নওগাঁর আদিবাসীরা আজও বন্য প্রাণী শিকার করে, দেখার কেউ নেই

নওগাঁ প্রতিনিধি:

নওগাঁর আদিবাসীরা আজও বন্য প্রাণী শিকার করে, দেখার কেউ নেই। আজ থেকে হাজার হাজার বছর আগে মানুষ যখন গুহায় বাস করত, গাছের ছাল বাকড়া গায়ে জড়িয়ে লজ্জা নিবারণ করত তখনও মানুষের ক্ষুধার চাহিদা ছিল। এ সময় আদিম মানুষরা গাছের ফল-মূল দিয়ে, পশু শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করত। সে সময় শিকার ধরার কৌশল হিসাবে তারা তীর-ধনুক, বল্লম জাতীয় সনাতন অস্ত্র আবিষ্কার করেন। অবিশ্বাস্য হলেও এটিই সত্য যে, বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে বসবাসরত আড়াই লক্ষাধিক আদিবাসী জনগোষ্ঠি এখনও আদিম কৃষ্টি, কালচার অনুসরণে তাদের জীবণ অতিবাহিত করছে। সভ্যতার দ্রুত ক্রমবিকাশের ফলে মানুষ প্রযুক্তির চরম শিখরে অবস্থান করলেও উত্তরাঞ্চলের ১৬টি জেলায় বসবাসরত ২৫টি আলাদা সম্প্রদায়ের আদিবাসীরা ধরে রেখেছে তাদের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি। সুযোগ ও সম্ভাবনা কমে গেলেও সীমিত পরিসরে হলেও তারা চেষ্টা করছেন নিজস্ব সংস্কৃতি চর্চা অব্যাহত রাখতে। যার ফলশ্র“তিতে এখনও তারা আদিম সংস্কৃতির অনুকরণে ছুটে বেড়ান বন বাদাড়ে, জঙ্গলে। দলীয়ভাবে শিকারে গিয়ে যে সকল জীবজন্তু ধরেন তা সম্মিলিত ভাবে উপভোগ করেন। মেতে ওঠেন আনন্দে উৎসবে।

শনিবার দুপুরে নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলা সদরে দেখা মিলে একটি শিকারি দলের। কথা হয় শিকারীদের সাথে। দলনেতা লগেন হাসদা (৫০) জানান, পতœীতলা উপজেলার বাগুরিয়া ছালিগ্রাম গ্রামে তাদের বাড়ি। ভোর সকালে তারা ৩০ কিলোমিটার দুরে মহাদেবপুর উপজেলার শিবগঞ্জ এলাকায় শিকার ধরতে গিয়েছিলেন। ফিরতে দেরী হওয়ায় যান বাহনের জন্য অপেক্ষা করছেন। আলাপ চারিতায় তিনি জানান, অগ্রহায়ণ-মাঘ মাসে হাতে তেমন কাজ না থাকায় তারা শিকারে বের হয়। এ সময় মাঠে ধান না থাকায় বন্য প্রাণীরা জঙ্গলে আশ্রয় নেওয়ায় শিকারের জন্য সহজ হয়। শিকারে যাওয়ার আগে গ্রাম প্রধান পুরুষদের নিয়ে আলোচনায় বসেন এবং সকলের সাথে আলোচনা করে শিকারের দিন ও এলাকা নির্ধারণ করেন। পরিকল্পনা মোতাবেক তারা সপ্তাহে একদিন শিকারে বের হন। শিকার কাজের জন্য তারা বল্লম, লাঠি, তীর-ধনুক, কোদাল, খন্তি জাতীয় দেশীয় ও নিজস্ব তৈরী যন্ত্র ব্যবহার করে থাকেন বলে জানান।

দলনেতা আরো জানান, বন বিড়াল, বেজি, খরগোস, শিয়াল, গাবরা, ইদুঁর, ডাহুক, পেচাঁ, বক, রাতচোরা পাখি, উদ, কাঠ বিড়াল ইত্যাদি জীব-জন্তু ও বন্য প্রাণী তারা শিকার করে থাকেন। কোন জায়গায় শিকার আছে তা বুঝতে পারলে তারা তিন দিকে ঘিরে ফেলেন এবং একদিকে নেট দিয়ে ঘিরে রাখেন। শিকারকে ধাওয়া করলে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা কালে নেটে আটকা পড়ে। এতে শিকার ধরা সহজ হয়। জীব-জন্তু দৌড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে তারা তীর-ধনুক ও বল্লম ছুঁড়ে তাদের সহজেই ঘায়েল করেন। এলাকায় জঙ্গল ও বনের পরিমাণ হ্রাস পাওয়ায় আগের মতো আর শিকার পাওয়া যায়না বলেও তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেন। তবে মজার বিষয় হলো তারা বেজি শিকার করতে পারলে লোমগুলো মোড়লের বাড়িতে জমা রাখেন। কারণ বেজির লোম দিয়ে তুলি তৈরী হওয়ায় প্রতি কেজি বেজির লোম ৪/৫ হাজার টাকায় রাজশাহী ও নাটোরের ব্যবসায়ীরা ক্রয় করে নিয়ে যান। লোম বিক্রয়ের টাকা দিয়ে থালা-বাসন, হাঁড়ি-পাতিল, হেচাক লাইট ইত্যাদি ক্রয় করে মোড়লের বাড়িতে রাখা হয় এবং সামাজিক অনুষ্ঠানে এগুলো ব্যবহার করা হয়। ৩/৪ দিনের জন্য শিকারে গেলে ধরা পড়া জীব জন্তুর মাংস বিশেষ প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ করা হয় বলেও তিনি জানান। শিকারী দলের সদস্য জহন মুরমু জানান, আগে তারা চান্দুবাবা বা ভগবানের নামে এ শিকারে বের হতো। বর্তমানে আদিবাসীরা অনেকই সনাতন ধর্মের সাথে মিশে যাওয়ায় ও খ্রিষ্টিয় ধর্ম পালন করায় এখন আর শিকারে আদিবাসীরা তেমন একটা বের হয় না।

বাংলাদেশের আইনে বন্য প্রাণী শিকার যে অপরাধ সে বিষয়ে শিকারীদের দৃষ্টি আর্কষণ করা হলে দলনেতা লগেন হাসদা জানান, বাবু হামরা মুর্খ-সুর্খ মানুষ। আইন কানুন বুঝিনা। গোস্ত কিনতে পারিনা তাই বাপ দাদার অনুকরণে এই জংলি জীব জন্তু শিকার করে খাই। বউ বাচ্ছাদের খুশি করার চেষ্টা করি। সকলে মিলে আনন্দ করি। এটা অপরাধ হলে হামাকের শিকার বাদ দেওয়া লাগবে, আর কি ? এদিকে প্রতিদিন শত শত বন্য প্রানী আদিবাসীরা শিকার করলেও প্রশাসনের দেখার কেউ নেই।

Check Also

মিনি ওয়াক-ইন-সেন্টারের মাধ্যমে রবি’র গ্রাহক সেবা সম্প্রসারণ

ঢাকা :– গ্রাহক সেবাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে মোবাইলফোন অপারেটর রবি আজিয়াটা লিমিটেড সম্প্রতি মিনি ওয়াক ...

Leave a Reply