হাজী বাহার, মুস্তফা কামাল ও নাসিমুল আলম

কুমিল্লায় আফজাল খানের পরাজয় নয়- তিন এমপি’কে হুলুদ কার্ড

বিশেষ প্রতিবেদক:

হাজী বাহার, মুস্তফা কামাল ও নাসিমুল আলম
সদ্য সমাপ্ত হওয়া কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশান নির্বাচনে আ’লীগের সমর্থিত প্রার্থী অধ্যক্ষ আফজাল খান এডভোকেট অর্ধেক ভোটের ব্যবধানে বিএনপি থেকে অব্যাহতি প্রাপ্ত নেতা মো. মনিরুল হক সাক্কুর নিকট পরাজিত হয়েছেন। আফজাল খানের এ পরাজয়কে তিন এমপি’র প্রতি ভোটারদের হুলুদ কার্ড মনে করছেন অনেকেই। সরকার দলীয় তিন এমপি হলেন সদর আসনের আ.ক.ম বাহাউদ্দিন বাহার, সদর (দ:) আংশিক ও নাঙ্গলকোট থেকে নির্বাচিত কুমিল্লা জেলা আ’লীগের আহ্বায়ক অর্থমন্ত্রনালয়ের সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান আ’লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির অর্থবিষয়ক সম্পাদক বিসিবি’র সভাপতি আইসিসির ভাবী সহ-সভাপতি যিনি নিজেকে প্রধানমন্ত্রীর পরে নিজের স্থান মনে করেন এবং বহুগুনে গুনাম্বিত (!) আ হ ম মুস্তফা কামাল ওরফে লোটাস কামাল এবং অপরজন সদর (দ:) আংশিক ও বরুড়া থেকে নির্বাচিত মো. নাছিমুল আলম চৌধুরী নজরুল। তিনজনেই মাঠে ময়দানে দৌড়াইয়া উঠান বৈঠক করে ভোট প্রার্থনা করেছেন। লোটাস কামালের নেতৃত্বে নজরুল সহ দায়িত্ব নিয়েছেন সদর (দ:) এর ২৩ ভোট কেন্দ্রের। আর আ.ক.ম বাহা উদ্দিন বাহার দায়িত্ব নিয়েছেন তার নির্বাচনী এলাকার ভোট কেন্দ্রগুলোর। কিন্তু ফলাফলে দেখাযায় ৬৫ ভোট কেন্দ্রের মধ্যে প্রার্থীর বাড়ীর আশে পাশের ৫-৭ টি কেন্দ্রে ছাড়া আর কোন কেন্দ্রেই পাশ করতে পারেনি। দুই এমপি’র দায়িত্বে থাকা ২৩ কেন্দ্রের মধ্যে কোন কেন্দ্রেই ২০০-৩০০ ভোটের বেশী পাওয়া যায়নি। সকল কেন্দ্রে মিলিয়ে ৮-৯ হাজার ভোট পেয়েছেন। আর আ.ক.ম বাহার উদ্দিন বাহারের বাড়ী থেকে মাত্র ২০০ গজ দূরে হোচ্চা মিয়া স্কুল কেন্দ্রে মনিরুল হক সাক্কু পেয়েছেন ১২৩৫ ভোট এবং আফজাল খান পেয়েছেন মাত্র ৫৬২ ভোট। এতে বুঝা যায় তারা গত তিন বছরে এলাকায় কি কাজ করেছেন (?) এবং নেতাকর্মী ও ভোটারদের সাথে কত দূরত্ব হয়েছে বরং এ তিন এমপি কে গনভবনে আটকিয়ে রেখে তৃনমূল নেতাদের উপর দায়িত্ব ছেড়ে দিলে দলীয় প্রার্থী পাশ করার সম্ভাবনা অনেক বেশী ছিল বলে দাবী করেন স্থানীয়রা। এরা তিনজনেই আফজাল খানের প্রতি জেলাছি রাখেন। এছাড়া কুমিল্লায় আফজাল খান ও বাহারের বৈরীভাব দীর্ঘদিনের। কুমিল্লার আ’লীগের একাধিক সমর্থক জানান, জনাব বাহার সাহেব সকল সভায় বলতেন তিনি যাকে লালন পালন করে রাজনীতি শিখিয়েছেন তিনিও মেয়র প্রার্থী (তানিম) কিন্তু একবারের জন্য চেষ্টা করেছেন কি? তানিমের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের। কিন্তু তিনি যে আই ওয়াশ মূলক বক্তব্য রেখে ভোটে প্রচারনায় চালিয়েছেন সেটা বক্তব্য শুনলেই বুঝা যায়। এছাড়া তার ক্ষমতামলে টেন্ডারবাজি, দখলবাজি, বিভিন্ন সরকারী অফিসে খবর দারি করেছেন। এগুলোর জন্য বর্তমানে খেসারত দিয়েছেন আফজাল খান। ভবিষ্যতে তিনি যে জামানত হারাবেন সেটা পরিষ্কার বুঝা যায়। জনাব বাহারের বাহারি শাসনের প্রথম হুলুদকার্ড দিয়েছেন বাকী লাল কার্ডটা উনার নিজের জন্য অপেক্ষা করছে। আর আগামী সংসদ নির্বাচনে ভোট শুরুর প্রথম ধাপই লালকার্ড পেয়ে যাবেন অনেক গুনে গুনাম্বিত আ হ ম মুস্তফা কামাল ওরফে লোটাস কামাল, সেটা তার নির্বাচনী এলাকায় ঘুরলেই সহজে বুঝা যায়। তবে আফসোসের বিষয় বলে সমর্থকেরা মনে করেন যদি ঐ এলাকায় বিএনপি থেকে আবদুল গফুর ভূঁইয়া মনোনয়ন পান তাহলে জামানত বাজেয়াপ্ত হবার সম্ভাবনা বেশী। তাই তারা দোয়া করেন মনোনয়নটা যেন মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া পায়, তাহলে অন্তত অর্ধেক ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হলেও ইজ্জতটা রক্ষা পাবে। কারন মাশাল্লাহ উনি ভোটার সমর্থক দূরে থাক এ পর্যন্ত নেতাকর্মীদের সাথে ভালভাবে পরিচয় করার চেষ্টা করেনি। তার নির্বাচনী এলাকার জনগন ও ভোটারের ভাগ্যে এককাপ লাল চা জোটেনি। তিনি প্রভাব খাটিয়ে নিজ ভাইকে সদর (দ:) এর উপজেলা চেয়ারম্যান করেছেন, আর নেতাকর্মীরা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেন অসহায় এতিমের মত। বিশেষ করে বেশি অসহায় অবস্থায় লক্ষ্য করা যায় নাঙ্গলকোটের আ’লীগ নেতাকর্মীদের, এমপি হয়ে গেছে তাদের জন্য দূর্লভ। এছাড়া উন্নয়ন কর্মকান্ড একদম নাই বললেই চলে। অতএব প্রাথমিক ভাবে সিটি কর্পোরেশানের নির্বাচনের উছিলায় হুলুদ কার্ড পেয়েছেন তবে লাল কার্ড জনগনের পকেটে প্রস্তুত রয়েছে।

যারা গনসংযোগ ও উঠান বৈঠকে সাংসদ লোটাস কামালের সাথে সফর সঙ্গী হয়েছেন এদের মধ্যে অনেকেই জানান বৈঠকে লোকজনের তেমন উপস্থিতি দেখা যায়নি। যারা এসেছেন তারাও লোটাস কামালের সমালোচনা করেছেন। বিশেষ করে শেয়ার বাজারের কেলেংকারী নিয়ে মানুষ মুখরোচক আলোচনা করেন বলে তার সাথে নাঙ্গলকোট উপজেলায় আ’লীগের এক প্রভাবশালী নেতা জানান, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঐ প্রভাবশালী নেতা আরো জানান কামাল সাহেব এমপি হলে সাংগঠনিক কার্যক্রম একেবারে বন্ধ হয়ে যায়, ফলে নেতাকর্মীদের আর খুঁজে পাওয়া যায় না। তিনি নিজ দলের কর্মীদের মূল্যায়ন ন্ াকরে জামায়াত ও বি এনপি কর্মীদের কাছে ভীড়াতে চান। উল্লেখ্য গত ২৪শে ডিসেম্বর নাঙ্গলকোট উপজেলা ওলামালীগের সম্মেলনে বক্তব্যের মাঝে বলেছেন যুদ্ধাপরাধীরা ক্ষমা চাইলে আ’লীগ ক্ষমা করে দিবেন। তৎসময়ে সভাস্থলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ঐ সম্মেলনে স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামী ওলামালীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মো. ইলিয়াছ হোসেন বিন হেলালী সহ অনেক কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ। সাংসদের এহেন বক্তব্য জনাব হেলালী সাহেবও বিব্রত বোধ করেন। কারন যে মূহুর্তে যুদ্ধাপরাধাদের বিচারের দাবীতে দেশবাসী সোচ্চার ঠিক সে মূহুর্তে এ ধরনের বক্তব্য রাজনৈতিক শিষ্টাচার লংঘন বলে মন্তব্য করেন নেতাকর্মীরা।

আর সদর (দ:) আংশিক ও বরুড়া থেকে নির্বাচিত সাংসদ নাছিমুল আলম চৌধুরী নজরুল মেয়র ভোটের জন্য ক্যানভাস করার সুযোগ পায়নি। কারন যেখানে যেতেন সেখানেই জনসাধারণের তোপের মুখে পড়েছেন। তাহারাও আগামী সংসদ নির্বাচনে জামানত হারানোর সম্ভাবনা অনেক বেশী। নিজ উপজেলা বরুড়াতে তেমন উন্ন্য়নমূলক কর্মকান্ড নাই। সিটি নির্বাচনের মাত্র কয়েকদিন আগে অর্থাৎ ৩১শে ডিসেম্বর গালিমপুর ইউনিয়নের ঘোষপা আবদুল বাসেত মজুমদার মর্ডান স্কুলের বার্ষিক আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরনী অনুষ্ঠানে সাংসদ নজরুল প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। সেই সভায় প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ফেনী থেকে নির্বাচিত সাবেক সাংসদ জয়নাল হাজারী। সভায় ওই ইউনিয়নের আ’লীগ সভাপতি মাস্টার মোবারক হোসেন গত তিন বছরে কোন উন্নয়ন কর্মকান্ড নাই এবং সাংসদের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছিলেন জনগন ইতিমধ্যেই তাদের প্রতি মুখ ফেরানোর কথা। তখন সাংসদ নিজেই রাস্তাঘাটের অবস্থা খারাপ বলে স্বীকার করেন। আগামীতে সুন্দর চেহারা দেখে ভোট দিবেনা সেটা পরিষ্কার বুঝা যায়। সুতরাং ২৩ কেন্দ্রের ভোটের নেতিবাচক প্রভাব শুধু আফজাল খানের বিপক্ষে নয়। সাংসদের প্রতি ক্ষোভের কিঞ্চিত বহি:প্রকাশ। বাকীটা জমা রেখেছেন সাংসদ নির্বাচনের জন্য। মেয়র প্রার্থী আফজাল খানের অসুস্থতার সুযোগে অনেক নেতাই তাকে “ঘুম পাড়ানি মাসি পিসি” গান গেয়ে ঘুমিয়ে রেখেছিলেন। তারা বগলে ইট রেখে ভোটের জন্য কাজ করেছেন এটা পরিষ্কার। যেমন নাঙ্গলকোট উপজেলা আ’লীগের সভাপতি ভোট ক্যাম্পিং এর জন্য ৫২ জন নেতাকর্মীকে কুমিল্লায় তার নেতৃত্ব রেখেছেন। ডাহা সম্পূর্ন মিথ্যা! ৩০শে ডিসেম্বর কুমিল্লাস্থ নাঙ্গলকোট উপজেলাবাসীর মতবিনিময় সভায় (মর্ডান স্কুল মিলনায়তনে) নেতাকর্মীদের উপস্থিতি প্রমান করে। সে সভায় নাঙ্গলকোটের অধিবাসীর কোন ভোটার দেখা যায়নি। বরং সাংসদ লোটাস কামালের আকস্মিক উপস্থিতিতে সভায় বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। তিনি ছাড়া আর কারো বক্ততৃায় সুযোগ না থাকায় যদিও ২/৪ জন ভোটার ছিল, হয়ত তারাও সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ফেলেছে।

কুমিল্লা জেলা আ’লীগ ও সহযোগি সংগঠনের যে সকল নেতা আন্তরিকভাবে চেষ্টা করেছেন দলীয় প্রার্থী পাশ করার জন্য, যাদের তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে তারা হলেন সাবেক আইনমন্ত্রী এডভোকেট আবদুল মতিন খসরু এম পি কুমিল্লা (উ:) জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম সরকার, অধ্যক্ষ আ.রউফ, শিল্পপতি সালাউদ্দিন আহমেদ, কোতয়ালী সাধারণ সম্পাদক মো. ইলিয়াছ, এড.সেলিম, এডভোকেট রুস্তুম, সফিকুল ইসলাম সিকদার, সাংসদ তাজুল ইসলাম, যুবলীগ সভাপতি মো.শাহীন সেক্রেটারী, মো. মঞ্জু, স্বেচ্ছাসেবকলীগের আহবায়ক সদর (দ:) এর ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাবলু, যুগ্ম-আহবায়ক সাদেকুর রহমান রানা ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা কবির সিকদার।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply