তিনি সর্বভূক ওসি

ব্রাহ্মণবাড়িয়া/ সেপ্টেম্বর ১০ (কুমিল্লাওয়েব ডটকম)—–

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল থানার ওসি গিয়াস উদ্দিনের বিরুদ্ধে জনপ্রতিনিধি, সরকার দলীয় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীসহ নানা শ্রেণী পেশার মানুষের অভিযোগের শেষ নেই। মাদক ও জুয়ার স্পট থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায়, সাধারণ মানুষকে নানাভাবে হয়রানি করে অর্থ আদায়, মোটা অঙ্কের টাকায় মামলা রেকর্ড ও মামলার অভিযোগপত্র থেকে আসামির নাম বাদ দেয়া, আসামি গ্রেফতার না করে প্রকাশ্যে চলাফেরার সুযোগ দেয়াসহ নানান অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এছাড়া থানা ভবনে প্রকাশ্যে এক জনপ্রতিনিধিকে লাথি মারা, আওয়ামী লীগের সিনিয়র এক নেতা ও আইনজীবিকে লাঞ্ছিত করা এবং একাধিক সাংবাদিকের নামে মিথ্যা মামলা দিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, সরাইলে এক বছরের চাকরিতে তিনি কামিয়েছেন কোটি টাকা।
ইতিমধ্যে এই ওসির বিরুদ্ধে ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ (আইজিপি) এর কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন এক ভূক্তভোগী। এদিকে এসব ঘটনা তদন্তে নেমেছেন জেলা পুলিশও। তার নানা অপকর্মে ত্যক্ত-বিরক্ত খোদ সরকার দলীয় নেতা-কর্মীরাও।
এছাড়া ওসি গিয়াস উদ্দিন উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানকে ‘বড় ভাই’ এবং মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানকে ‘আপু’ হিসেবে ডেকে এলাকায় রীতিমতো আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, ওসি গিয়াস উদ্দিন সরাইল থানায় যোগদান করেই এখানকার জুয়ার আসার ও মাদক আস্তানাগুলো চাঙ্গা করেন। এই উপজেলায় পুলিশের উপস্থিতিতে প্রকাশ্যে জুয়ার আসর চলার নজির রয়েছে। এই থানার বিশেষ আনসার সদস্য মো. সোনা মিয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন অপরাধ স্পট থেকে ওসি মাসোহারা আদায় করে থাকেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরাইল থানায় কর্মরত অনেক পুলিশ সদস্য এই ওসির ওপর নাখোশ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন পুলিশ সদস্য জানান, চাকুরী জীবনে অনেক ওসি দেখিছি। কিন্তু এমন ওসি কোথাও দেখিনি। টাকা পেলে তিনি সব করতে পারেন। এখানকার পুলিশ সদস্যদের সুখ দুঃখ তিনি বুঝতে চান না।
সরাইল উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুর রাশেদ বলেন, এই ওসির নানা অনৈতিক কার্যকলাপের কারণে পুলিশ বিভাগসহ সরকারের ভাবমূর্তি নিয়ে এখানকার সাধারণ মানুষের মাঝে প্রশ্ন উঠেছে। টাকা ছাড়া তিনি কিছুই বুঝেন না।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই থানায় প্রতিমাসে ৫০/৬০টি মামলা রেকর্ড হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি মামলা থেকে ওসি কৌশল খাটিয়ে ১০ থেকে ২৫ হাজার টাকা নিয়ে থাকেন। এছাড়াও এফ.আই.আর ভূক্ত আসামি গ্রেফতার, চার্জশিট, মামলা থেকে আসামি বাদ দেওয়া ইত্যাদি কাজে এই ওসির বাণিজ্য চলছে রমরমা। এসব ক্ষেত্রে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাদের কোনঠাসা করে রাখেন ওসি। ফলে প্রায় ঘটনায়ই একাধিক মামলা রেকর্ড হয় এই থানায়। বিভিন্ন সময়ে বেশকয়েকটি রহস্যজনক মৃত্যুকে অপমৃত্যু সাজিয়ে ব্যাপক আলোচনায় আসেন তিনি।
সরাইলে অধিকহারে সংঘর্ষ হলে ওসির অর্থ বাণিজ্য বেড়ে যায়। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষের পর অনেক নিরপরাধ লোককে আটক করে ওসি টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেন। সম্প্রতি অরুয়াইল বাজার এলাকায় সরকারী বন্দোবস্ত দেয়া জায়গায় ৩৪টি দোকানঘর ভেঙে ফেলে ভূমি দস্যুরা। এসময় চিহ্নিত ভূমিদস্যুরা ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসকসহ সরাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়। এ ঘটনায় থানায় মামলা রুজু হলেও আসামিদের সাথে ওসির বুঝাপড়া হয়ে যায়।
কয়েকদিন আগে টিঘর সরকারী খাস পুকুরের পাড় কেটে মাছ নিয়ে যায় কিছু প্রভাবশালী লোক। এ ঘটনায় স্থানীয় ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা থানায় মামলা দায়ের করেন। কিন্তু ওসি আসামিদের গ্রেফতার না করে উল্টো আসামিপক্ষের কাছ থেকে একই পুকুরের পাড় কেটে ফেলার অভিযোগে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কাউন্টার মামলা নেন। এ ঘটনায় উপজেলা প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা হতবাক হন।
অভিযোগ আছে, এ দীঘি নিয়ে একের পর এক মামলা নিয়ে ওসি গিয়াস তাদের কাছ থেকে কয়েক লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। ধামাউড়া গ্রামের দু’গোষ্ঠির লোকদের মধ্যে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় ওসি এক গোষ্ঠির পক্ষে অবস্থান নিয়ে আর্থিক ফায়দা লুটেছেন বলে অভিযোগ করেছে একাধিক গ্রামবাসী। দেওড়া গ্রামের দুই গোষ্ঠির বিরোধকে কেন্দ্র করে থানায় অর্ধডজন মামলা হয়েছে। সুযোগে ওসি কামিয়ে নিয়েছেন লাখ টাকা। উপজেলা সদর ইউনিয়নের সৈয়দটুলা গ্রামের বাসিন্দা যুবলীগ নেতা মো. আলীম মিয়া বলেন, কয়েক দিন আগে ওসি গিয়াস উদ্দিন লাখ টাকার বিনিময়ে আমার নামে মিথ্যা নারী নির্যাতন মামলা নিয়েছেন। বর্তমানে আমি উচ্চ আদালতের জামিনে আছি। ওসির এই অপকর্মে আমার সামাজিক ও আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। সাংবাদিক বিদ্বেষী হয়ে কয়েকদিন আগে ওসি নিজে মামলা লিখিয়ে স্থানীয় এক সাংবাদিকের নামে মিথ্যা চাঁদাবাজি মামলা নিয়েছেন। মামলার এজাহারে নাম না থাকলেও এ মামলায় আরও দুই সাংবাদিককে গ্রেফতার করতে পুলিশকে নির্দেশ দেন ওসি।
স্থানীয় আরেক সাংবাদিককে হয়রানি করতে মিথ্যা নারী নির্যাতন মামলা সাজায় এই তিনি। পরে অবশ্য বিভিন্ন চাপে এ ঘটনাটিকে ধামাচাপা দেন ওসি।
উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, কিছুদিন আগে আলোচিত এই ওসির বিরুদ্ধে নানা অভিযোগে উপজেলা প্রশাসন সংশিষ্ট দফতরে একটি প্রতিবেদন প্রেরণ করেছে।
সরাইল উপজেলা পরিষদ মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান মাহমুদা পারভীন সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ক’দিন আগে জরুরি কাজে ওসি গিয়াসকে ফোন করেন তিনি। ওসি ফোন রিসিভ করে মহিলা ভাইস চেয়াম্যানকে আপু বলে মসকরা করেন। তাছাড়া বিভিন্ন সময়ে সরাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার জনস্বার্থমূলক নানা কাজে ওসি অসযোগিতা করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এ বিষয়ে সরাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গিয়াস উদ্দিন জানান, এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন। এখানে তিনি সততার সাথে কাজ করে যাচ্ছেন।
জেলা পুলিশ সুপার জামিল আহামেদ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ‘ওসি গিয়াস উদ্দিনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগের তদন্ত চলছে।

(আরিফুল ইসলাম সুমন, স্টাফ রিপোর্টার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া )

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply