শারিরীক নির্যাতন, লাঞ্ছিত ও জোর করে প্রধান শিক্ষক পদথেকে অব্যাহতিপত্র আদায় করার অপমান সইতে না পেড়ে দেবিদ্বার ছোটনা মডেল হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক’র আত্মহত্যা

মোঃ সাইফুল ইসলাম, দেবিদ্বার থেকেঃ
গ্রামের কথিত বিয়ের নীতিমালা না মেনে বিয়ে করার অপরাধে স্থানীয় একদল যুবক কর্তৃক শারিরীক নির্যাতন, লাঞ্ছিত ও জোর করে প্রধান শিক্ষক পদ থেকে অব্যাহতি পত্র আদায় করার অপমান সইতে না পেড়ে, দেবিদ্বার উপজেলার ছোটনা মডেল হাই স্কুল’র প্রধান শিক্ষক আলহাজ্ব মোঃ আক্তার হোসেন(৩৫) শনিবার রাতে বিষপানে আত্মহত্যা করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ওই ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক তোলপাড় চলছে। নিহত শিক্ষক আলহাজ্ব মোঃ আক্তার হোসেন বুড়িচং উপজেলার (ময়নামতি সেনা নিবাস সংলগ্ন) ঝুমুর গ্রামের মৃত খালেক’র পুত্র। রোববার সকালে কুমিল্লার আদালতে নিহত স্কুল শিক্ষক’র ছোট ভাই মোঃ আবেদ হোসেন বাদী হয়ে ছোটনা গ্রামের মৃতঃ কফিল উদ্দিন’র পুত্র অবসর প্রাপ্ত সেনাসদস্য খোরশেদ কিবরিয়া(৪২) সহ অজ্ঞাতনামা আরো ১০/১২জনকে অভিযুক্ত করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
স্থানীয়রা জানান, গত বছরের ১৯ নভেম্বর আলহাজ্ব মোঃ আক্তার হোসেন ছোটনা মডেল হাই স্কুলে প্রধান শিক্ষক পদে যোগদান করেন। প্রধান শিক্ষক নিয়োগ’র ক্ষেত্রে স্থানীয় একটি মহল তাদের পছন্দের শিক্ষক নিয়োগ করতে না পেরে ক্ষুব্ধ ছিল। গতকাল শনিবার বিকেল ৪টায় ছোটনা মডেল হাই স্কুল’র বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও জেএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি সভা চলছিল। এসময় স্কুল পরিচালনা পর্ষদ’র সভাপতি, সদস্য ও শিক্ষক মন্ডুলীর উপস্থিতিতে ছোটনা গ্রামের খোরশেদ কিবরিয়ার নেতৃত্বে কামরুল হাসান(২৪),এডভোকেট মুজিবুর রহমান(৪৫), সাত্তার খান(৩০), শামীম আহমেদ(২৫) দেবিদ্বার উপজেলার সুলতানপুর মাদ্রাসার প্রভাষক মোঃ সোহাগ(৪৫)সহ ১৫/২০জন ‘গ্রামের বৈবাহিক নীতিমালা’ ভঙ্গ করে একই স্কুলের খন্ডকালীন শিক্ষিকা লাভলী আক্তার’র সাথে গত ২৮আগষ্ট কোর্ট ম্যারিজ করার অভিযোগ তুলেন। এক পর্যায়ে প্রধান শিক্ষক মোঃ আকতার হোসেনকে বেধরক মারধর ও লাঞ্ছিত করে এবং জোর পূর্বক প্রধান শিক্ষকের পদ থেকে অব্যাহতি পত্র আদায় করে নেয়। এসময় তাকে রক্ষা করতে এসে স্কুল পরিচালনা পর্ষদ’র সভাপতি মোঃ আজিজুর রহমান খান এবং বিদ্যুৎশাহী সদস্য সফিউল আলমসহ ৪/৫জন আহত হন। হামলাকারীরা অভিযোগ করেন, ১৯৯৪ সালে তৎকালীন স্কুল শিক্ষক শাহজাহান ভূইয়ার সাথে একই স্কুল ছাত্রী শাহনেওয়াজ পারভীন পুতুল’র বিয়েকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট জটিলতা নিরসনে, তৎকালীন স্কুল প্রধান শিক্ষক আব্দুর রহীম গ্রামবাসীদের নিয়ে এক বৈঠক করেন। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী,- এ স্কুলের কর্মরত কোন শিক্ষক একই স্কুল’র কোন ছাত্রীকে বিয়ে করতে পারবেনা। সেই নীতিমালা ভঙ্গ করার অপরাধে তাকে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব থেকে সড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন হামলা কারীরা। স্থানীয় মোহনপুর ইউপি মেম্বার মোঃ মিজানুর রহমান(৩৮) বলেন, প্রধান শিক্ষক আক্তার হোসেন ৩পুত্র সন্তান’র জনক হলেও পারিবারিক ভাবে সুখী ছিলেন না। তাই তিনি গত ২৮আগষ্ট স্কুল শিক্ষিকা লাভলী আক্তারকে কোর্ট মেরিজ করেন অপরদিকে মোহনপুর ইউপি চেয়ারম্যান মোঃ তাজুল ইসলাম এ অনাকাঙ্খীত ঘটনাকে কথিত বিয়ের নীতিমালাকে দায়ি করেন।
স্কুল পরিচালনা পর্ষদ’র সভাপতি মোঃ আজিজুর রহমান খান ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, প্রধান শিক্ষককে রক্ষা করতে এসে আমিসহ কয়েকজন আহত হই। ঘটনার সত্যতা জানতে উক্ত স্কুলের খন্ডকালীন শিক্ষিকা লাভলী আক্তারকে জিজ্ঞেস করলে সে কোর্ট ম্যারিজ’র কথা অস্বীকার করে। পরে তাকে উদ্ধার করে স্কুল’র অফিস সহকারী মোঃ জুয়েলকে দিয়ে মোটর সাইকেল যোগে তার বাড়িতে পাঠিয়ে দেই।
স্কুল’র অফিস সহকারী মোঃ জুয়েল বলেন, তাকে বাড়ি পৌঁছে দেয়ার সময় কাবীলা বাস ষ্ট্যাশনে নেমে আমাকে ৪০হাজার টাকা এবং একটি স্বর্ণের চেইন বাড়িতে যেয়ে তার স্ত্রী’র কাছে দিতে বলে মোটর সাইকেল থেকে নেমে যান। পরে ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, আগামী কাল আমার জানাযায় এসো। বিষয়টি তার পরিবারসহ অন্যান্যদের জানালে তারা মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে না পেয়ে অনেক খোঁজা খোজির পর বিষপান অবস্থায় তাকে কুমিল্লা মুক্তি হসপিটালে পান, মুক্তি হসপিটাল থেকে তাকে প্রথমে সদর হাসপাতাল এবং পরে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পর রাত দেড়টায় মারা যান।
রোববার সন্ধ্যা ৭টায় দেবিদ্বার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এসএম বদিউজ্জামান’র সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ঘটনাটি শোনে একজন সাব ইনিস্পেক্টর ঘটনাস্থলে পাঠিয়েছে এব্যাপারে এখনো কোন রিপোর্ট দেয়নি, তাছাড়া কোন পক্ষই এব্যাপারে থানায় অভিযোগ করেননি।
ঘটনার পর দেবিদ্বার উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান এ ঘটনাকে অনাকাঙ্খীত ঘটনা উল্লেখ করেন। অপর দিকে দেবিদ্বার উপজেলা শিক্ষক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক এবং ছোটনা মডেল হাইস্কুল’র প্রধান শিক্ষক আলহাজ্ব আক্তার হোসেনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করার অভিযোগ এনে হত্যাকারীদের গ্রেফতার পূর্বক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবী করেছেন দেবিদ্বার উপজেলা শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও দেবিদ্বার রেয়াজ উদ্দিন পাইলট উচ্চবিদ্যালয়’র প্রধান শিক্ষক মোঃ জাহাঙ্গীর আলম সরকার, সাধারন সম্পাদক দেবিদ্বার মফিজউদ্দিন আহমেদ বালিকা পাইলট উচ্চবিদ্যালয়’র প্রধান শিক্ষকা রাশেদা বেগম।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply