ইট ভাটার ৩টি ছবি একই ফাইলে পাঠানো হয়েছে।

তিতাসে ১৫ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় ৪টি অবৈধ ইটভাটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ হুমকির সম্মুখিন পরিবেশ ও কৃষিজমি

নাজমুল করিম ফারুক, তিতাস প্রতিনিধি :
(ঘুষের বিনিময়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পেলেও ইট পোড়ানো লাইসেন্স নেই ৫টির)

ইট ভাটার ৩টি ছবি একই ফাইলে পাঠানো হয়েছে।
কুমিল্লার তিতাস উপজেলার ১৫ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় ৪টি ও আরো ২টি অবৈধ ইটভাটা নির্মাণের ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ পরিবেশ ও কৃষিজমি হুমকির সম্মুখিন হয়ে পড়েছে। এসব ইটভাটার কর্তৃপক্ষ ঘুষের বিনিময়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পেলেও ইট পোড়ানোর লাইসেন্স নেই ৫টির।

এক অনুসন্ধানে জানা যায়, ১০৭.১৯ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের তিতাস উপজেলায় প্রশাসনের সহযোগিতায় অবৈধভাবে ফসলি জমিতে গড়ে উঠেছে ৬টি (জে.এন্ড.জে ব্রিকস, মেসার্স রফিক ব্রিক্স এন্ড কোং, মেসার্স একতা ব্রিকস, মেসার্স এম.বি.এফ ব্রিকস, এম.এম.আর.বি, হাজী ব্রিকস) ইটভাটা। তারমধ্যে ১৫.১১ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের ভিটিকান্দি ইউনিয়নে গড়ে উঠেছে ৪টি ব্রিকস ফিল্ড। অন্য দু’টি আছে মজিদপুর ইউনিয়নে। মাত্র দু’টি ইউনিয়নে এতগুলো ব্রিকস ফিল্ড তৈরীর নজির বাংলাদেশের কোথায় রয়েছে বলে মনে হয় না। উপজেলা প্রশাসনের ইটের ভাটার সংক্রান্ত তথ্য বিবরণীতে ৪টি ইটভাটাকে অবৈধ দেখানো হলেও জে.এন্ড.জে ব্রিকস লাইসেন্স নবায়নের জন্য প্রক্রিয়াধীন (বৈধ) ও মেসার্স একতা ব্রিকস কে দেখানো হয়েছে বৈধ। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন, এগুলোকে বৈধ দেখানো হলেও পরিবেশ অধিদপ্তরের ১৯৮৯ সালের ইট পোড়ানো (নিয়ন্ত্রণ) আইনের ৫ ধারাকে তোয়াক্কা না করে ইটভাটা স্থাপন করা হয়েছে কৃষি, আবাদী, লায়েক জমিতে। সরকারী নিয়ম অনুযায়ী জনবসতি ও ফসলি জমির ৩ কিলোমিটার দূরে ভাটা নির্মাণ করার কথা থাকলেও তা মানেনি কর্তৃপক্ষ। যা সরকারী নিয়ম-নীতিকে বৃদ্ধাঙ্গলি দেখানো।

অন্য ৪টি মেসার্স রফিক ব্রিক্স এন্ড কোং, মেসার্স এম.বি.এফ ব্রিকস, এম.এম.আর.বি ও হাজী ব্রিকস গড়ে উঠেছে ফসলী জমিতে, জনবসতিপূর্ণ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংলগ্ন এলাকায়। যেন দেখার কেউ নেই। প্রশাসন ও মালিকদের গোপন সমঝোতায় তিতাসে উপজেলার ৬টি ইটভাটায় চলছে কাঠের বহ্নি উৎসব। পাশাপাশি চলছে আবাদি জমির টপসয়েল কাটার হিড়িক। সরকারি নীতিমালা লঙ্ঘন করে প্রশাসনের নাকের ডগায় উপজেলার ৬টি ইটভাটায় প্রতি বছর লাখ লাখ মণ কাঠ পোড়ানো হচ্ছে। হিসাবে মতে, ১ হাজার ইট পোড়াতে ১৫ মণ জ্বালানি কাঠ লাগে। মৌসুমে গড় হিসাবে একটি ভাটায় ১৮ থেকে ২০ লাখ ইট পোড়ানো হয়ে থাকে। সেখানে ৬টি ইটভাটায় প্রতি মৌসুুমে ২ কোটি ইট পোড়ানো হয়। সে অনুযায়ী ২ কোটি ইট পোড়ানোর জন্য প্রতি বছর কাঠ লাগে প্রায় ৩ লাখ মণ। সরকারের ভূমি মন্ত্রণালয়ের জারি করা ইটভাটা নির্মাণের জন্য ভূমি ব্যবহার শীর্ষক সার্কুলার মোতাবেক উর্বর জমির উপর, গ্রাম কিংবা বসতি স্থাপনার পাশে ইটভাটা নির্মাণকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। কেবল অকৃষিজ, পতিত জমি, নদীর তীরবর্তী এলাকা বা কোনো বিশেষ এলাকায় ইটভাটা তৈরি করতে বলা হয়েছে। আরও বলা হয়েছে, ইটভাটায় দেড় একরের (সাড়ে ৪ বিঘা) বেশি জমি ব্যবহার করা যাবে না। অথচ তিতাসে এক একটি ভাটার জন্য ২০ থেকে ৩০ বিঘা জমি ব্যবহার করা হচ্ছে। লঙ্ঘন করা হচ্ছে সংশিষ্ট অন্যান্য নীতিমালা। পরিবেশ অধিদপ্তরের ২০ অক্টোবর ২০০৩ নির্দেশনা মোতাবেক ইটভাটাগুলোতে ১২০ ফুট উচ্চতার ফিল্টারযুক্ত চিমনী লাগানোর কথা থাকলেও তা করা হয়নি। কম উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ফিল্টারবিহীন চিমনী থেকে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়ায় ভাসমান বস্তুকণা কার্বন মনোঅক্সাইড ও সালফার ডাই-অক্সাইড বাতাসে মিশে পরিবেশ দূষিত করছে।

উপজেলায় নতুন নতুন ইটভাটা গড়ে ওঠায় একদিকে আবাদি জমি যেমন কমছে, তেমনি জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিপন্নসহ অত্র এলাকার গাছ-গাছালি উজাড় হচ্ছে। ইটভাটার ধোঁয়া ও ব্যাপক হারে জমির উপরি স্তর থেকে মাটি কাটার ফলে অদূর ভবিষ্যতে মানবিক, পরিবেশগত ও অর্থ-সামাজিক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। ভূত্বক থেকে ৮ ইঞ্চি গভীর পর্যন্ত জৈব উপাদান বিদ্যমান। মাটির এ স্তরে (পাউলেয়ার) জমা থাকে ফসলাদি বা উদ্ভিদকুলের মূল খাদ্য হিসেবে। অথচ অপরিকল্পিতভাবে ২ থেকে ৪-৫ ফুট পর্যন্তু মাটির উপরি অংশ কেটে নেয়া হচ্ছে। ফলে বদলে যাচ্ছে আবাদি জমির প্রকৃতি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপর পড়তে পারে এর বিরূপ প্রভাব। ইট পোড়ানোর আইন, ৯৫ অনুযায়ী কৃষিজমিতে ইটভাটা করা যাবে না। এ আইন লঙ্ঘন করে কৃষিজমিতেই ইটভাটা করার অনুমতি দিয়েছে পরিবেশ রক্ষার দায়িত্বে থাকা সরকারি প্রতিষ্ঠান পরিবেশ অধিদপ্তর। এ ব্যাপরে চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মো. জাফর আলমকে মুঠোফোনে ‘আইনলংঘন করে আপনারা ইটভাটা তৈরীর ছাড়পত্র দিচ্ছেন কেন?’ প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, তাহলে বাংলাদেশের কোথাউ একটিও ইটভাটা তৈরী করা সম্ভব হবে না। কুমিল্লা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক শওকত আরা কলি মুঠোফোনে জানান, আমি তিন মাস পূর্বে এখানে জয়েন্ট করেছি। কোনটাকে এখনো নোটিশ দেইনি তবে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব। এ ব্যাপারে তিতাস উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আমিনুল ইসলাম জানান, আমি ব্যবস্থা নিয়েছি বর্তমানে মেসার্স রফিক ব্রিক্স এন্ড কোং বিরুদ্ধে মামলা চলছে। প্রয়োজন হলে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিতাস উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পারভেজ হোসেন সরকার বলেন, যারা সাধারণ জনগণের কথা চিন্তা না করে নিজেদের কথা চিন্তা করে জনবসতিপূর্ণ এলাকা, কৃষি জমিতে ইটভাটা তৈরী করে বা তৈরী করার অনুমতি দেন তাদের বিবেক বলতে কিছুই নেই। একটা স্বনামধন্য কলেজের পাশে গড়ে উঠেছে ইটভাটা যা আমাদের জন্য অত্যন্ত লজ্জাকর বিষয়। বিষয়টি নিয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলাপ করবেন বলে তিনি জানান।

Check Also

তিতাসে মেহনাজ হোসেন মীম আদর্শ কলেজের নবীনবরণ অনুষ্ঠিত

নাজমুল করিম ফারুক :— কুমিল্লার তিতাসে মেহনাজ হোসেন মীম আদর্শ কলেজের নবীনবরণ অনুষ্ঠান গত শনিবার ...

Leave a Reply