কুমিল্লায় বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের দুর্দশার প্রকৃত চিত্র

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী,কুমিল্লা :

০ কুমিল্লায় ২২ হাজার শিশু শ্রমিক ঝুকিঁপূণ কাজে জড়িত

০ ভাসমান শ্রমিকদের র্দুদশা

০ শ্রমিকরা বৈষম্যের শিকার

০ ইপিজেড নারী শ্রমিকরা বেতন বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার

০ নারী শ্রমিকরা কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার

০ কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের মৃত্যু

০ নির্যাতিত হচ্ছে গৃহপরিচারিকারা

শ্রমিকরা যুগে যুগে কর্মক্ষেত্রে নির্যাতিত হয়, হয় বেতন বৈষম্যের শিকার। এটাই যেন তাদের নিয়তি। ১৮৯০ সাল হতে প্রতিবৎসর পহেলা মে শ্রমজীবী মানুষের চেতনার বারুদে দিপ্তি সবচেয়ে শক্তিশালী অগ্নি স্ফুলিঙ্গের নাম- মহান মে দিবস বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে। মহান মে দিবসের মত ঐতিহাসিক দিবসের জন্ম দিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিকদের সময় লেগেছিল ২০২ বছর। মহান মে দিবসের মূল দাবি ছিল দৈনিক ৮ ঘন্টা কাজ। কিন্তু এখনো সারা দেশের মত কুমিল্লার অনেক শ্রমিকরা ৮ ঘন্টার বদলে ১২/১৪ ঘন্টা কাজ করতে বাধ্য হয়, তাছাড়া বেতন ভাতা ও সঠিকভাবে পায় না। তাছাড়া অনেক শ্রমিক নির্যাতনেরও শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত। কুমিল্লার বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে নারী,পুরুষ ও শিশু শ্রমিকের র্দুদশার বিভিন্ন চিত্র নিয়ে নিম্নের এই প্রতিবেদন।

কুমিল্লায় ২২ হাজার শিশু শ্রমিক ঝুকিঁপূণ কাজে জড়িতঃ

শিশু শ্রম আইনত নিষিদ্ধ হলেও কুমিল্লায় পরিবহন, ওয়েল্ডিং, হোটেলসহ বিভিন্ন সেক্টরের সঙ্গে জড়িত শিশু শ্রমিকের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। বিভিন্ন এনজিওর সূত্রমতে, এর সংখ্যা প্রায় ২২ হাজার। ২০০২ সালে সরকার ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় শিশুশ্রম নিরসনে একটি প্রকল্প হাতে নিলেও কুমিল্লা শহরে এর অস্তিত্ব চোখে পড়েনি। কুমিল্লা শহর ও বিভিন্ন উপজেলায় সরেজমিন পরিদর্শনকালে শহরের চকবাজার, টমছমব্রীজ ও শাসনগাছা আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল, চকবাজার, শাসনগাছা, রাণীর বাজার, কাপ্তান বাজার, পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড, মুদাফফরগঞ্জ, বরুড়া, পানুয়ারপুল, চান্দিনা, মাধাইয়াসহ জেলার বিভিন্ন স্থানের লোকাল বাস ও টেম্পু, অটোরিক্সা ষ্ট্যান্ড ঘুরে দেখা যায় প্রতিদিন শত শত শিশু-কিশোর বাস, টেম্পু, অটোরিক্সাসহ বিভিন্ন পরিবহনে কাজ করছে। এদের মধ্যে চালকের সংখ্যা কম হলেও কন্ডাক্টর সহকারীর সংখ্যাই বেশি। কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড থেকে ময়নামতি সেনানিবাস এলাকায় যাতায়াতকারী প্রায় শতাধিক লক্কর-ঝক্কর গাড়ির (পুরাতন মাইক্রোবাস) সামান্য সংখ্যক চালক কিশোর বয়স্ক হলেও অধিকাংশের সহকারীই শিশু। যাদের প্রায় অধিকাংশের বয়স ১৩/১৪ বছরের মত। একইভাবে জেলার অন্যান্য এলাকাগুলোর চিত্রও অভিন্ন। সূত্র মতে, ২/৩ বছর পূর্বেও বিভিন্ন পরিবহনের সাথে শিশু শ্রমিকদের সম্পৃক্ততা কম হলেও বর্তমানে তা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে সূত্র জানায়, বর্তমানে ২/৩ বছর পূবের্র চেয়ে গাড়ির সংখ্যা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পাওয়ায় এ অবস্থা। তছাড়া একজন যুবক বা বয়স্ক লোককে দিয়ে একই কাজ করাতে যেখানে ১৫০-২০০ টাকার প্রয়োজন সেখানে কম বয়সের একটি শিশুকে দিয়ে ৭০-৮০ টাকায় একই কাজ করানো যায়। ফলে ইচ্ছাকৃতভাবেই বহু গাড়ির মালিক শিশু শ্রমিকের দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে। এছাড়াও প্রায় সকল শিশুই দরিদ্র পরিবারের সন্তান। কাজ করে অর্থ আয়ের মাধ্যমে সংসারের অভাব অনটন দূর করতে তাই এসব পরিবারের অভিভাবকরাও তাদের সন্তানদেরকে এ সকল ঝুঁকিপূর্ণ কাজে পাঠাতে দ্বিধা করে না। কুমিল্লা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া রুটের কুটিতে চলাচলকারী একটি বাসের ১৪ বছরের হেলপার (নাম বলতে রাজী হয়নি) জানায়, প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একটানা পরিশ্রম করতে হয়। রোদ-বৃষ্টি, ঝড় কোন কিছুই তার কাজে বাধার সৃষ্টি করে না। তাকে প্রতিদিনই যথারীতি ভোর বেলায় কর্মস্থলে চলে আসতে হয়, না আসলে হয়তো তাকে উপোস থাকতে হবে। একই অবস্থা তার মত অসংখ্য শিশুর। তারাও একইভাবে পেটের তাগিদে কর্মস্থলে ছুটে আসে। সূত্র জানায়, এ শিশু শ্রমিকরা শুধু পরিবহনের সহকারীর কাজ করেই ক্ষান্ত হয় না। এর বাইরে মালিক, ওস্তাদ (ড্রাইভার) সহ বিভিন্ন জনের ফরমায়েসও খাটতে হয়। তাছাড়া পরিশ্রমের সাথে সাথে নগদ টাকা হাতে আসায় এ সকল শিশু কিশোর খুব অল্প বয়স থেকেই ধুমপানসহ বিভিন্ন মদ সেবন ও অসামাজিক কাজে জড়িয়ে পড়ে। এছাড়াও জেলায় বিভিন্ন স্থান থেকে ওয়ার্কসপ, সেলুনসহ ফুটপাতের নানা স্থানে অসংখ্য শিশু কিশোরদের শ্রম বিক্রি করতে দেখা যায়।

মোশারফের বয়স আট। সালাউদ্দিনের নয়, কালাম আর হাবিবুল্লার ১২। বয়সে ছোট বলে ওরা কেউ ভালোভাবে রিক্সা প্যাডেলের নাগাল পায় না। তবু ওরা পেটের তাগিদে কুমিল্লা মহানগরের বিভিন্ন রোডে রিক্সা চালায়। বহু কষ্টে প্যাডেল ঘুরিয়ে সচল রাখে সংসারের চাকা। মোশারফ, কালাম, হাবিবুল্লার মতো আরো অনেক শিশু রয়েছে যারা রিক্সা চালায়। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তারা স্কুলে যেতে পারে না। এদের দু’একজন কিছুদিন প্রাথমিক স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। ওদের রিকশায় চড়ে অন্যরা স্কুলে যায়। ওদের সমবয়সী শিশুরা তাদের বাবা-মায়ের সঙ্গে স্কুলে যায়। সুবিধাবঞ্চিত এই শিশুরা, বলছে, পরিবারের আর্থিক টানাপোড়েনের কারণেই তাদের রিক্সা চালাতে হচ্ছে। সারা দিন রিক্সা চালিয়ে যা মেলে তার একটা বড় অংশ দিতে হয় গ্যারেজ মালিককে। বাকি টাকা নিয়ে ঘরে ফিরে তুলে দেয় সংসারের বড়দের হাতে। কিন্তু দেখা গেছে, এই শিশু রিকশাচালদের বেশির ভাগই প্যাডেলের নাগাল পায় না। তাই চালকের সিট থেকে সামানে দিকে এসে নিচের দিকে ঝুলে প্যাডেল চালাতে হয়। এ কাজে কষ্ট হয় কি না-জানতে চাইলে আট বছরের আলাল বলে, কষ্ট অইলেও তো চালাতে অইব, কষ্ট না করলে খাব কি করে। বারো বছরের হাবিবুল্লা জানায়, বিভিন্ন সড়কে রিক্সা চালিয়ে পকেটে আসে ৮০-১০০ টাকা। গ্যারেজ মালিককে দিতে হয় ৪০ টাকা। বাকি টাকায় সংসার চলে। নবীয়াবাদ গ্রামের হাবিবল্লাহ জানায়, তার বাবা মারা গেছেন বছর দুই আগে। তারপর থেকে আমার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু হাবিবুল্লা জানায়, পড়তে তো মন চায়, টাকা না থাকলে পড়বো কি করে? রিক্সা চালিয়ে যে টাকা রোজগার করি, সে টাকা দিয়ে সংসার চালাতে কষ্ট হয়। মোশারফ, কালাম জানায়, বাবা-মায়ের কষ্ট তাদের সহ্য হয় না। রিক্সা চালালে নগদ টাকা পাওয়া যায়, এবং ঠিকমত খাওয়া পাওয়া যায়, তাই তারা রিক্সা চালায়। বাংলাদেশ জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে স্বাক্ষর দানকারী প্রথম সারির রাষ্ট্রসমূহের একটি। ১৯৯০ সালে অনুষ্ঠিত শিশু সম্মেলনে জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে শিশু সম্পর্কে যে নীতি ছিল, তার অন্যতম হল শিশুদের ক্ষেত্রে সকল ধরনের বৈষম্যের অবসান, শিশু অধিকারকে তুলে ধরা, শিশুর বেঁচে থাকা ও উন্নয়নে সরকারের ভূমিকা পালন করা। কিন্তু র্দুভাগ্যের বিষয়,আজো হাজার হাজার শিশু তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত।

ভাসমান শ্রমিকদের র্দুদশাঃ

কুমিল্লার ভাসমান অসংখ্য শ্রমিকের এখন অনেকেরই একদিন কাজ আছে তো আরেকদিন নেই। এসব শ্রমজীবী মানুষরা দু’বেলা খাওয়ার জন্য বেছে নেয় অনেক ঝুঁকির কাজ। তবুও এই সব শ্রমজীবী মানুষরা তাদের ন্যায্য অর্থ পায় না ঠিকমত। কিছু বলতেও পারে না তারা, যদি কেউ কিছু বলতে চায় বাদ দেওয়া হয় কাজ থেকে। জীবনের এইসব নিয়ম মেনেই শ্রমজীবী মানুষ একটু খেয়ে পরে বেঁচে থাকার জন্য কাজ করে। এই সব শ্রমজীবী মানুষের দিন ২০০/২৫০ টাকা দেওয়া হয়। তাছাড়া নারীদের ১৫০-১৮০ টাকা দাম দেওয়া হয়, এখানে থাকে অদ্ভূত বৈষম্য। যদিও নারী শ্রমিক ৪/৫ জনের বেশি দেখা যায়না। এসব শ্রমজীবী নারী পুরুষ সকাল থেকে বসে থাকে কাজের আশায় । আবার ২-৪ দিন বসে থেকেও কাজ পায় না তারা। এমনই কিছু শ্রমজীবী নারী-পুরুষ এর সাথে কথা হয়। কান্দিরপাড় টাউন হলের সামনে কথা হয় নির্মাণ শ্রমিক আবু জাফরের সাথে। তিনি জানান, গত দুইদিন ভোর ৫টার দিকে এসে বসে থাকলেও কাজ জোটেনি। শহরের কান্দিরপাড়ে প্রতিদিন প্রায় তিনশত ভাসমান শ্রমিক আসে বলে তিনি জানান। তার মতে, শত খানেক শ্রমিক এখান থেকে কাজ নিয়ে শহরের বিভিন্ন পয়েণ্টে যায়। বাকিরা বেকার থেকে যায়। শ্রমিকের চাহিদা আগে বেশি থাকলেও এখন কমে এসেছে। আগে একজন শ্রমিক দিনে সাড়ে ৩শ টাকা পর্যন্ত পেতেন। এখন তা কমে ২৫০/২৮০ টাকায় চলে এসেছে। আবু জাফর বলেন, কাজ ছাড়া আমাদের একদিন চলে না। সে জায়গায় আমি যদি তিনদিন বেকার থাকি তাহলে সংসার চালাবো কেমনে? কান্দিরপাড়ে যেসব শ্রমিক কাজের জন্য অপেক্ষা করেন তাদের অবস্থা করুণ। উল্লেখ্য, শহরে সাধারণত ভাসমান শ্রমিকরা মাটি কাটা, রাজমিস্ত্রি, রংমিস্ত্রি, কার্পেন্টার, মালামাল পরিবহন প্রভৃতি কাজ করে থাকেন। এদের অধিকাংশ থাকেন শহরের শাসনগাছা,ঢুলিপাড়া,মফিজাবাদ কলোনি ও টমছমব্রীজের আশেপাশে। জানা গেছে, ভাসমান শ্রমিকদেরকে নিয়ে একটি দালাল চক্রও গড়ে উঠেছে। একজন দালালের অধীনে ২০ থেকে ৩০ জন শ্রমিক থাকে। কারো শ্রমিকের প্রয়োজন পড়লে দালালের সাথে যোগাযোগ করতে হয়। দিনমজুর ফারুক জানান, কাজ পেলে দালালকে কাজভেদে ২০ থেকে ৩০ টাকা দিতে হয়। এতে টাকা আরো কমে যায়। এমনই র্দুবিসহ জীবনযাপন করছে কুমিল্লার কয়েকশত ভাসমান শ্রমিক।

শ্রমিকরা বৈষম্যের শিকারঃ

করাতকল শ্রমিক ইউনিয়নের একজন শ্রমিক জানান, মিলস্ গুলোতে আমরা চাকুরী করে অনেক হয়রানি শিকার হচ্ছি, বেতন ভালভাবে পাই না। ৮ ঘন্টা জায়গায় ১২-১৩ ঘন্টা কাজ করতে হয়। বিদ্যুৎ যতক্ষন না থাকে এই সময় টুকু পরে করতে হয়। তাছাড়া মালিকের র্দুব্যবহার তো আছে। আমাদের কোন শ্রমিক যদি শারিরীক ভাবে আহত হয় তাকে চাকুরী থেকে বাদ দেওয়া হয়। তাছাড়া বেতন ও দেওয়া হয় না। আমাদের জীবনের ঝুঁকি ভাতা দেওয়া হউক।

এছাড়া কৃষি শ্রমিকদের মজুরি বেতন কাঠামো নিয়ে ভাবনা আমাদের কম মানুষেরই আছে। গার্মেন্টস ও দোকান কর্মচারীসহ বহু অসংগঠিত সেক্টরের শ্রমিক-কর্মচারীদের নিয়োগপত্র নেই। নির্মান এবং ওয়েল্ডিং ফ্যাক্টরিসহ বহু কর্মস্থল রয়েছে যেখানে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নেই। আট ঘন্টা কাজ করার বিধান থাকলেও বিভিন্ন কৌশলে ১০-১৪ ঘন্টা কাজ করিয়ে নেয়া হয়। এজন্য অনেক ক্ষেত্রেই কোন প্রকার ওভার টাইম দেয়া হয় না।

ইপিজেড শ্রমিকরা বেতন বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকারঃ

কুমিল্লা ইপিজেডে প্রায় ১৮ হাজার নারী-পুরুষ শ্রমিক রয়েছে। কুমিল্লা ইপিজেডের শ্রমিকরা সর্বক্ষেত্রেই বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। প্রায় সময়ই তাদের ওভারটাইম করতে হয়। পারিশ্রমিক অনুযায়ী বেতন পায়না বেশিরভাগ শ্রমিকই। কোম্পানি মালিকদের র্দুব্যবহার ও নির্যাতন তো রয়েছে। আবার যখন-তখন চাকরি থেকে ছাটাইয়ের ভয়ে আতংকিত থাকে শ্রমিকরা। যেমন,২০০৯ সালের ৯ জুলাই কোরিয়ান ইয়াং থাই কোম্পানি বন্ধ হয়ে ৮৫০ শ্রমিকরা চাকরি হারায়। এসব শ্রমিকরা এ কোম্পানিটি বন্ধ হওয়ার ৬/৭ মাস পূর্ব থেকেই বেতন কম পাচ্ছিল,শ্রমিকরা নির্ধারিত বেতনের চেয়ে ৪০০/৫০০ টাকা করে কম পেয়েছিল। ২০১০ সালের ২৪ জানুয়ারী বিকেল বেলায় ১৪৬ জন শ্রমিক কাজ শেষে ব্লুজম ফ্যাক্টরি থেকে বেরিয়ে দেখেন ছাঁটাইয়ের নোটিশ। ১৪৬জন শ্রমিক এ নোটিশ দেখে হতভম্ব হয়ে পড়েন। শ্রমিকরা জানান, কোন পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই তাদের ছাঁটাই করা হয়। তারা তাদের প্রকৃত পাওনা দাবি করেন। লোকসানের অজুহাতে ১৪৭ জনকে ছাঁটাই করা হয়। এভাবে শ্রমিকরা ছ্টাাই হয়ে থাকে। তাছাড়া কোম্পানির মালিকদের দুর্ব্যবহারও শুনতে হয় তাদের, অনেক সময় অমানষিক নির্যাতন চালানো হয় শ্রমিকদের উপর। তারপরও জীবনের তাড়নায় তারা এসব কোম্পানিতে কাজ করে।

নারী শ্রমিকরা কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য ও যৌন নির্যাতনের শিকারঃ

কুমিল্লা জেলার বিভিন্ন কারখানাগুলোতে কর্মরত শ্রমিকদের অধিকাংশই নারী। এদের বেতন খুবই কম। এছাড়া কাজের পরিবেশও তাদের সহায়ক না। বলতে গেলে অধিকাংশ গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতেই স্বাস্থ্যকর পরিবেশ থাকে না। অন্যদিকে নারী শ্রমিকদের উপর যৌন হয়রানি তো নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিনত হয়েছে। এ নির্যাতনের বিচার পাওয়ার কোন ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। চাকরি হারানোর ভয়ে, বেঁচে থাকার একমুঠো অন্নের জন্য সব কিছু চুপ করে মেনে নিয়েই তাদের কাজ করতে হয়। কুমিল্লা ইপিজেডে প্রায় ১৮ হাজার শ্রমিক কাজ করছে এর মধ্যে প্রায় ৮ হাজার হলো মহিলা শ্রমিক। তারা তিন শিফটে কাজ করছে, যেমন সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৫টা, বিকাল ৫টা থেকে রাত ৯টা, কেউ আবার বিকাল ৫টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত কাজ করছে। তাদেরকে আবাসিক কোন জায়গা দেওয়া হয় না। তারা অনেক দূর থেকে বাস, টেম্পু, পায়ে হেটে ইপিজেডে আসে কাজ করার জন্য। তাদের সর্বোচ্চ বেতন ৪৫০০ হাজার টাকা, সর্বনিম্ন ১১০০ টাকা। তারপর আবার কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেলে তখন বেকার হয়ে যায়। রহিমা নামে একজন ইপিজেড শ্রমিক জানান, আমাদের বেতন খুবই কম, জীবন চালানো খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে। তাছাড়া মালিকদের র্দুব্যবহার শুনতে হয় সব সময়। ব্যবহার ও বেতন বৈষম্য ছাড়াও নারী শ্রমিকরা কর্মক্ষেত্রে আসা-যাওয়ার সময় বিভিন্ন বখাটেদের উৎপাতের শিকার হয়। বখাটেদের কু-প্রস্তাবে রাজি না হলে নির্যাতনের শিকার হতে হয়। তার পরেও কাজ পাওয়ার জন্য দরিদ্র মানুষের চেষ্টার কোন শেষ নেই। দুবেলা দুমুঠো ভাত পাবে এ আশায় পিতা-মাতা তাদের সন্তানকে কাজের লোক হিসেবে পাঠায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এদের কোন নির্দিষ্ট বেতন নেই।

কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের মৃত্যুঃ

শ্রমিকরা কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন হয়রানির পাশাপাশি অতিরিক্ত চাপে কিংবা ঝুকিঁপূর্ণ কাজ করতে গিয়ে প্রায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। তাদের মৃত্যুতে পরিবারের আর্থিক অনটনের পাশাপাশি দুর্দশার শেষ থাকেনা। যেমন, ২০১০ সালের ১৪ জানুয়ারী সকাল ১০টায় মহানগরের বাগিচাগাঁও খাঁ বাড়ির উত্তর পাশের ৯তলা ভবনে কাজ করার সময় মাচা থেকে পড়ে গিয়ে শরীফ উদ্দিন (৩৫) নামের এক নির্মাণ শ্রমিক নিহত হয়। নিহত শ্রমিকের বাড়ি চাপাইনবাবগঞ্জে। ২০১০ সালের ৭ নভেম্বর কুমিল্লার দাউদকান্দির সোলাকান্দি চকে প্রধানমন্ত্রীর উদ্ভোধনের অপেক্ষায় ৫০ মেঘাওয়াট পিকিং পাওয়ার প্লান্টে কাজ করতে এসে অতিরিক্ত কাজের চাপে গাইবান্দা জেলার হেলাল নামের এক শ্রমিক অচেতন হয়ে ঢলে পড়লে তাকে গৌরীপুর হাসপাতালে ভর্তি করা হলে হাসপাতালের কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষনা করে। ডাক্তার কমলেশ চন্দ্র ভৌমিক জানায় অতিরিক্ত কাজের চাপেই নির্মান শ্রমিক হেলাল মারা যায়। ২০১০ সালের ১৮ জুলাই বিকাল ৫ টায় দেবিদ্বার উপজেলা সদরের নিউমার্কেটের অদূরে বানিয়ারা গোমতী আবাসিক এলাকার নির্মাণাধীন স্থানীয় অননুমোদিত ফেয়ার ডেভেলপার নামের একটি নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের দ্বি-তল ভবনের পাশে ওই ভবনের জন্য নির্মিত একটি সেফটি ট্যাংকির সেন্টারিং মালামাল উত্তোলনের জন্য প্রথমে শফিকুল ইসলাম নামের একজন নির্মাণ শ্রমিক ট্যাংকির ভেতরে প্রবেশ করে। এ সময় তার চিৎকার শুনে অপর ৩ শ্রমিক তাকে বাঁচানোর জন্য ট্যাংকিতে নামলে বিষাক্ত গ্যাসে মুহুর্তের মধ্যেই ৪ শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। নিহতরা হচ্ছে, দেবিদ্বার উপজেলা সদরের শাহজালালের পুত্র শফিকুল ইসলাম (২৭), হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচংয়ের মোঃ হোসেন (৩০), একই উপজেলার তারাগাঁও গ্রামের মিজানুল হক (২৫) ও দেবিদ্বার উপজেলার বারেরা গ্রামের আবু তাহেরের পুত্র মকবুল হোসেন (২৭)। নিহত ৪ শ্রমিকের স্বজনদের আহাজারীতে ঘটনাস্থলে হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারনা ঘটে। এভাবে কর্মক্ষেত্রে অনেক শ্রমিক কাজ করতে এসে মৃত্যুর পথে ধাবিত হয়। আর এই শ্রমিকদের সাথেই অহরহ করা হচ্ছে নানা বৈষম্য।

নির্যাতিত হচ্ছে গৃহপরিচারিকারাঃ

সকালের চা থেকে রাতে বালিশটিতে পর্যন্ত যাদের সেবার ছোঁয়া লেগে থাকে; যাদের ঘাম ঝরানো পরিশ্রমের সুবাদেই ঠিকঠাক রাখতে পারা সম্ভব হয় আমাদের দৈনন্দিন ব্যস্ত রুটিন, যাদের যতেœ লালনে সারজল পেয়ে বেড়ে ওঠে আমাদের জীবন আঙ্গিনার শান্তি বৃক্ষটি- এরা কারা? এরাই হচ্ছে কাজের লোক অর্থাৎ গৃহ পরিচারিকা। যাদের ছাড়া আমাদের এক মুহূর্ত চলে না । সেই গৃহপরিচারিকারা নিয়মিত গৃহমালিকদের নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। অনেক সময় নির্যাতনের কারণে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। কুমিল্লায় এসব নির্যাতনের ঘটনা অহরহ ঘটছে। যেমন,কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার সদরে গত ২০১০ সালের ২রা এপ্রিল বুড়িচং আনন্দ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের (অবঃ)শিক্ষক মৃত আলিম মাষ্টারের বাসার ষোড়শী (১৬ )বছরের গৃহপরিচারিকা কাজলের রহস্যজনক মৃত্যু হয়। স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা যায়,প্রায় ৭/৮ বছর পূর্বে কুমিল্লা জেলার বাহ্মণপাড়া উপজেলার বাহ্মণপাড়া গ্রামের মৃত মফিজুল ইসলাম প্রকাশ ভূইয়া মফিজের দ্বিতীয় স্ত্রীর মেয়ে আকলিমা আক্তার(কাজল)এর পিতার মৃত্যুর পর বাসার ঝিয়ের কাজ নিয়ে বুড়িচংয়ের আলিম মাষ্টারের বাসায় আসেন। কিশোরী পেড়িয়ে ষোড়শী যৌবনে পা দেয়া সুন্দরী কাজলের প্রতি কুনজর পড়ে গৃহকর্তার বখাটে ছেলে আলী ইব্রাহিম(ইমন)(২৮)এর। ইমন কাজলকে ঘর বাধার প্রলোভন দেখিয়ে জোরপূর্বক তার অসৎ উদ্দেশ্য হাসিল করে নেয়। কাজলের সাথে ইমনের অবৈধ সর্ম্পক ইমনের বড় বোনের কাছে ধরা পড়লে কাজলকে শারিরীক নির্যাতন করে বাসা থেকে বের করে দেয়া হয়।এরইমধ্যে কাজল অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে পুনরায় ওই বাসায় এসে ইমনের সাথে সর্ম্পকের কথা সবাইকে জানালে তার জীবনে নেমে আসে শারিরীক নির্যাতন ও প্রতি মুর্হূতে মৃত্যুর ভয়। তাকে গর্ভের সন্তান নষ্ট করার জন্য চাপ দেয়া হলে সে প্রতিবাদ জানায়। এরপর কাজলকে মারধর করে জোরপূর্বক মুখে বিষ ঢেলে,পরে ওড়না দিয়ে ফাসিঁতে ঝুলিয়ে রেখে আতœহত্যা বলে সবার কাছে প্রচার করেছে ইমনের পরিবার। এদিকে বুড়িচং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপেক্স এর কর্তব্যরত ডাক্তার ও নার্স প্রতিবেদককে জানায়, গত ২রা এপ্রিল সন্ধ্যা সাড়ে ৭ টায় মেয়েটিকে জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হলে কর্তব্যরত ডাক্তার কাজলকে মৃত ঘোষণা করে। পরদিন ৩ই এপ্রিল তড়িঘড়ি করে কাজলকে কবর দেয়া হয়।স্থানীয় একটি অপশক্তি কাজলের হত্যার ঘটনাটিকে আতœহত্যা বলে চালিয়ে দিয়ে প্রকৃত সত্য গোপন করেছে বলে জানা গেছে। ২০১০ সালের ১১ জানুয়ারী সকালে শহরের সদর হাসপাতাল রোড এলাকায় কুমিল্লা বরুড়ার যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা রাশেদুর আলমের বাসার কাজের মেয়ে জেসমিন আক্তার (১৬) খুন হয়। পুলিশ সূত্রে জানা যায়,গৃহকর্তা রাশেদুল ও স্ত্রী মিতু প্রায়সময় কাজের মেয়ে জেসমিনকে নিযার্তন করতো। ঘটনার আগেরদিন সন্ধ্যা ৭টা থেকে বাসায় জেসমিন আক্তারকে পাওয়া যাচ্ছে না মর্ম্মে রাত ৮টায় কোতয়ালী থানায় একটি মামলা করেন গৃহর্কতা রাশেদুল আলম। পরদিন সোমবার ভোরে স্থানীয়রা রাশেদুর আলমের নিচতলায় জেসমিন আক্তারের লাশ দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে জেসমিন আক্তারের লাশ উদ্ধার করে ও জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য গৃহর্কতা রাশেদুর আলমকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে। নিহত জেসমিন আক্তারের বাড়ি বরুড়ার পাস্তুবি গ্রামে । পরে অদৃশ্য কোন এক কারণে মামলাটি অন্তরালে চলে যায়। হত্যা ছাড়াও গৃহ মালিকরা প্রায় নানা কারণে গৃহপরিচারিকাদের মারধর ও আগুনে ঝলসে দিচ্ছে। এক্ষেত্রে নির্যাতিতরা অসহায় ও আথির্ক ক্ষেত্রে দুর্বল বিধায় আইনি সহায়তা পাচ্ছেনা আর মামলা হলেও বিত্তবানদের টাকার কাছে তারা হার মেনে যাচ্ছে।

সব মিলিয়ে পুরুষ ও নারী শ্রমিকরা শ্রম আইন অনুযায়ী তাদের প্রাপ্য পাচ্ছেনা। তাছাড়া নানা দিক থেকে তারা বৈষম্যের শিকার। আর মৃত্যুর ঝুকিঁও তাদের প্রতিনিয়ত তাদের তাড়া করছে।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply