আমাদের শিল্প-সাহিত্যচর্চা হোক প্রেম এবং কল্যাণের —————মো.আলী আশরাফ খান

আমার প্রিয় এক লেখক বন্ধু অতি সম্প্রতি একটি দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য বিভাগের নতুন দায়িত্ব পেয়েছেন। দায়িত্ব পেয়েই তিনি আমাকে বললেন, ভাই আমি চাইছি এ বিভাগে আপনার একটি লেখা ছাপানোর মধ্য দিয়ে আমার প্রথম কাজ শুরু করবো। তার কথা শুনে আমি বেশ অবাক হলাম! দেশে এতো লেখক থাকতে আমার লেখা! পরক্ষণে বুঝতে পারলাম, তিনি একদিন আমাকে বলেছিলেন, ‘ভাই আমি কিন্তু আপনার হাত ধরেই এ লেখালেখিতে এসেছি। তাছাড়া আপনার সম্পাদিত পত্রিকা ‘সাহিত্য সংলাপ’-ই আমার প্রথম লেখা ছাপা হয়েছিল-যা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের বিষয়’। হয়তো ওই বিষয়টিকেই ধরে রেখে তিনি আমার লেখা দিয়ে ওই পত্রিকাটির সাহিত্য বিভাগে তার কাজের সূচনা করতে চাইছেন। আমি বরাবরই এ জন্য তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই, জানাই অকৃত্রিম ভালোবাসা।
আমি প্রথমেই বলবো ‘সাহিত্য’ শব্দটি দ্বারা আমরা কি বুঝি, সাহিত্য কি, কি তার রং বা আকার-ধরন। আমি জানি, সাহিত্যের সংজ্ঞা কিংবা বৈচিত্রতা সম্পর্কে আমার চেয়ে কম ধারণার লেখক কমই আছে। তারপরেও ওই বন্ধুর আবদার রক্ষায় দু’চারটি লাইন লেখার অভিপ্রায়ে মাত্র এ লেখা। আমি মনে করি, মানুষ জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এক বৈচিত্রময় সাহিত্যাঙ্গনের মধ্য দিয়ে জীবনকে অতিবাহিত করে। এখানে প্রকৃতির নানা বৈশিষ্ট্য, বিভা ক্রমশ তাকে মুগ্ধ থেকে বিমুগ্ধ করে জীবনের পরম স্বাদ পাওয়ার অপূর্ব সুযোগ করে দেয় স্রষ্টার সব সৃষ্টি নান্দনিক প্রকৃতি। মানুষ নিজের অজান্তেই প্রতিনিয়ত প্রকৃতির শোভার সঙ্গে খেলা করে চলছে। সবুজ বন-বনানী, বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ, পাখ-পাখালির কলতান, ধূসর পর্বতশ্রেণী, দিগন্তজোড়া নীলাকাশ, বরফাচ্ছাদিত পাহাড়, ঝড়ো হাওয়া, সমুদ্রের গর্জন, ঊষর মরভূমি, মেঘের নানা ধরণ, সূর্যাস্ত, সূর্যোদয়, চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্র, নিকষকালো অন্ধকার, আলোর উজ্জ্বলতা, কলকল্লোলিনী নদী, ঝর্ণাধারা, দক্ষিণা বাতাস, নানা জাতের নানা রকম ফুলের সৌরভ, আরো বিস্ময় করার মত কত কি! এসব কিছুকে গভীরভাবে মন দিয়ে দেখা, চিন্তা করা, অংকন ও লিপিবদ্ধকরণই আমার দৃষ্টিতে প্রকৃত শিল্প-সাহিত্য।
মানুষ যখন গভীরভাবে স্রষ্টার সব সৃষ্টি নিয়ে ভাবেন, নিঃসন্দেহে সে আলোড়িত হয়, হয় আন্দোলিত। মানুষ যতই এই অসীম সৃষ্টিকে নিয়ে চিন্তা করেন, জানার চেষ্টা করেন ততই প্রকৃতির শোভা তাকে বিমুগ্ধ করে। মানুষের এই দর্শণ-দৃষ্টিভঙ্গি বরাবরই তাকে সু-উন্নত করে তোলে। প্রকৃতির নানা রং-রস ও শব্দ সম্ভার হতে মানুষ পায় শৈল্পিক প্রেরণা ও ছান্দনিক দ্যোতনা। আর এমনি করে সৌন্দর্য প্রীতিও মানুষের মধ্যে জাগ্রত করে ছন্দময় অনিন্দনীয় কথামালা এবং ব্যক্ত করার উদ্দীপনাও লাভ করে মানুষ। উদ্ভব ঘটে শিল্পী, কবি-সাহিত্যিক ও অন্যান্য ক্ষেত্রেও মেধা-মননের। ওইসব শিল্পী, কবি, সাহিত্যিক-ই ভাবের রাজত্বে প্রকৃতির রূপ-সৌন্দর্যকে আলিঙ্গন করে আত্মিক সম্ভারে ছবি আঁকেন-চিন্তা করেন, শব্দের সুষমা দ্বারা শব্দ-বাক্য সাজান এবং সেই আহরিত বিষয়ের গাঁথুনিতে থাকে লালিত্যমাখা অবাক করা সব বিষয়। এমনি করে ধারাবাহিক অনুশীলনে মানুষ নিজ নিজ শক্তির দ্বারা হয়ে ওঠেন শিল্পী, কবি-সাহিত্যিক ও অন্যান্য মেধা-প্রতিভার অধিকারী। নান্দনিক সব শিল্পকর্মে ফুটেওঠে বিমূর্ত চিত্র, নিমার্ণ হয় কবিতা এবং অন্যসব সাহিত্যের শাখা-প্রশাখায়ও মানুষই সৃষ্টির সেরা জীব-এ চির সত্য কথাটি প্রমাণিত হয়।
এখানে বলে রাখা ভালো, এসব শিল্পিত কাজ হতে হয় নির্জলা সত্য-সুন্দর ও আলোকময়। প্রতিটি বিন্যাসিত কর্মকাণ্ডে থাকা বাঞ্জনীয় অপার সৌন্দর্য, জীবনবোধ, মূল্যবোধের স্বরূপ, কল্যাণকর উপাদান, ছান্দিক মূল্য, নিমার্ণশৈলি, ব্যঙময় উপস্থাপন সর্বোপরি সু-শৃংখলতার অনন্য এক উপমা। যদি এসবের ব্যতিক্রম হয়ে কোন ব্যক্তি-গোষ্ঠী ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে সমাজ ও রাষ্ট্রীয়জীবনে শিল্প-সাহিত্যচর্চার নামে অন্য কিছুকে চালিয়ে দিয়ে এর কলুষতার বিষবাস্প ছড়ায়, ছড়ায় পাপ-পঙ্কিলতা তা শিল্প-সাহিত্য তো নয়ই বরং তা অতি ভয়ঙ্কর পাপ বলেই পরিগনিত হয়। ব্যক্তি জীবনে সৃজনশীলতার চর্চা ব্যতিত শুধু লেখনিতে তা ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেয়া দস্তুরমত এক ধরনের বড় রকমের শঠতা বলে আমি মনে করি। এসব ভণ্ডামীতে কিছু সাধারণ মানুষ আবেগপ্রবণ হতে পারে, উৎফুল্লচিত্তে চেঁচামেচি শুরু করতে পারে কিছু সংখ্যক মূর্খ ভন্ডদের নিয়ে, আসলে এতে করে দেশ-জাতি তেমন কিছুই পায় না সর্বনাশ ছাড়া।
সাধারণ্যের দৃষ্টিতে জাগতিক ও বাস্তববাদী বিষয়গুলো নিয়ে শিল্প-সাহিত্য অংকিত হয়। যা ভাসা ভাসাভাবে মানুষকে নাড়া দিতে পারে। প্রকৃতপক্ষে সূফীবাদী শিল্পীত মন বিচরণ করে নিন্মজগৎ, উর্ধ্বজগৎ, আত্মারজগৎ, আধ্যাত্মিক ভূবন, দেহতত্ত্ব, ইহকাল ও পরকালের গভীর বিষয়সমূহ। মোদ্দাকথা, প্রকৃত সাহিত্য ভাণ্ডার কুরানুল কারীমের কাছে সৃজনশীল মানুষ নিজেকে আত্মসমর্পণ করে জ্ঞানসাগরের আস্বাদন লাভ করে। ওই সব সৃষ্টিশীল মানুষদের শিল্প-সাহিত্যচর্চা মানুষের কল্যাণে হয় নিবেদিত প্রাণ। সাধারণ শিল্পী-সাহিত্যিকগণ সাধারণভাবেই জীবন চালনায় অভ্যস্ত হয়ে থাকে। একটি নির্দিষ্ট গণ্ডি ও সমাজের মধ্যেই তাদের হয় বিচরণ। আত্ম তুষ্টিতেও ভোগে ওই সকল মূর্খরা। প্রকৃত স্রষ্টাপ্রেমী শিল্প-সাহিত্য অনুশীলরতরা সৃষ্টিকর্তাকে পাওয়ার নেশায় বিভোর হয়ে স্রষ্টাপ্রেমে মজে যায়; একাকার হয়ে যায় সৃষ্টিকর্তার সকল সৃষ্টির মাঝে। চর্মচক্ষু নয় অর্ন্তদৃষ্টি ও প্রভুর কৃপা লাভই হয় তাদের মূল লক্ষ্য।
তারা জীবনভর জীবের কল্যাণের জন্যই কাজ করেন-খ্যাতি কিংবা অন্যকিছুর জন্য নয়। জীবনের পরতে পরতে আল্লাহর নেয়ামতকে তারা তুলে ধরেন তাদের শৈল্পিক কর্মকাণ্ডে-স্রষ্টাকে পাওয়ার জন্যই। নিজেদের জীবনের পাশাপাশি অন্যদের জীবনেও অনুধাবন করাতে সক্ষক হন-অহেতুক সৃষ্টিকর্তা সৃষ্টি করেননি এই অসীম জগৎ, তেমনি সকলের জীবনের সকল ক্ষেত্রে রয়েছে বিশাল জবাবদীহিতা, কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর থাকে ভয় তাদের অন্তরে। যে কারণে তারা নিজেরা যা বলেন- যা লেখেন তা নিজেদের জীবনে সর্বাগ্রে বাস্তবায়ন করেন এবং নিজেরাই নিজেদের জন্য হন সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ-দৃষ্টান্ত হয়ে সুবাস ছড়িয়ে দেন সর্বত্র। আর এর নামই হয় প্রকৃত শিল্প-সাহিত্য। আল্লাহ তায়লা আমাদের প্রত্যেককে তা বোঝার ক্ষমতা দান করুক। এই আমাদের প্রার্থনা।

Check Also

মাদকসন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সরকারকেই জোরালো ভূমিকা নিতে হবে

—-মো. আলীআশরাফ খান লেখার শিরোনাম দেখে হয়তো অনেকেই ভাবতে পারেন, কেনো লেখাটির এমন শিরোনাম দেয়া ...

Leave a Reply