কুমিল্লায় ভাষা সৈনিক শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের স্মৃতিচিহ্ন বিলীন হওয়ার পথে

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী,কুমিল্লা :

ভাষা সৈনিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত সবসময় একটা উক্তি করতেন,- বাংলা ও বাঙ্গালীকে আমি কখনো ছেড়ে যেতে পারবোনা’। তিনি তার কথা রেখেছেন, বাংলাকে ছেড়ে কোথাও যাননি। পাকিস্তানের গণপরিষদে বাংলা ভাষার প্রথম প্রস্তাবকারি কুমিল্লার সূর্যসন্তান ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলা ভাষার প্রস্তাবের জন্য পাক সরকারের রোষানলে পড়ে পাক হায়েনাদের হাতে নিমর্মভাবে খুন হন। বাংলা ভাষার জন্য জীবন উৎসর্গকারী ভাষা সৈনিক শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের স্মৃতি আজ বিস্মৃতির পথে। অবহেলা অনাদরে ভাষা সৈনিক শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের স্মৃতিচিহ্ন তার বাড়িটি ভঙ্গুর হয়ে ক্রমেই বিলীন হওয়ার পথে। এ স্মৃতিচিহ্ন রক্ষায় এখনি পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো একসময় জানবেই না এই গুণী ব্যক্তি কুমিল্লায় জন্ম নিয়েছেন, বা কুমিল্লায় তাঁর বিচরণ ও পদচারণা ছিল।
ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের স্মৃতিসম্বলিত বসবাসের বাড়িটি সংরক্ষণের অভাবে ধবংসের পথেঃ

ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ধর্মসাগর দীঘির পশ্চিমপাড়ে ভূমি কিনে একটি টিনের আটচালা বাড়ি করেন। এই বাড়িতেই তিনি আজীবন কাটিয়েছেন। তার বাড়িটি আজ পড়ে আছে চরম অবহেলায়। বাড়িতে রয়েছে ৬ টি কক্ষ, বাড়িটির দুইটি কক্ষে একটি হিন্দু পরিবার বর্তমানে বসবাস করছে। বাকি ৪টি কক্ষে পচাঁ পানি,ময়লা-আর্বজনায় পরির্পূণ। কক্ষের ইটগুলোও ক্ষয়ে ক্ষয়ে পড়ছে। কক্ষের বাইরেও ময়লা-আর্বজনার স্তুপ। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত যে কক্ষে ঘুমাতেন সেখানে তার শোবার খাটটি এখনো রয়েছে, রয়েছে তার বালিশ। আরো আছে খাওয়ার প্লেইট, পানির গ্লাস, গায়ের কাথাঁ। এগুলো কিছুই সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেই। পরে আছে এদিক সেদিক। এগুলো বাড়িতে বসবাসরত হিন্দুপরিবারটি ব্যবহার করছে।

ভাষা সৈনিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়িটি আজ সংরক্ষণের অভাবে ধবংস হয়ে যাচ্ছে। বাংলা ভাষার জন্য যে নিজের প্রাণ দিল তার স্মৃতিচিহৃ এভাবে অবহেলায় পড়ে থাকতে দেখে ব্যথিত অনেকেই । স্থানীয় বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা শহীদুল হক সেলিম বলেন, খুব খারাপ লাগছে,যিনি বাংলা ভাষার প্রথম প্রস্তাবকারী, ভাষার জন্য যিনি পাক হানাদার বাহিনীর হাতে প্রাণ দিল, সেই ভাষা সৈনিকের স্মৃতিটি আজ অবহেলায় বিলীন হওয়ার পথে। তার স্মৃতিকে সংরক্ষণ করে আমাদের ধরে রাখতে হবে। তার স্মৃতিটি বিলীন হওয়া মানে তাকে অবজ্ঞা করা। তাই যতসম্ভব তাড়াতাড়ি ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের এই বাড়িটি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করার পদক্ষেপ নেয়া উচিত।

ভাষা সৈনিক শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণের বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোঃ রেজাউল আহসান জানান, এ বিষয়ে আমরা শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পরিবারের লোকজনের সাথে যোগাযোগ করছি,তাদের সাথে কথা বলছি। তার নাতনি ও তার পরিবার কুমিল্লায় আসবে,তারপর তাদের অনুমতি নিয়ে এই বাড়িটি সংরক্ষণের জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হবে।

বাংলা ভাষার প্রথম প্রস্তাবকারীঃ

১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্র“য়ারি তখনকার পাকিস্তানের রাজধানী করাচীতে চলছিল গণপরিষদের অধিবেশন। ২৫ ফেব্র“য়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত-ই সর্বপ্রথম আমাদের রাষ্ট্রভাষা ‘বাংলা’র দাবিতে সোচ্চার প্রতিবাদী ভূমিকার জন্য পাক্-সরকারের রোষানলে পড়েন। তিনি ওই অধিবেশনে বলেন, গণপরিষদে যে কার্যবিবরণী লেখা হয় তা ইংরেজি ও উর্দু ভাষায় লিপিবদ্ধ হয়। গণপরিষদের স্পীকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বললেন, সমগ্র পাকিস্তানের ৫৬ শতাংশ লোক বাংলা ভাষায় কথা বলেন। তাই ইংরেজি ও উর্দুর সাথে বাংলা ভাষা ব্যবহারের প্রস্তাব করেন। এতে প্রথম ক্ষিপ্ত হন তখনকার পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান। তখন থেকেই ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বিরুদ্ধে শত্র“ লেলিয়ে দেওয়া হল। তিনি প্রাণের মায়ায় করাচী ত্যাগ করে ঢাকায় চলে এলেন। বাংলা ভাষার জন্য পাকিস্তানের সূচনায় ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত যে প্রস্তাব করেছিলেন সে প্রস্তাবের আলোকে ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্র“য়ারী পর্যন্ত রক্তের অক্ষরে যে ইতিহাস, সেই ইতিহাসের সূচনাকারী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত।

তিনি সারা জীবন কুমিল্লায় আইন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। আইন পেশায় প্রথম দিকে তিনি আদালতের উত্তরে কাপ্তানবাজারে গোমতীর পাড়ে একটি বাসগৃহে ভাড়া থাকতেন। পরে ধর্মসাগর দীঘির পশ্চিমপাড়ে ভূমি কিনে একটি টিনের আটচালা বাড়ি করেন। এই বাড়িতেই তিনি আজীবন কাটিয়েছেন।

পাক হানাদার বাহিনীর হাতে নিমর্ম হত্যাঃ

জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের গ্রেফতারের ত দিন পরেই ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ গভীর রাতে বর্বর পাক্বাহিনী ধর্মসাগরের এই বাড়ি থেকে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ও তার পুত্র দিলীপ কুমার দত্তকে সহ ধরে নিয়ে যায় কুমিল্লা সেনানিবাসে। সেখানে ৮৫ বছর বয়স্ক এই দেশপ্রেমিক রাজনীতিকের উপর অমানবিক নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করে। দেশ শত্র“মুক্ত হওয়ার পর ভাষা সৈনিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের মৃতদেহ কেউ খুঁজে পায়নি। রাজনৈতিক জীবনে তিনি বহুবার কারাবরণ করেন।

শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ১৮৮৬ সালের ২ নভেম্বর রামরাইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমানে এ গ্রামটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায়। তিনি নবীনগর হাই স্কুল ও কুমিল্লা জিলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশ করেন। ১৯০৫ সালে ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে আইএ এবং ১৯০৮ সালে কলকাতার রিপন কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন। তিনি ১৯১০ সালে আইন পরীক্ষায় উর্ত্তীন হয়। তিনি তার ক্যারিয়ার শুরু করেন একজন স্কুল শিক্ষক হিসেবে,এমনকি তিনি কুমিল্লা বাংগরা হাইস্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষকও ছিলেন। তিনি ১৯১১ সালে কুমিল্লা জেলা বারে যোগদান করে নিয়মিত অনুশীলন করেন।

স্বাদেশিকতা ছিল তার সহজাত। তিনি বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন, হিন্দু সমাজের বর্ণপ্রথা, ইংরেজ দুঃশাসনসহ অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে থেকে মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম করেছেন আমৃত্যু। পাকিস্তান গণপরিষদ ও পরবর্তীতে আইন সভার সদস্য ছাড়াও মন্ত্রিত্ব অর্জন করেছিলেন তিনি।

Check Also

কুসিক নির্বাচন সুষ্ঠু নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ করার দাবি বিএনপির

সৌরভ মাহমুদ হারুন :– কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন (কুসিক) নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগ পুলিশ প্রশাসনকে ব্যবহার ...

Leave a Reply