যায় চাল-ডাল নিয়ে বাড়ি ফেরেন। আধুনিক যুগে মানুষ রিক্সায় চড়ে খুব কম। তারপরে আবার বৃদ্ধ লোক। ধীরে ধীরে রিক্সা চালান বলে অনেকে গালমন্দও করেন। সবকিছু মিলিয়ে এককঠিন সময় কাটছে ফরাজ আলীর। চুখের পানিতে বুক ভাসে। ভাঙ্গাভাঙ্গা কন্ঠে বলেন’ ‘এর লাগ্গাই কি পোলাপাইনগো লেহাপড়া করাইছিলাম। কত কষ্ট করছি, তাগো লাইগ্গা। এহন তারা আমাগো পরিচয় দেয় না, আমার খোঁজ-খবর নেয় না’। এসব কথা বলেই চাপাকান্না শুরু করলেন তিনি। আমিও আর বেশি কিছু জানতে চাইলাম না তার কাছে।
প্রবীণ দিবসে ফরাজ আলীর জীবনের এসব কথা শুনে মনটা বেশ খারাপ হয়ে গেল। যদিও তার রিক্সায় আমার মাঝেমধ্যে ওঠা হয় কিন্তু এতটা গভীরে যাওয়া হয়নি কখনও। ফরাজ আলী জানেন না, প্রবীণ দিবস কি, কবে পালন হয় তা। তিনি চোখের জলে প্রমাণ করলেন, তার মত প্রবীণরা আজ কতটা অসহায়। ফরাজ আলীর ছেলেরা হয়তো জানেন অন্যান্য অনেক কথিত শিক্ষিতজনদের মতো ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। কিন্তু তারা কি এর মর্মার্থ অনুধাবন করেন, তাদের ঘরে থাকা কিংবা বাড়ির প্রবীণদের প্রতি দায়িত্ব পালনে তারা কতটা সচেতন? এপ্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়।
১৯৯০ সালের ১৪ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভায় প্রতি বছরের ১ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পরে জাতিসংঘ ১৯৯৯ সালকে আন্তর্জাতিক প্রবীণ বর্ষ হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর থেকে বছরের পর বছর প্রবীণ দিবস আসে আর যায়। কিন্তু নবীনরা কি কোনো শিক্ষা অর্জন করতে পারছে, এ দিবসটি কি এবং কেনো? এর চেয়েও বড় কথা, এ গুরুত্বপূর্ণ দিবসটি সম্পর্কে বড়রাও খুব কমই জানে, আলোচনা-পর্যালোচনাও তেমন একটা হয় না। বিশেষ করে দেশের বিভাগীয় শহর কিংবা কিছু কিছু জেলা শহরে স্বল্পসংখ্যক মানুষের উপস্থিতিতে নামমাত্র লোক দেখানো অনুষ্ঠানের আয়োজন হতে দেখা যায়। যার ফলে নবীনদের মধ্যে প্রবীণদের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে তেমন কোনো সচেতনতা কিংবা দায়িত্ববোধের তাড়না সৃষ্টি হয় না। সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের শিক্ষা পাঠ্যক্রমেও এ অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকে উল্লেখযোগ্যভাবে অন্তর্ভূক্ত করা হয়নি। যে কারনে দিন যতই অতিবাহিত হয় ততই অবক্ষয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে আমাদের নবীনরা। পারিবারিক ও সামাজিকভাবে অবহেলার শিকার হচ্ছে প্রবীণ সমাজ।
আমাদের বুঝতে হবে, চিরাচরিত নিয়মে মানুষ বৃদ্ধ-বার্ধক্যতা লাভ করে। বার্ধক্যতা অর্জনও কিন্তু আল্লাহর দেয়া একরকম নেয়ামত;এ সৌভাগ্য সকলের হয় না। যদিও বার্ধক্যতা নিয়ে অনেককেই কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়। এমন অবস্থা আজকের তরুণ-নবীনদের জন্যও অপেক্ষা করছে-এটা মনে রাখতে হবে। সূতারং কোনভাবেই যেনো প্রবীণের মনে কষ্ট হয় এমন কর্মকা- না করেন কোনো নবীন। বরং শ্রদ্ধা-ভালোবাসা, বিনয় আর সমঝোতার মাধ্যমে মুরব্বিদের সম্মানের বিষয়টি আমাদের হৃদয়ে বদ্ধমূলের চেষ্টা করতে হবে।
স্বভাবতই মানুষ বিবর্তনশীল। প্রকৃতির নিয়মেই মানুষকে এক এক করে বিবর্তন-পরিবর্তনের ধাপগুলো ডিঙ্গাতে হয়। আর ধারাবাহিক এসব পথ-ঘাট মাড়িয়ে একজন মানুষ বাস্তবিক জীবনের নিজ নিজ অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করে প্রবীণে পদার্পণ করে। প্রবীণের এ সঞ্চিত হীরের চেয়েও মহামূল্যবান অভিজ্ঞতা সমাজকে বাঁচিয়ে রাখে, বৃষ্টিধারার ন্যায়-সজিবতা দান করে, একে অপরের মাঝে সৃষ্টি করে হৃদিক এক অনিন্দ্য-অনুপম দৃষ্টান্তের। এককথায়, প্রবীণরাই সমাজের প্রাণ। নবীনের জীবন চলার পাথেয়-দিকনির্দেশক। একজন তরুণ-নবীন এ স্বর্ণোজ্জ্বল অভিজ্ঞতার ভা-ার থেকেই তার জ্ঞাকে-অজ্ঞাতে, ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় নিজ নিজ জীবনে সার্বিক উন্নতির আলোকরশ্মি তথা প্রকৃত সফলতা লাভের দ্বার উন্মোচন করে।
যে হারে আমাদের দেশে একের পর এক সামাজিক অবক্ষয়ের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে আমাদের ধ্বংস হওয়ার কথা অনেক আগেই। আমাদের প্রবীণ-অমূল্য সম্পদ আছে বলেই আমরা এ ধ্বংস-প্রলয় থেকে এখনো বেঁচে আছি। যদিও অনেক ক্ষেত্রে হয়তো কোনো কোনো নবীণ যথাযথ সম্মান প্রদর্শণ করেন না প্রবীণের প্রতি। তারপরেও প্রবীণরা নবীনদের অকৃত্রিম ভালোবাসায় সিক্ত করতে যারপরনাই চেষ্টা করেন, প্রার্থনা করেন, নবীনদের মাঝে শুভচিন্তার উদয় হওয়ার জন্য।
সচেতনজনরা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করবেন, একান্মত্যবোধ যে পরিবারে প্রবীণ-মুরব্বি থাকে সেই পরিবারের অন্যসব সদস্যরা বেপরোয়া হয় খুব কম। তাদের মধ্যে যথেষ্ট রক্ষণশীলতা-ভদ্রতা-সৃষ্টতা ও সৃজনশীলতা সর্বোপরি ধর্মীয় নৈতিকতাবোধ লক্ষ্য করা যায়। তারা পরিশীলিত জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। প্রবীণের কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা তাদের জীবনের পরতে পরতে কাজে লাগে। পারিবারিক যেকোনো শলাপরামর্শ এবং সিদ্ধান্তে উপনিত হতে প্রবীণদের যে ভূমিকা থাকে তা যে কতটা মহামূল্যবান তা একমাত্র যারা অনুধাবন করেন তারাই টের পান।
আমরা আবারও বিশ্ব প্রীবণ দিবস শেষে নবীনের প্রতি আহ্বান জানাই, ভুলেও তাদের অসম্মান করো না। তাদেরকে ভালোবাসায় অভিসিক্ত করো। অঙ্গীকার করো প্রবীণের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্যের কোনো অবহেলা করবানা। আগামী প্রবীণ দিবস আসার আগেই সকলের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি হোক-প্রবীণদের যথাযথ অধিকারকে ঘিরে। আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রবীণের সঠিক প্রাপ্যতা বুঝিয়ে দিলে নবীনরাও হবে মহান। সকলে সুখে ও শান্তিতে বসবাস করতে পারবে সমাজে। পাশাপাশি নবীনের প্রতি আরো আন্তরিক হওয়ার জন্যও আহ্বান জানাই প্রবীণদের প্রতি। এবং পারিবারিকভাবে নৈতিক শিক্ষায় আমরা হবো আলোয় আলোকিত। এই হোক আমাদের দৃঢ় প্রত্যয়।
লেখক: কবি, কলামিস্ট ও সংগঠক
গৌরীপুর, দাউদকান্দি, কুমিল্লা।

ই-মেইল : khan_sristy@yahoo.com

Check Also

মিনি ওয়াক-ইন-সেন্টারের মাধ্যমে রবি’র গ্রাহক সেবা সম্প্রসারণ

ঢাকা :– গ্রাহক সেবাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে মোবাইলফোন অপারেটর রবি আজিয়াটা লিমিটেড সম্প্রতি মিনি ওয়াক ...

Leave a Reply