মহাজোট সরকারের গেল ৩ বছর : মুরাদনগরের মানুষ চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসের কবল থেকে রক্ষা পেলেও বেশিরভাগ প্রত্যাশাই পূরণ হয়নি

মোঃ শরিফুল আলম চৌধুরী, মুরাদনগর (কুমিল্লা) থেকে :
সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মুরাদনগরের জনগন সব হিসাব পাল্টাতে না পারলেও গত উপজেলা ও ইউপি নির্বাচনে সে হিসাব পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছিলেন। গত ২০০৯ সালে তারা বিএনপি’র ঘাঁটি বলে খ্যাত মুরাদনগর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে উপজেলা চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান দু’পদেই বিপুল ভোটে বিজয়ী করেছিলেন আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সমর্থিত প্রার্থীদের। শুধু তাই নয়, গেল ২০১১ সালের ৫জুলাই অনুষ্ঠিত ইউপি নির্বাচনেও মুরাদনগরের ২২টি ইউপি’র মধ্যে ১৭টিতেই তারা বিজয়ী করেছিলেন মহাজোট সরকার সমর্থিত প্রার্থীদের এরই মধ্য দিয়ে তারা নতুন প্রত্যাশা করেছিলেন একবুক ভরা স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু তিন বছর অতিবাহিত হয়ে গেলেও তাদের সেই স্বপ্নের বেশিরভাগ প্রত্যাশাই অপূরণ রয়েগেছে।
অনেক প্রত্যাশার মধ্যে মুরাদনগরের সাধারণ মানুষ একটি বিষয়ে প্রথমই স্বস্তি চেয়েছিলেন। সেটি হলো চিহ্নিত চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাস থেকে মুক্তি পাওয়া। কারণ অতীতে এ অঞ্চল চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসের অভয়ারন্য বলে সর্বমহলে ব্যাপক পরিচিত হয়ে উঠেছিল। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও শুধু রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষই নয় লাশও পরেছিল। চাঁদা ও পূর্বানুমতি ব্যাতীত ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ সরকারী ভবনের গেটে কেউ কখনও যেতে সাহস করেনি, আর যারা না পেরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যেতে চেয়েছিল তারা ফিরতে হয়েছে রক্তমাখা শরীরে আহত হয়ে। এমনটাই বললেন, দারোরা ইউপি’র ১নং ওয়ার্ড সদস্য জহিরুল ইসলাম, নবীপুর (পঃ) ইউপির চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন, দারোরা ইউপির চেয়ারাম্যান আবদুল কাদের মোক্তার ও ধামঘর ইউপির ভূবনঘর গ্রামের বাসিন্দা খায়রুল আলম সাধন সহ দারোরা গ্রামের সেলুন দোকানদার আলম মিয়া। তন্মধ্যে দারোরা ইউপির বর্তমান চেয়ারম্যান আবদুল কাদের মোক্তার বলেন, আমি মহাজোট সরকারের পূর্ববর্তী সময়েও মুরাদনগর সাব-রেজিষ্ট্রি অফিসে দলিল লেখার পেশায় নিয়োজিত ছিলাম। ওই সময়ে কিছু দু:স্কৃতিকারী আমাকে দিয়ে অবৈধভাবে জাল দলিল করিয়ে তাদের স্বার্থসিদ্ধি আদায় করতে না পেরে আমি ও আমার পরিবার তাদের রোষানলে পড়ি। পরে জীবনের নিরাপত্তার ভয়ে মুরাদনগর সদরের ভাড়া বাসায় হাজার টাকার মালামাল ফেলে দিয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হই। এরকম অহরহ ঘটনা নিয়ে সংবাদ পত্রে গোটাদেশের মধ্যে মুরাদনগরের সংবাদ শীর্ষে অবস্থান করত। অভিযোগ ছিল, যারাই ক্ষমতার মসনদে ছিল, তারাই ওই সব সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজদের লালন পালন করত, তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করার জন্য। সে কারণে মুরাদনগর হয়ে উঠেছিল চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসের জনপদ। অবশ্য বর্তমান সরকারের তিন বছরে এই ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ স্বস্তিতে ও নিরাপদে রয়েছে। এখন আর পূর্বেকার মতো সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজরা উচ্চ পর্যায়ের মদত পেয়ে সুবিধা করতে পারছেনা। সে কারণে আগের মতো এখন আর সন্ত্রাসী কার্যক্রম নেই।

অন্যান্য বিষয়ে খোঁজ নিয়ে গিয়ে জানা যায়, মানুষ তৎকালীন ক্ষমাতসীন মহলের নানাহ অনৈতিকতায় অতিষ্ট হয়েই বিপূল ভোটে উপজেলা ও ইউপি নির্বাচনে মহাজোট সমর্থিত প্রার্থীদের জয়ী করেছিলেন। দিন বদল, উপজেলার সার্বিক উন্নয়ন, মুরাদনগর কে পৌরসভা ঘোষনা ও যুদ্ধাপরাধী এবং একুশে আগষ্ট গ্রেনেড হামলাকারীদের বিচারের দাবিতে ভোট দিয়েছিলেন নতুন প্রজন্মের ভোটাররা। এদের অনেকেই কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সরাসরী সম্পৃক্ত নন। তারা অনেক আশা নিয়ে মুরাদনগরের উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের ওয়ার্ড নির্বাচনেও নতুন মুখকে জয় লাভ করিয়েছিলেন। এছাড়া সাধারণ ভোটাররাও নির্বাচনের পর বর্তমান আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের নিকট নানাহ প্রত্যাশা করেছিলেন। বিশেষ করে তারা বাঙ্গরাকে নতুন থানা ঘোষনা, মুরাদনগরে কুমিল্লা (উঃ) জেলার প্রশাসনিক কার্যালয় স্থাপন, দারোরা ইউপির কাজিয়াতল-সিদ্বেশ্বরী সড়কে ভোরের ঘাটের সেতু, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, মেডিকেল কলেজ, উপজেলার গর্ভে ধারণ করা বাখরাবাদ, বাঙ্গরা ও শ্রীকাইল গ্যাস কুপ হতে গ্যাস উত্তোলন করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মুরাদনগরের প্রতিটি গ্রামে সরবরাহ সহ উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক গুলো উন্নয়ন চেয়েছিলেন। এদিক দিয়ে ভোটার সহ সাধারণ মানুষরা এখন হতাশ। কারণ তিন বছরে এই মহাজোট সরকারের উদ্দ্যোগে এক্ষেত্রে উন্নয়ন কর্মকান্ডে তেমন কোন ছোঁয়া লাগেনি। সেই সাথে নির্বাচনের আগে দেয়া জনপ্রতিনিধিদের প্রতিশ্র“তিও বাস্তবায়ন হয়নি। মুরাদনগর উপজেলা পরিষদের ৩টি পদের মধ্যে দুইটি ও ২২টি ইউপির ১৭টিতেই জয়লাভ করেন মহাজোট সমর্থিত প্রার্থীরা। এলাকাবাসীর ভাষ্য, কেবল রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ও উপজেলার উন্নয়নের আশায়ই মহাজোট সমর্থিত প্রার্থীদের কে তারা ভোট দেন। ঢালাও ভাবে দীর্ঘদিন ধরে জীবনের নিরাপত্তার ভয়ে ভোট দেয়ার কালচার থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে মুরাদনগর বাসী। সবার ধারণা ছিল, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান সহ উপজেলার ২২টি ইউনিয়নের ১৭টিতেই মহাজোট সমর্থিত প্রার্থীরা জয়লাভ করেছে। সেখানে এবার মুরাদনগর বাসী দীর্ঘদিনের দাবীগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন হবে। কিন্তু তা আর হয়নি। অবশ্যই খুব শিগগিরই একটি দাবি পূরণ হতে যাচ্ছে মুরাদনগরের বাঙ্গরা কে নতুন থানা ঘোষণা, যা কেবলমাত্র একনেকের অনুমোদনের অপেক্ষায়। তাছাড়া অন্য দাবি গুলো এখনো বস্তাবন্দী।

মুরাদনগর উপজেলার অধিকাংশ এলাকায় উন্নয়ন হয়নি। শুধুমাত্র নতুন থানা ঘোষনার সীমানা নিয়ে জটিলতার কারণে। পৌরসভা ঘোষণা না হওয়ায়ও স্থবির হয়ে আছে এ উপজেলার অনেক উন্নয়ন কার্যক্রম। এখানে ক্ষমতাসীন দলের উদাসীনতাই অন্যতম প্রতিবন্ধকতা বলে অভিযোগ রয়েছে এলাকাবাসীর। এদিকে ক্ষমতাসীন দল পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন কুমিল্লা (উঃ) জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম সরকার সহ আরও কয়েকজন জেলা পর্যায়ের নেতা। রয়েছে দলের মধ্যে বিভেদ। আরও অভিযোগ রয়েছে টেন্ডার বাজি, হাট বাজার ও জলমহাল ইজারা বানিজ্য পরিচালনায়। এসব নিয়ন্ত্রণ করেন কুমিল্লা (উঃ) জেলা ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্চাসেবক লীগের হাতে গোনা কয়েকজন নেতা। এ নিয়ে নিজেদের মধ্যে কয়েক দফা সংঘর্ষও হয়েছে। ধারণা পাওয়া যায়, এখানে আওয়ামীলীগের প্রতিদ্বন্দী আওয়ামীলীগ, যে কারণে উন্নয়ন কাজে বড় বাধা ও প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হচ্ছে। একারণেই পুরোপুরি হতাশ মুরাদনগর বাসী। তবে দুটি সাফল্যের কথা বলা যায় অত্যন্ত গৌরব ও গর্বের সঙ্গে। শিক্ষা ও ক্রীড়ার ক্ষেত্রে আগের চেয়ে শতভাগ সাফল্যে এগিয়েছে। গত ৩বছরে বিভিন্ন পরীক্ষায় মুরাদনগরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ফলাফল বেশ উল্লেখ করার মতো পিছিয়ে নেই খেলাধুলায়ও। প্রথমবারই ‘‘বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্ট-২০১১’’ তে মুরাদনগরের কাজিয়াতল (দঃ) সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্ষুদে মহিলার ফুটবলাররা ট্রাইবেকারে যেয়ে জেলার রানার্সআপ বিজয়ী হয়। পূর্বেরকার পতিত কৃষি জমিগুলিতেও এসেছে বড় ধরনের সাফল্য। কিন্তু এখানে আবার বড় ধরনের হতাশাও রয়ে গেছে কৃষকের, গত কয়েক বছর ধরে তারা উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেনা। বিশেষ করে সবজি ও বোরো ধান চাষ ও মৎস্য চাষে মুরাদনগরে সাফল্য অনেক। মুরাদনগরের ২২টি ইউনিয়নের মধ্যে এখনো অবহেলিত রয়েছে দারোরা, ছালিয়াকান্দি, পাহাড়পুর, রামচন্দ্রপুর (দক্ষিণ, বাংগরা (পঃ) ও আন্দিকোট ইউনিয়নের সবক’টি গ্রাম। বিজ্ঞ জনের অভিমত ১৭ইউপি চেয়ারম্যানের মধ্যে কোন সমন্বয় নেই। এ পর্যন্ত তারা নির্বাচিত হওয়ার পর কেবলমাত্র শপথ অনুষ্ঠান ছাড়া একসঙ্গে তাদের কোন অনুষ্ঠানে দেখা যায়নি। পরস্পরের মধ্যে রয়েছে বিভেদ। বিশেষ করে একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার পলাতক আসামী এমপি কায়কোবাদের ডাকে তার যে কোন পারিবারিক উৎসবে ইতিপূর্বে যে দলের চেয়ারম্যান ও মেম্বাররাই ক্ষমতায় এসেছে সেখানে সবাই বাধ্যতামূলক উপস্থিত থাকতেন। এই বিভেদই এলাকার উন্নয়ন থামিয়ে রেখেছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর। উপজেলার উন্নয়ন সভায়ও হাতে গোনা দুই চারজন চেয়ারম্যান ছাড়া অন্যদের কে দেখা যায়না। এমনকি গৌরবের বিষয় হলেও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্টে মুরাদনগরের কাজিয়াতল (দঃ) সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রীদের জেলা পর্যায়ের ফাইনাল খেলার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানেও মুরাদনগরের কোন জনপ্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত অনেকে ক্ষোভের সহিত অভিযোগ করেন যে, কেবল মহাজোটের সমর্থিত ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যদের উদাসীনতাই ব্যহত হচ্ছে মুরাদনগরের উন্নয়ন। মুরাদনগর আসনের সংসদ সদস্য কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ বিদেশে পলাতক থাকার কারণে মুরাদনগরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রন এখন কুমিল্লা (উঃ) জেলা আওয়ামীলীগের কয়েকজন নেতার হাতে। যে কারণে বিভিন্ন দফতরে টেন্ডার কার্যক্রম, সরকারী কর্মকর্তাদের বদলী সহ উপজেলার সব কর্মকান্ডই নিয়ন্ত্রন করছেন ওই কয়েকজন আওয়ামীলীগ নেতা। এতে করেও মুরাদনগর বাসী চরম হতাশ তবে এতকিছুর মধ্যেও সন্ত্রাস কবলিত মুরাদনগরে মাদকসেবীদের তৎপরতা রুখতে থানা পুলিশ ও উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তার ভূমিকা প্রশংসনীয়। মহাজোট সরকারের সাফল্যের তালিকায় এটিকে প্রাধান্য দেয়া যায়। এ সরকারের আমলে উল্লেখযোগ্য উন্নয়নের মধ্যে রয়েছে ১৬ কোটি টাকা ব্যায়ে ২১টি বেসরকারী স্কুল ভবন নির্মাণ। এছাড়া টেন্ডার আহবান করা হয়েছে বহুল প্রতীক্ষিত আলীরচর সেতুর। আরও উদ্দ্যোগ নেয়া হয়েছে দারোরা ইউপির কাজিয়াতল মরিচা খালের উপর ভোরের ঘাটে সেতু নির্মাণের।

Check Also

করিমপুর মাদরাসায় বোখারী শরীফের খতম ও দোয়া

মো. হাবিবুর রহমান :– কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার করিমপুর জামিয়া দারুল উলূম মুহিউস্ সুন্নাহ মাদরাসায় ১৪৪০ ...

Leave a Reply