সালাত-নামায পরিশুদ্ধতার অন্যতম সোপান

মো. আলী আশরাফ খান ॥

আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন মুসলমানের জন্য অশেষ এক নেয়ামত হিসেবে সালাত-নামাযকে দান করেছেন। এই নামাযের মাধ্যমে একজন স্রষ্টাপ্রেমী সৃষ্টিকর্তার কৃপা লাভ-সান্নিধ্য তথা আধ্যাত্মিকতা অর্জনে সক্ষম হন। স্রষ্টার প্রতি ঈমান-বিশ্বাস আনয়নের মধ্যদিয়ে যেমন মানুষ ইসলামে দাখিল হয় তেমনি ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে নামায হলো অন্যতমÑকুরআন, হাদিস ও ইজমা দ্বারা প্রমাণিত ফরজ ইবাদত। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেন,“সালাত-নামায ইসলামের ভিত্তি। যে ব্যক্তি সালাত-নামায কায়েম করে সে ধর্মকে প্রতিষ্ঠিত করে। আর যে ব্যক্তি নামায ত্যাগ করল সে ধর্মকে নষ্ট করে দিল”।

সালাত আরবি শব্দ। যার আভিধানিক অর্থ-একাগ্রচিত্তে বিনীত-বিনম্রভাবে প্রার্থনা, অনুগ্রহ, স্রষ্টার পবিত্রতা বর্ণনা করা, তাঁর কাছে অবনত মস্তকে ক্ষমা প্রার্থনা করা ইত্যাদি। আর নামায শব্দটি সালাতের ফারসি নাম। উর্দ্দু ও হিন্দি ভাষাভাষীদের মত আমাদের বাংলা ভাষাভাষিদের মধ্যেও নামায শব্দটি বহুল প্রচলিত। আর এ অর্থে সালাত অর্থ্যাৎ নামায শরীয়তের পরিভাষায় আল্লাহ তা’য়ালার নির্দেশিত বিশেষ একটি ইবাদত যা তাঁর রাসূল (সাঃ) কর্তৃক প্রদর্শিত বিধি-বিধান মুতাবিক রুকু-সিজ্দাসহকারে নির্ধারিত পদ্ধতিতে ও সঠিক সময়ে আদায় করতে হয়।

যারা সত্য-সুন্দর শাশ্বত আলোর পথে ব্রতী হয়ে ইসলামের অমিয় সূধা গ্রহণ করতে চায়, তাদের জন্য এই ইবাদত বাধ্যতামূলক। অতি উত্তম একটি পথ। এর কোনো বিকল্প নেই। দুনিয়াবি হাজারো ব্যস্ততা বা কাজকে যত গুরুত্বপূর্ণই ভাবা হোক না কেনো এই অতি গুরুত্বপূর্ণ নামাযের কাছে সবই তুচ্ছ-এমন ভাবনাই প্রকৃত ঈমানদারের হওয়া বাঞ্ছনীয়। আযানধ্বনি কর্ণে পৌঁছা মাত্রই দুনিয়ার সব কাজ-কর্ম পরিত্যাগ করে নামাযে মগ্ন হওয়াই স্রষ্টাপ্রেমীর প্রধান বৈশিষ্ট্য। এ প্রসঙ্গে প্রিয় নবী হযরতে মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন,“ যারা আযানের আওয়াজ শুনে সালাত-নামাযের জন্য কাজ ছেড়ে প্রস্তুতি না নেয় বা ঘর হতে বের হয় না, তাদের ঘরে আগুন লাগিয়ে দিতে আমার ইচ্ছা করে। কিন্তু ঘরে স্ত্রী লোক ও শিশুরা থাকে বলে তা সম্ভব হয় না।”

মুসলমানগণ আসলেই মুসলমান কিনা এবং কর্ম-জীবনে সে আল্লাহর হুকুম পালন করতে প্রস্তুত কিনা এর বাস্তব পরীক্ষা- প্রমাণ নেয়ার জন্যই পাঁচওয়াক্ত সালাত-নামাযের ব্যবস্থা। আর এই অবস্থায়ই আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি বিশ্বাস-ভালোবাসার যাচাই বিশ্লেষণ হয়। আযান শোনে যদি কোনো মুসলমান বিন্দুমাত্র সাড়া না দেয় তবে পরিস্কার বুঝতে হবে যে, ইসলামের বিধান মতো সে জীবনযাপন করতে প্রস্তুত নয়, পারিবারিকভাবে সে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা পায়নি বা ভ্রান্ততা তাকে এতটাই গ্রাস করেছে যে-অন্ধকারে সে নিমজ্জিত। সুতরাং এ অবস্থায় তাকে নতুন করে ইসলামে দীক্ষা নিয়ে আলোর পথের চর্চায় অতঃপর জীবন যাপনে অভ্যস্ত হতে হবে এবং প্রার্থনা রত হয়ে নাযাতের জন্য বারংবার স্রষ্টার কাছে মস্তক অবনত করতে হবে।

প্রতিটি মুসলিম পরিবার-সমাজে ছেলেদের নয় বছর এবং মেয়েদের ক্ষেত্রে সাত বছর বয়সে থেকেই নামাজ পড়ার অনুশীলন বাধ্যতামূলক। যে কোনো অবস্থায় অর্থাৎ অসুস্থতা, সফরে গমন এমনকি যুদ্ধক্ষেত্রে ভয়াবহ সময়ের মধ্যেও নামায আদায় করতে হবে। সমস্যা যত সমস্যাই হোক না কেন, কম পক্ষে ফরয আদায় তাকে করতেই হবে। যদি দাঁড়ানো সম্ভব না হয় তাহলে বসে বসে, তাও সম্ভব না হলে শুয়ে শুয়ে-ইশারায় সালাত-নামায কায়েম করতে হবে। একমাত্র উন্মাদ অবস্থায়, হায়েয-মাসিক ও প্রসব পরবর্তী সময়ে নারীগণ এই ফরয থেকে অব্যাহতি পায়।

সালাত-নামায এমন একটি ইবাদত যা প্রত্যেক বালেগ, সুস্থ, জ্ঞানবান পুরুষ ও মহিলার উপর ফরযে আইন। শরীয়তসম্মত ওজর ছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে সালাত-নামায তরক করা গুনাহে কবীরা। রাসূলে পাক (সাঃ)-এর মক্কা অবস্থান কালে ৬২১ খ্রীস্টাব্দে নবুয়্যাতের ১২তম বর্ষ রজব মাসের দিবাগত রাত পবিত্র মে’রাজ রজনীতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত-নামায ফরয নির্ধারিত হয়। আল্লাহ তা’য়ালা সালাত-নামায ইবাদত সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের ৮২ (বিরাশি) জায়গায় বর্ণনা প্রদান করেন। শুধু তাই নয়, অন্য কোনো প্রসঙ্গে-বিষয়ে এতো বার কুরআনে তাক্বীদ করা হয়নি। সূতরাং এর গুরুত্ব যে বিশাল তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।

রাসূলে আকরাম (সাঃ) বলেছেনঃ “নামায মুমিনের জন্য মে’রাজ স্বরূপ”। অর্থাৎ স্রষ্টার সঙ্গে পেয়ারা নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর যে প্রেমের সেতুবন্ধন এবং উর্ধ্বলোকের এই ব্যতিক্রমী ঘটনার সঙ্গে সালাত-নামাযকে তুলনা করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেনঃ “নামায বেহেস্তের চাবি”। অর্থাৎ নামায কায়েম ব্যতিত কোনো মানুষ বেহেস্তে প্রবেশ করতে পারবে না। তাকে নামাযের মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তাকে রাজি-খুশী অতঃপর ওই চাবি অর্জন করতে হবে।

আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন তাঁর বান্দাদের উদ্দেশ্য বলেন-“(সালাত) অবশ্য অত্যন্ত কঠিন, তবে বিনীত লোকদের ব্যতিরেকে। (সূরা আল-বাক্বারা ২ঃ ৪৫) এই বাক্যে বোঝানো হয়েছে যে, যারা স্রষ্টার প্রতি অনুগত নয় তাদের ক্ষেত্রে নামায অত্যন্ত কঠিন। আর যারা বিনীত-স্রষ্টাকে পেতে ব্যাকুল তাদের জন্য নামায এক সহজ সরল পথ-নেয়ামত। সুতরাং এই নেয়ামত লাভে সকলকে অতি তৎপর হতে হবে। আমাদের অবশ্যই অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, সালাত-নামায কায়েম পরিশুদ্ধতার অন্যতম সোপান।

নামায সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বহু আয়াত উল্লেখ রয়েছে। এই ক্ষুদ্র পরিসরে এসবের উপস্থাপন অত্যন্ত কঠিন। তবে সর্বশেষ আমরা বলতে পারি যে, নামায প্রকৃতই এমন এক এবাদত, যার দ্বারা স্রষ্টাকে পাবার দোর উন্মোচিত হয়। কারণ, একজন মানুষ যখন পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করেন তখন সে কেনোক্রমেই কোনো খারাপ চিন্তা, খারাপ দৃশ্য, খারপ কর্ম করতে পারে না। যে কারণে স্রষ্টার প্রেমলাভে নামায পদ্ধতির কোনো বিকল্প নেই।

পবিত্র কুরআনে আলাহ সুবহান ওয়াতা’য়ালা উল্লেখ করেন,“নিশ্চয়ই সালাত-নামায মানুষকে সকল পাপ, অন্যায়-অশীলতা এবং লজ্জাহীনতার কাজ থেকে বিরত রাখে-ফিরাইয়া রাখে”। (সূরা ‘আনকাবুত ২৯ঃ৪৫)

অর্থাৎ একজন মানুষ যখন পাঁচ ওয়াক্ত সালাত-নামায কায়েম করবে তখন সে চিন্তা করবে যে, আমি তো এই মাত্র নামায আদায় করে আসলাম, সৃষ্টিকর্তার গুনগান করলাম, অঙ্গীকারে আবদ্ধ হলাম। আমি এই মন্দ কাজটি করতে পারি না। নামাযের শিক্ষা তো এটা নয়। সুতরাং আমাকে পরিশুদ্ধতার পথে পরিচালিত হতে হবে। স্রষ্টার নৈকট্য লাভ করতে হবে এই সত্য-সুন্দর পবিত্রতার মাধ্যমেই। আর নামায কবুল হলো কিনা এটা কিন্তু আমার বাস্তবিক চালচলনে বোঝা যাবে। সবচেয়ে বড় কথা, আমি নিজেই অনুধাবন করতে পারবো সবার আগে। আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের সকলকে সালাত কায়েম করার তৌফিক দান করুন; কবুল করুন আমাদের নামায, স্রষ্টার প্রেমে সিক্ত করুন আমাদের হৃদয়কে। আমিন।

-লেখক: কবি, কলামিস্ট ও গবেষক. গৌরীপুর, দাউদকান্দি, কুমিল্লা।

Check Also

মিনি ওয়াক-ইন-সেন্টারের মাধ্যমে রবি’র গ্রাহক সেবা সম্প্রসারণ

ঢাকা :– গ্রাহক সেবাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে মোবাইলফোন অপারেটর রবি আজিয়াটা লিমিটেড সম্প্রতি মিনি ওয়াক ...

Leave a Reply