মাতৃভাষা হৃদয়ে লালন করেই জাতিকে উন্নত হতে হয়

মো.আলী আশরাফ খান :


ভাষা মহান স্রষ্টার দান। প্রত্যেক মানুষের জন্যই অমূল্য সম্পদ। মানুষ প্রতিমূহূর্তের স্পন্দন ও প্রবাহের মধ্যদিয়ে তার জীবিত ও জাগ্রত সত্তাকে অস্তিত্বময় ও প্রাণান্ত করতে ভাষার কোনো বিকল্প খুঁজে না। মানুষকে বৈচিত্রতার সমাহারে নান্দনিকতার উন্মেষ ঘটাতে অস্তিত্ব, অবস্থান, গতি-প্রগতি, শক্তির সমন্বয় ও রচনাকে সমৃদ্ধ করে ভাষা প্রয়োগের মাধ্যমে। ভাষার বেগ-চালনাবলে দেহে শক্তির সঞ্চার হয়, অঙ্গ-প্রতঙ্গ সঞ্চালিত হয়, মস্তিস্ক কোটর, চেতনা-চৈতন্য, স্মৃতিকোষ, অনুভূতি-উপলব্দির ক্রিয়া সম্পন্নতায় বোধগম্যের সৃষ্টি হয়। এককথায়, ভাষা জীবনের সঙ্গে সর্বতোভাবে জড়িত।

প্রতিটি মানুষকে সুন্দর ও উন্নতভাবে জীবন-যাপন করতে হলে তিনটি ভাষা জানা আবশ্যক। মাতৃভাষা, ধর্মীয়ভাষা ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যে ভাষার গ্রহণযোগ্যতা বা প্রয়োগ হয়। এই তিন ধরনের ভাষার চর্চার মাধ্যমেই একজন মানুষ সর্ববিষয়ে পা-িত্য লাভ করতে পারে। তবে সবচেয়ে বড়কথা, প্রত্যেক মানুষকেই তার মাতৃভাষা সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞানার্জন করা অত্যাবশ্যক। অবশ্যই নিজ ভাষার উপর দখল থাকতে হবে। ভাষার আদ্যপ্রান্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে হতে হবে অবগত। মনে রাখতে হবে, আন্তরিকতা ও দরদের সঙ্গে এর ধারাবাহিক অনুশীলন ব্যতীত কোনো ব্যক্তি-গোষ্ঠী-জাতির উন্নতি কোনকালেও সম্ভব নয়। কারণ, ভাষা হলো মানবজীবনের অতি প্রয়োজনীয় সাহিত্য ও সংস্কৃতির সর্বোত্তম মাধ্যম-পহ্না; ইতিহাস-ঐতিহ্যের বাহন; শিল্পকর্ম ও অগ্রগতির ধারকবাহক। যা একমাত্র মাতৃভাষা-সহজবোধ্যতার জন্যই নিজ নিজ ভাষায় অর্জন সম্ভব। সেজন্য যখনই যেখানে নিজস্ব ভাষা-মায়ের ভাষার ওপর কোন আক্রমণ আসে সমগ্র জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে রক্ষার জন্য। যুক্তি-তর্ক, বুদ্ধি-মেধা-মনন এবং প্রয়োজনে রক্তাক্ত পথেও সংগ্রাম করে ভাষাপ্রেমিক-দেশপ্রেমিক প্রকৃত দেশরতœরা ছিনিয়ে আনে স্বকীয়তাকে।

মা-মাতৃভূমি-মাতৃভাষার ওপর আঘাত এলে কোন ব্যক্তি-জাতি মেনে নিতে পারে না। তারই এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন। পরে বাংলা মায়ের বীর সন্তানেরা বাংলা ভাষাকে রক্ষা এবং মাতৃভাষা রূপে আলিঙ্গন করতে ’৫২-এর ফেব্রুয়ারিতে আন্দোলনের ডাক দেন। এবং এই বাংলার সূর্য সন্তানেরা ‘২১ ফেব্রুয়ারি’ সফলতার সঙ্গে অর্জন করে গৌরবগাঁথা এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রমী ইতিহাসের সৃষ্টি করে। এই ব্যতিক্রমী অধ্যায়ের পর কেটে যায় দীর্ঘ সময়। অনেক সংগ্রাম, চড়াই উৎড়াই, যুদ্ধ-বিগৃহ, হত্যা, ধর্ষণ, দূর্ভিক্ষ, খরা-দারিদ্র, জলোচ্ছ্বাস-টর্নেডো, দূর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ভ্রান্তধারার রাজনীতিচর্চা, কু-শাসন, অপশাসন ও বহিরাগত কুটচাল-অপশক্তির মত কোন হিংস্র থাবাই বাদ যায়নি এই বাঙালি জাতির কোমল শরীরে।

কিন্তু তারপরেও শত বাধা-বিপত্তিকে ডিঙিয়ে এমন কিছু ভাষাপ্রেমিক, দেশপ্রেমিক মানুষ যুগে যুগে ভাষার জন্য দেশের জন্য নিরলস সংগ্রাম করে গেছেন, করছেন এবং যারা এমন মহৎ-মহান কাজে জড়িত ছিলেন, আছেন তাদেরকে শ্রদ্ধা করেন-সম্মান করেন এবং তাদেরকে অনুসরণের মধ্যদিয়ে বুকে আগলে রাখেন ভাষা ও তার দেশমাতৃকাকে ভালোবেসে। যদিও এমন মানুষের সংখ্যা হাতেগোনাই বলা যায়। আজ দেশের তৃণমূল পর্যায় থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়েও এমন কিছু মানুষ রয়েছেন যাদের ভাষার প্রতি অবজ্ঞা-অবহেলা, ভাষাসৈনিকদের অসম্মান, দুই চোখে দুই নীতি বাঙালি জাতিকে লজ্জিত করে-করে কলংকিত।

অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আমরা এতটাই হতভাগ্য জাতি ৬০ বছর পরেও ভাষাশহীদ, ভাষাসৈনিক এবং প্রকৃত দেশপ্রেমিকদের পারছিনা যথাযথ মূল্যায়ন করতে। বর্তমানে দেশে যেসব ভাষাসৈনিক-দেশপ্রেমিক রয়েছেন যাদেরকে পারিনি আজো একই পতকাতলে সমবেত করে জাতীয়ভাবে সম্মান প্রদর্শণের মাধ্যমে কিছুটা হলেও জাতির ঋৃণ মুক্ত করতে। বছরের বিশেষ কোন একটি দিনকে উদ্যাপনের লক্ষে আমরা ঢাকঢোল পিটাই, ঝাড়পোঁছ করি, রঙবেরঙে বাহারী সাজে সাজাই শহীদ মিনার। কেউ নগ্নপায়ে কেউ জুতোপায়ে ফুলের তোড়ায় ভরে দিই ভাষা শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভ। তোড়ন-মঞ্চ-সভার আয়োজন করে আমরা প্রমাণ করতে চাই ভাষার প্রতি আমাদের অগাধ ভালোবাসার! কিন্তু এসব কি ভাষাপ্রেম-দেশপ্রেম ও সৃষ্টিশীলদের প্রতি সম্মান? স্পষ্ট করে বললে, তা চরম অমর্যাদা ছাড়া আর কি বলা যায়। তাছাড়া আমাদের দেশকর্ণদারদের যে ভাষার প্রতি, দেশের প্রতি চরম অবহেলা ও উদাসীনতা রয়েছে তা নতুন করে বলার আর কি আছে। যাদের চলায়-বলায়, পোশাক-পরিচ্ছদসহ যাবতীয় কর্মকা-ে বাঙালিত্বেব নমুনামাত্র নেই তাদের মধ্যে ভাষাপ্রেম ও দেশপ্রেম থাকবে তা কি করে বলা যায়?। কথায়কথায় অশুদ্ধ বাংলা, যথায়তথায়-ক্ষেত্রে অক্ষেত্রে অশুদ্ধ ইংরেজির ব্যবহার কি প্রমাণ করে না তারা কতটা ভাষাপ্রেমিক, কতটা দেশপ্রেমিক?

যেখানে মাননীয় সংসদ সদস্যরা মহান সংসদে এমন কিছু অশোভন অশ্রাব্য, প্রতিহিংসাপরায়ণ, অশ্লীল, অশুদ্ধ ও জগাখিচুরী মার্কা বাংলা-ইংরেজি বাক্য ব্যবহার করেন, যেখানে আমাদের রেডিও চ্যানেলগুলোয় বাংলাকে ব্যাঙ্গ করে উপস্থাপন করা হয়-যা জাতিকে চরম লজ্জায় ফেলে দেয়, সেখানে জাতি কি বা শিখতে পারে তাদের কাছ থেকে?

এসব বিষয়ে যে লেখালেখি হয় না তা কিন্তু নয়। দুঃখের বিষয়, পরিবর্তন আসেনা ওইসব নামধারী ভাষাপ্রেমিক-দেশপ্রেমীকদের। অন্যান্য দেশকর্ণধারদের ও সংসদ সদস্যদেরও হয়না কোনো বোধোদয়। আর এভাবেই মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, রাজনীতিক নেতৃবৃন্দ ও অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাগণ দিনের পর দিন অশুদ্ধ বাংলায় কথা বলা ও লেখা চালিয়ে যায, আদালতেও রায় লেখা হয় ভিনদেশী ভাষায়। যেখানে আমাদের বাংলা ভাষাকে ঘিরে জাতিসংঘের সামনে শহীদ মিনার নির্মাণ করে মহান শহীদ দিবস উপযাপন করা হয়, যেখানে বিশ্বব্যাপী যথাযোগ্য মর্যাদায় মহান ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসাবে পালন করা হয় সেখানে আমাদের মধ্যে ভাষার প্রতি এমন আচরণ কি প্রমাণ করে না যে, আমরা আসলেই বাঙালি জাতি হিসেবে আজও উন্নত হতে পারিনি, পারিনি পরিশুদ্ধ হতে?

পরিশেষে বলবো আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, মাতৃভাষার যথাযথ অনুশীলনের মধ্যদিয়েই সামগ্রীকভাবে দেশ-জাতি উন্নতি লাভ করে। যেজাতি মাতৃভাষা হৃদয়ে লালন করে সেজাতির উন্নতি অবশ্যম্ভাবী। মাতৃভাষার ধারাবাহিক চর্চা ব্যতীত কোন ব্যক্তি বা কোন দেশ বড় হতে পারে না।

-লেখক: কবি, কলামিস্ট ও প্রবন্ধকার, গৌরীপুর, দাউদকান্দি, কুমিল্লা।

Check Also

মিনি ওয়াক-ইন-সেন্টারের মাধ্যমে রবি’র গ্রাহক সেবা সম্প্রসারণ

ঢাকা :– গ্রাহক সেবাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে মোবাইলফোন অপারেটর রবি আজিয়াটা লিমিটেড সম্প্রতি মিনি ওয়াক ...

Leave a Reply