নবজাতক শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে রবিয়া

সন্তানের পিতৃপরিচয়ের মামলার বাদীনীকে আজ বেত্রাঘাত করে তওবা পড়িয়ে এলাকা ছাড়ার করার আশংকা

মোঃ শরিফুল আলম চৌধুরী, মুরাদনগর (কুমিল্লা) থেকে :

নবজাতক শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে রবিয়া
রহস্যজনক ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে জনমনে সন্দেহ
কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার ১৯নং দারোরা ইউনিয়নের কাজিয়াতল গ্রামের ভিক্ষুকনী কিশোরী রবিয়া (১৪) আজ শুক্রবার এশার নামাজের পর সালিস বৈঠকে ১০১টি বেত্রাঘাত মারা হবে। এরপর জুতাগলায় দিয়ে তওবা করিয়ে ‘‘শুদ্ধ’’ করে এলাকা ছাড়া সহ পরবর্তী সিদান্ত নেবেন সমাজপতি ও আসামীর পরিবাররা। ভয়ভীতি দেখিয়ে দশ দিন আগে তাকে ঘর থেকে বের করে ওই ঘরে তাকে দিয়েই তালা ঝুলিয়ে দেয় কিশোরির দায়ের করা পিতৃসন্তানের পরিচয়ের মামলার ২নং আসামীর পিতা মাওলানা আবদুর রশিদ ও তার পরিবারের সদস্যরা। আসামী পরিবার ও সমাজপতিরা তাকে এলাকা ছেড়ে অন্য কোথায় মাস খানেক থাকার নির্দেশ দেন এবং জানান, শুক্রবার এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

মুরাদনগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, তাঁরা পুরো বিষয়টি জেনেছেন। তাঁকে আজ কোন ভাবেই বেত্রাঘাত মেরে এলাকা ছাড়া করতে দেয়া হবেনা। প্রয়োজনে ওই কিশোরীকে পুলিশী হেফাজতে এনে রাখা হবে। তবে গ্রামের মাতাব্বর ও সাবেক ইউপি সদস্য মাওলানা আব্দুর রশিদ বলেছেন, আলেম-ওলামা ও সমাজ পতিদের সিদ্ধান্তই কার্যকর করবেন তারা।

এলাকাবাসী, পুলিশ ও পারিবারিক সূত্র জানায়, ২বছর আগে উপজেলার কাজিয়াতল গ্রামের মাওলানা আবদুর রশিদের পুত্র মোঃ শাহজালালের সঙ্গে বিয়ের প্রলোভনে একই গ্রামের মৃত- মোছলেম উদ্দীনের কন্যা রবিয়া শারিরীক সম্পর্ক স্থাপন করে। গত ২০১১ সালের ২জুলাই রাবিয়া অন্তসত্ত্বা হলে সে স্ত্রী স্বীকৃতি পেতে শাহজালালকে চাপ দেয়। কিন্তু শাহাজালাল ও তার পরিবারসহ স্থানীয় সমাজ পতিরা রবিয়াকে ভীতির মুখে চাপ প্রয়োগ করে তার গর্ভের সন্তান গর্ভপাত ঘটিয়ে নষ্ট করে শাহাজালালের পরিবর্তে একই বাড়ীর হোসেন মিয়ার পুত্র শিপন মিয়ার নাম বলার জন্য পরামর্শ দেন। কিন্তু ভয় ও আতঙ্কের মুখে শাহজালালের পরিবর্তে শিপন মিয়ার নাম বললেও গর্ভের সন্তান নষ্ট করতে রাজি হননি রবিয়া।

কাজিয়াতল গ্রামের ফরিদ মিয়ার স্ত্রী সখিনা বেগম (২৮), সহিদ মিয়ার স্ত্রী ফাতেমা বেগম (৩০) ও আবুল হাসেমের স্ত্রী রহিমা বেগম (৩৯) জানান, গোপনে বিয়ের আশ্বাস দিয়ে শাহাজালাল রবিয়ার সাথে দীর্ঘদিন শারিরীক সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়টি আমাদের চোখেও কয়েকবার ধরা পরেছে। আমরা যাতে ওই ঘটনা কাউকে না বলি তার জন্য শাহজালাল ও তার বাবা মা একাধিক বার আমাদের হাতে পায়ে ধরে তাদের ইজ্জত বাচানোর জন্য প্রকাশ না করতে পীড়াপীড়ি করেন।

প্রত্যেক্ষদর্শীরা জানায়, গত ২২জানুয়ারী মামলার আসামীর পিতা আবদুর রশিদ মেম্বার ও তার স্ত্রী ফাতেমা বেগম ঝগরার একপর্যায়ে রবিয়া সম্পর্কে আপত্তিকর কথা বলেন। তারা রবিয়াকে টাকার বিনিময়ে পতিতা বলে উল্লেখ করেন। এরপর তারপুত্র শাহজালালের ডিএনএ পরীক্ষার সত্যতা মিলে নি দাবি করে রবিয়াকে চরিত্র হীনা উল্লেখ করে ভয়ভীতি দেখিয়ে ঘর থেকে বের করে কৌশলে তাকে দিয়েই ওই ঘরে তালা ঝুলিয়ে দিতে বাধ্য করান। এ ঘটনার পর রবিয়াকে অন্য বাড়ীতে একঘরে করে রাখা হয়। আবদুর রশিদের স্ত্রী ফাতেমা বেগম ক্ষোভের সহিত বলেন, রবিয়া টাকার বিনিময়ে খারাপ কাজ করে আমার ছেলের নাম বলায় সমাজ পতিদের কথায়ই ঘর থেকে বের হয়ে তাড়াই বাড়ী ছেড়ে চলে গেছে। আবুল হাশেমের স্ত্রী রহিমা বেগম, খোরশেদ আলমের স্ত্রী মমতাজ বেগম ও আবুল কালামের স্ত্রী ঝরনা বেগম জানান, এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দারোরা ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান কাজী আব্দুল লতিফের সভাপতিত্বে পাড়ার মাতাব্বররা ছয়-সাত দফা বৈঠক করেন। বৈঠকে কোন সুরহা করতে না পারায় সন্তানের পিতৃ পরিচয়ের দাবিতে রবিয়া বাদী হয়ে ধর্ষক শাহজালাল ও শিপন মিয়াকে অভিযুক্ত মুরাদনগর থানায় গত বছরের ২৫জুলাই মামলা করলে ও তা ২মাস ২৫দিন পর থানায় রেকর্ড করা হয়েছে। ওই মামলায় ও আসামীদের ডিএনএ পরীক্ষা সন্তানের পিতৃ পরিচয়ের দাবীর সাথে মিলেনি। তারা শুক্রবার ১০১টি বেত্রাঘাত মেরে এবং গলায় জুতা পড়িয়ে তওবা করিয়ে রবিয়ার বিচারের ঘোষনা দেন।

গত ২৫ জুলাই নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মুরাদনগর থানায় একটি মামলা দায়ের করা হলে পুলিশ অভিযুক্ত শাহজালাল ও শিপনকে একাধিকবার ডেকে এনে জিজ্ঞাসা বাদ করলে ও গত বছরের ১অক্টোবর একটি কন্যা সন্তান প্রসব হওয়ার পরেও পুলিশ এ বিষয়ে কোন তৎপরতা দেখায় নি। পরে শিশুটি গুরতর অসুস্থ হয়ে পড়লে পুলিশ তড়িগড়ি করে মামলাটি থানায় নথিভুক্ত করে প্রথমে শিপন এবং গত ২০ ডিসেম্বর শাহজালালকে গ্রেফতার করে তাদের একটি সাজানো ডিএনএ পরীক্ষা করায় বলে কিশোরীর মা রোকিয়া বেগম অভিযোগ করেন। রবিয়ার মা আরো অভিযোগ করে বলেন, আমি এবং আমার মেয়ে ভিক্ষে করে জিবীকা নির্বাহ করি, আসামী পক্ষ্যের মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে ও একটি প্রভাবশালী মহলের প্ররোচনায় পুলিশ মামলাটি থানায় প্রথম নথিভুক্ত করেনি। পরে নথিভুক্ত করলেও কবে কখন কিভাবে আসামীদের গ্রেফতার করে ডিএনএ পরীক্ষা করেছে তার কিছুই আমরা জানিনা। তিনি অভিযোগ করে বলেন আসামী পক্ষ্যরা ডিএনএ পরীক্ষা তথা আমার মেয়ের সন্তানের পিতৃ পরিচয়ের মামলার আলামত নষ্ট করতেই পরিকল্পিত ভাবে ওই নব জাতক শিশুটিকে পর্যন্ত হত্যা করেছে। এ বিষয়েও কোন মামলা না নিয়ে ডিএনএ পরীক্ষা মিলে নাই অযুহাতে মামলা উঠানোর জন্য বার বার তাগাদা দিচ্ছে থানা পুলিশ।

সন্তানের পিতৃপরিচয়ের মামলার বাদী রবিয়া বেগম বলেন, আমি আমার সন্তানের পিতৃপরিচয় স্বীকৃতি পাওয়ার আগেই আমার সন্তানকে পরিকল্পিত ভাবে হত্যা করেছে, আমি এর বিচার চাই। সম্প্রতি করা ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফলকেও সে প্রত্যাখান করে পূনরায় শাহজালালকে ডিএনএ পরীক্ষা করার জন্য জোড় দাবী জানিয়ে বলেন শাহজালালই তার সঠিক পিতা এবং শাহজালালের পরিবারের সদস্যরাই তার সন্তানের হত্যা কারী। ধর্ষক শাহজালালের পিতা আবদুর রশিদ বলেন, রবিয়া অন্য কারো সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে সন্তান জন্ম দিয়েছে। তাঁর এ অপকর্মের দায় আমার ছেলের পক্ষ্যে নেওয়া সম্ভব নয়। আর বিষয়টি এখন তাদের হাতে নেই। যে ভাবেই হউক পুলিশের করা ডিএনএ পরীক্ষায় যেহেতু আমার ছেলে নির্দোষ তাই এখন এলাকার সমাজ পতি রাইএ ব্যাপারে সব সিদ্ধান্ত নেবেন। তারা শুক্রবার এশার নামাজের পড় রবিয়ার বাড়ীতেই শালিস ডেকেছেন আরো আলেম-ওলামা রয়েছে তারা বিষয়টি পর্যালোচনা করে রায় দেবেন। এক্ষেত্রে বেত্রাঘাত করা হবে, নাকি তওবা করানোর মাধ্যমে এলাকা ছাড়া করা হবে, তা আমরা সবাই মিলেমিশে সিদ্ধান্ত নেব। মুরাদনগর থানার উপ পরিদর্শক (এস আই) দেবাশীষ রবিয়ার ঘরে তালা দেয়ার কথা সত্যতা স্বীকার করলেও তিনি ও এড়িয়ে গিয়ে বলেন, আসামীদের ডিএনএ পরীক্ষা রবিয়ার সন্তানের পিতৃপরিচয়ের দাবীর সাথে মিলেনি বিধায় রবিয়া নিজেই ঘর তালা দিয়ে পালিয়েছে।

Check Also

করিমপুর মাদরাসায় বোখারী শরীফের খতম ও দোয়া

মো. হাবিবুর রহমান :– কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার করিমপুর জামিয়া দারুল উলূম মুহিউস্ সুন্নাহ মাদরাসায় ১৪৪০ ...

Leave a Reply