চৌদ্দগ্রাম জাতীয় পার্টির কথিত নেতা হুমায়ুন কবির আলমঙ্গীর’র বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ চুরি মাদক ব্যবসা ও লাম্পট্যের অভিযোগ

বিশেষ প্রতিনিধি:

চৌদ্দগ্রাম জাতীয় পার্টির কথিত নেতা আলমগীর হোসেন আলমের বিরুদ্ধে অর্থ-আত্মসাৎ মাদক ব্যবসা নারী নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া গেছ্ েএক লিখিত অভিযোগপত্রের আলোকে এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হলো। অভিযোগপত্রে উক্ত আলমকে প্রতারক, অবৈধ মাদকব্যবসায়ী, লম্পট, বহু নারীর সর্বনাশকারী, অগণিত মানুষের অর্থ আত্মসাত কারী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। অভিযোগপত্রে তার বিরুদ্ধে যে তথ্য প্রদান করা হয়েছে তার সত্যতাও পাওয়া গেছে।

আলমগীর হোসেন ওরফে আলম বর্তমানে লুঙ্গী আলম নামেই সর্বাধিক পরিচিত। তার বাড়ী কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার ৫নং শুভপুর ইউনিয়নের জসপুর নামক গ্রামে।

আলমের ছোটবেলা:

দরীদ্র পরিবারের সন্তান আলম। দারিদ্রতার কারনে ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় থেকে তিনি অন্যের বাড়ীতে লজিং থাকতেন এবং এসএসসি পাশ করেন। কলেজে ভর্তি হয়ে তিনি আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেন। স্কুলে পড়া অবস্থায় আলম পাশের গ্রামের এক প্রবাসীর স্ত্রীর সাথে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন। তাদের অনৈতিক কাজ দেখে ফেলার পর তাকে উক্ত গ্রাম থেকে বের করে দেয়া হয়। উক্ত গ্রাম থেকে বিতাড়িত হয়ে আলম কুমিল্লায় এক বাড়ীতে লজিং নেন। সেখানে সালমা নামের এক মেয়ের সাথে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন। এক পর্যায়ে উক্ত মেয়েটি গর্ভবতি হয়ে পড়ে। মেয়েটি চার মাসের যখন অন্তসত্ত্বা তখন আলম উক্ত মেয়ের সাথে প্রতারনা করে চট্টগ্রামে পালিয়ে যান। পরবর্তীতে আলমের আর লেখাপড়া হয়নি।

আলমের পিতার পরিচয়:

আলমের পিতা অত্যন্ত দরিদ্র মানুষ। তার পিতা চৌদ্দগ্রাম উপজেলার মুন্সিরহাট বাজার, কাদৈর বাজারসহ বিভিন্ন গ্রামে পায়ে হেটে পান-তামাক বিক্রি করতেন। মাঝে মধ্যে তিনি তরিতরকারীও বিক্রি করতেন। তা দিয়ে কোনো রকমে চলতো তাদের সংসার। আলমের বাবাও ছিলেন অত্যন্ত খারাপ প্রকৃতির লোক। ১৯৭১ সালে গ্রামে শান্তি কমিটির নামে রাজাকারদের সহযোগীতা করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। আশ-পাশের গ্রামের বিভিন্ন লোকের গরু, মুরগীসহ চাল ডাল জোর করে লুটে আনতেন তিনি। তার অত্যাচারে গ্রামের সুন্দরী মেয়েরা গ্রামে থাকতো পারতো না। আলমের পিতা এখনো বিভিন্ন বাজারে ফেরী করে তরকারী বিক্রি করেন।

আলমের চট্টগ্রামে পলাতক জীবন:

সালমা নামের মেয়েটির সাথে অবৈধ সম্পর্কের কথা মানুষ জেনে ফেলার পর আলম কুমিল্লা থেকে চট্টগ্রামে পালিয়ে যান। চট্টগ্রামে যেয়ে তিনি চুরি-চামারীতে জড়িয়ে পড়েন্ সেখানে পাশাকোট গ্রামের ফজল সওগাগরের লৌহার দোকানে অতি স্বল্প বেতনে চাকুরী নেন। ওই চাকুরীর সুবাদে বিভিন্ন জায়গা হতে লৌহা, টিনসহ বন্দরের বিভিন্ন জিনিস, বিশেষ করে ট্রেনের পাত ও অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি করাই ছিলো আলমের কাজ। এক পর্যায়ে ১৯৮৫ সালের মার্চ মাসে চট্টগ্রাম বন্দর থানায় তার নামে একটি চুরির মামলা হলে তিনি র্দীঘদিন পলাতক ছিলেন। পরে তিনি পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে জেল খাটেন। জেল থেকে বের হওয়ার পর টেম্পু, বেবীটেক্সী ও হুন্ডা চুরিসহ বিভিন্ন অপরাধ কর্মকান্ডের সাথে জড়িয়ে পড়েন তিনি। সে সময় তার সহযোগী ছিলো জাফর, রুস্তম, রশিদ সহ আরো অনেকে। তাদেরকে নিয়ে আলম একটি সংঘবদ্ধ চক্র গড়ে তোলেন। সে সময় ওই চক্রের মাধ্যমে তিনি বেশকিছু টাকা-পয়সার মালিক হন। ওই সময় আলমের বিরুদ্ধে মাইক্রোবাস চুরির মামলা হলে তিনি চট্টগ্রাম থেকে পালিয়ে ঢাকা চলে আসেন।

আলমের ঢাকার কাহিনী:

ঢাকায় আসার পর আলমের অপরাধ তৎপরতা আরো বেড়ে যায়। তার ছোটবেলার বেশ কয়েকজন বন্ধু-বান্ধব মিলে ১৯৯৫ সালের দিকে গুলিস্তানে পুরনো কাপড়ের হকারী শুরু করেন তিনি। পরবর্তিতে মেরুল বাড্ডায় গড়ে তোলেন আইডিয়েল কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড এমডি শফিকুর রহমানের সাথে তার কিছুদিন বিবাধ বাঁধে। ওই প্রতিষ্ঠানে ক্যাশিয়ার পদে চাকুরীরত একটি মেয়েকে বিয়ে করবে বলে ফুসকিয়ে আলম একদিন বাথরুমে নিয়ে ধর্ষন করেন। ওই সময় প্রতিষ্ঠানের এমডি শফিকুর রহমানের হাতে ধরা পড়ে যান। তখন দু’জনের মধ্যে মারামারি ঘটনা ঘটে। আলম উক্ত প্রতিষ্ঠানের ২০ লক্ষ টাকা নামে বেনামে আত্মসাত করেন। আলমের আচার আচরণের কারনে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তী নষ্ট হওয়ায় বোর্ড মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত ক্রমে তাকে প্রতিষ্ঠান থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়। সেখান থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর সুচতুর আলম সাবেক প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহম্মদের সান্নিধ্যে চলে যান। কাজী জাফরের নাম ভাংগিয়ে তিনি বিভিন্ন জায়গায় চাঁদাবাজী করতে থাকেন। এক সময় কাজী জাফর বিষয়টি টের পেলে তাকে তিনি তাড়িয়ে দেন।

কনফিডেন্স কো-অপারেটিভ সোসাইটি গঠন:

কাজী জাফরের নিকট থেকে বিতাড়িত হয়ে কোথাও স্থান না পেয়ে আলম এলাকার কিছু অশিক্ষিত হত-দরিদ্র মানুষ এবং কিছু প্রবাসীদের নিয়ে কনফিডেন্স কো-অপারেটিভ সোসাইটি নামের একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। উক্ত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন ব্যক্তির নিকট থেকে এফডিআরের নামে কমপক্ষে ৫কোটি টাকা সংগ্রহ করেন। প্রতিষ্ঠানের শুরুর ১ বছরের মাথায় নামে বেনামে ঋণ দেখিয়ে সমুদয় টাকা নিজের স্বার্থে ব্যবহার করেন। এখনো বাড্ডা, মেরুল, খিলগাঁও এলাকার প্রচুর মানুষ তার কাছে টাকা পায়। উক্ত প্রতিষ্ঠানের কোটি কোটি টাকা পেয়ে আলম দিশেহারা হয়ে যান। তিনি বিভিন্ন নারীর পিছনে পানির মতো টাকা খরচ করতে থাকেন। প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে প্রলুব্ধ করে তিনি একে একে বিভিন্ন মেয়েকে বিয়ে করতে থাকেন। উক্ত আলম বিয়ের ফাঁদে ফেলে এই পর্যন্ত কত মেয়ের সর্বনাশ করেছেন,কতটা বিয়ে করেছেন তার হিসেব করা মুশকিল। তার যৌনাচারে শিকার হয় চম্প, জুই, নিলু, আফিজাসহ অগণিত মেয়ে। সে সময় তার উক্ত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সাতবাড়ীয়া গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারের মেয়েকে জোরপূর্বক বিয়ে করেন তিনি।

কনফিডেন্সে আলমের দুর্নীতি:

কনফিডেন্স কো-অপারেটিভ সোসাইটি প্রতিষ্ঠার ২ বছরের মাথায় টাকার সংকট দেখা দেয়। সে সময় আলম চাতুরতার সাথে নতুন নতুন সদস্য সংগ্রহ করে প্রতিষ্ঠানের সাথে অন্তর্ভূক্ত করতে থাকেন এবং নতুন করে অফিসের কার্যক্রম শুরু করেন। সে সময় তার নিজ এলাকার জাতীয় পার্টির নেতা এবং এলাকার বিশিষ্টজনদের প্রলুব্ধ করে সাথে নেন। মুন্সীরহাট তাহেরা খাতুন গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষক এরশাদ উল্যাহ মজুমদারকে চেয়ারম্যান করে ১৭ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠণ করে তাদের মাধ্যমে তিনি আনুমানিক ১০ কোটি টাকা সংগ্রহ করেন। কিছুদিন যেতে না যেতে আলম সমুদয় টাকা আত্মসাত করে পালিয়ে যায়। প্রায় ৫ বছর পলাতক থাকেন তিনি। টাকা আত্মসাতের কারনে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। ওই মামলায় আলম গ্রেফতার হয়ে বেশকিছু দিন জেল খাটেন। জেল থেকে বেরিয়ে আলম আবার চট্টগ্রামে আস্তানা গড়েন। সেখানে তিনি আরো একটি সমিতি গড়ে তোলেন। উক্ত সমিতির অন্যান্যরা আলমের বিভিন্ন অপকর্ম সম্পর্কে জানতে পেরে তাকে বের করে দেন। ওখান থেকে তিনি বিতাড়িত হয়ে আবার ঢাকায় ফিরে আসেন। ঢাকায় এসে তিনি পুরাতন বাড়ি ভাঙ্গাচুরার কাজ নেন।

আলমের পুরাতন বাড়ী ভাঙ্গার ব্যবসা:

ঢাকায় এসে কোন উপায়ান্ত না দেখে আলম এক পর্যায়ে পুরাতন বাড়ী ভাঙ্গার কাজ শুরু করেন। সে সময় ফেনীর হাজারীর বেশ কয়েকজন ক্যাডারের সাথে তার পরিচয় ঘটে। উক্ত ক্যাডারদের সাথে নিয়ে তিনি হেরোইন, ফেন্সিডিল, গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদকের অবৈধ ব্যবসার সাথে জড়িয়ে পড়েন। তখন এ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে রাতের অন্ধকারে তার বোন হাসিনাকে দিয়ে ফেন্সিডিলের চালান আনা-নেওয়া করাতেন। এছাড়াও আলমের দ্বিতীয় স্ত্রীকে দিয়েও ফেন্সিডিলের চালান আনা-নেওয়া করাতেন।

আলমের বর্তমান অবস্থা:

এককালের চোর, অন্যের কোটি কোটি টাকা আত্মসাতকারী, মাদক ব্যবসায়ী আলম বর্তমানে এলাকাতে রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবক হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন। সম্প্রতি তিনি পবিত্র হজ্বও পালন করেছেন। একদিকে হেরোইনসহ বিভিন্ন মাদক ব্যবসা, অন্যদিকে সমাজ সেবক। এনিয়ে তার নিজ এলাকায় বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। আলমের বৈধ কোনো আয়ের পথ নেই। তার নেই কোন ব্যবসা বাণিজ্য। তারপরও তিনি এলাকার লোকজনকে প্রচুর টাকা দিয়ে তার অবস্থান মজবুত করা চেষ্টা চালাচ্ছেন। কোন মানুষ তার আয়-ব্যয়ের হিসাব জানে না। এত টাকা কোথা থেকে আসে তাও কেউই জানে না।

কিছুদিন থেকে তিনি লম্বা দাঁড়ি রেখে লম্বা জোব্বা পড়ে প্রতারণার নতুন পরিকল্পনা করছেন। এটা তার অতিত কর্মকান্ড থেকে বাঁচার এবং বর্তমান মাদক ব্যবসা পরিচালনার একটা কৌশল মাত্র। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সমূহের চোখ ফাঁকি দিয়ে তিনি শর্শিনা ও মৌকরার পীরের মুরিদ সেজে মাদক ব্যবসা ও চাঁদা বাজীতে লিপ্ত। মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজী করার জন্য তিনি মাঝে মধ্যেই কৌশল পাল্টাচ্ছেন। হুজুরদের গাড়ীতে বসিয়ে তিনি হিরোইনের ব্রিফকেস সহজেই পাচার করে থাকেন। ঢাকায় বিভিন্ন স্থানে পুলিশ বেশ কয়েকবার তার গাড়ী চেক করতে চাইলে তিনি বলেন, গাড়ীতে শর্শিনার হুজুর রয়েছেন, তিনি অমুক জায়গায় ওয়াজ করতে যাচ্ছেন। এভাবেই তিনি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সমূহকে সহজেই ধোঁকা দেন। এভাবেই আলম অবৈধ মাদক ব্যবসা করে কোটি কোটি টাকা অবৈধভাবে আয় করছেন।

অল্প কিছুদিনের মধ্যে আলম তার নিজ এলাকায় ৭০ কানি জমি ক্রয় করেছেন। সরকারকে কোন আয়কর না দিয়ে বিপুল পরিমাণ সম্পদ কেনায় এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে আইডিয়েলের এমডিকে ভুল পথে পরিচালিত করে কমমূল্যের জমি বেশীমূল্যে উক্ত কোম্পানীকে কিনে দিয়ে কোটি কোটি টাকা চাতুরতার মাধ্যমে হাতিয়ে নিচ্ছেন তিনি।

রাজনীতিবিদ আলম:

অবৈধ হেরোইন ব্যবসা, সমবায়ী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তির কোটি কোটি টাকা আত্মসাত করে এবং আইডিয়েলের জমি ক্রয়ের নামে অর্থ হাতিয়ে নিয়ে আলম এখন কোটি কোটি টাকার মালিক। বকধার্মিক সেজে তিনি জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা শফিকুর রহমানের কাঁধে ভর করে এখন বড়মাপের রাজনীতিবিদ হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। যদিও তার নিজ এলাকায় আলম একজন ঘৃণিত ব্যক্তি। শফিকুর রহমানকে ভ্রান্তপথে পরিচালিত করে তিনি জাতীয় পার্টির চৌদ্দগ্রাম উপজেলা শাখার কার্যকরী সভাপতি হয়ে দলের পিছনে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছেন। এলাকায় প্রচার চালাচ্ছেন, কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে তিনি কাজী জাফর, এরশাদসহ জাতীয় পার্টিকে চালাচ্ছেন।

সবচেয়ে বড় কথা আলম একজন কুখ্যাত ব্যক্তি। তিনি নিজের স্ত্রী বোনসহ ভদ্রঘরের বেশকিছু মেয়েদেরকে দিয়ে হেরোইন ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। উক্ত আলমের বিরুদ্ধে আরো অনৈতিক কর্মকান্ডের তথ্য ও উপাত্ত পাওয়া গেছে। প্রাপ্ত তথ্যের সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে।

Check Also

চৌদ্দগ্রামে শেখ রাসেল জাতীয় শিশু কিশোর পরিষদের প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত

মোঃ বেলাল হোসাইন, চৌদ্দগ্রাম :– প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও মন্ত্রীপরিষদের প্রভাবশালী ব্যাক্তিবর্গকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ ছবি ...

Leave a Reply