জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করে সৃজনশীল বই-পাঠাগার

মো. আলী আশরাফ খান :

যে কোনো জাতির সর্বাঙ্গীন অগ্রসরতা অর্জনের জন্য মানব সম্পদের উন্নতি বিধান অত্যন্ত জরুরি। মানব সম্পদ উন্নয়নের তাৎপর্য বহু-ব্যাপক। মানব উন্নয়ন মানে ব্যক্তি মানুষকে মননে-মেধায় এবং দক্ষতার দিক দিয়ে উৎকৃষ্ট করে গড়ে তোলা। দক্ষ ও যোগ্য মানুষ সেই হতে পারে, যার মন বিকশিত; সুপ্ত মেধাকে যে কাজে লাগিয়ে নিজের এবং অপরের কল্যাণ সাধনে ব্রত হয়। বলা বাহল্য, মানস বিকাশের জন্য সৃজনশীল পুস্তক যে কতটা অপরিহার্য তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

যদিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠ্যক্রম অনুযায়ী নানা বিষয়ে পাঠ গ্রহণের মাধ্যমে মানব জীবনের জমিন কর্ষিত হয়, কিন্তু সেই জমিনে ফসল ফলানোর জন্য প্রয়োজন আরও জ্ঞান; আরও পড়াশোনা-জানাশোনা তদার্থে অব্যাহত পাঠ প্রক্রিয়া। যা থেকে যেকেউ ইচ্ছানুসারে উন্নত হতে পারে অনায়াসে। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষ নতুন নতুন জ্ঞান বা শিক্ষা অর্জনে নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে এটাই স্বাভাবিক। যার ধারাবাহিক আশ্রয়স্থল বই-বই-বই। আমাদের মনে রাখতে হবে, নিঃসন্দেহে বই মানুষের জ্ঞানার্জনের ধারাটিকে বেগবান এবং প্রায়োগিক পরিপূর্ণতায় শ্রেষ্ঠ করে গড়ে তোলে ।

আর সেক্ষেত্রে পাঠক সৃষ্টিতে পাঠাগারের ভূমিকাও বিরাট। জ্ঞান-মেধার উৎকর্ষ সাধন তথা সভ্যতা বিকাশে পাঠাগার এবং গ্রন্থাবলীর প্রয়োজনীয়তা মানুষ অনুধাবন করে প্রায় চার হাজার বছর পূর্বে। খ্রিস্টের জন্মের দুই হাজার বছর পূর্বে আসিরীয় রাজ্যে গড়ে ওঠে পৃথিবীর সর্বপ্রথম লাইব্রেরী-গ্রন্থাগার। মাটির ফলকে উৎকীর্ণ করে রাখা হয় জ্ঞান-অভিজ্ঞান, তত্ত্ব ও তথ্য। ল্যাটিন শব্দ খওইঊজ হতে লাইব্রেরী শব্দের হয় উৎপত্তি। আর লিবার শব্দের অর্থ পুস্তক। ওইসময় পুস্তক সংগ্রহ এবং সংরক্ষণে জ্ঞানী-গুণী এবং সমঝদার শাসকবর্গই হয়ে ওঠেন তৎপর। ১৪৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ভ্যাটিকান লাইব্রেরী। ১৬০২ খ্রিস্টাব্দে স্থাপিত হয় অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্যার টমাস বডলি’ লাইব্রেরী। আমেরিকার সবচে’ প্রাচীন লাইব্রেরীটি ১৯৩৮ সালে জন হার্ভার্ডের উদ্যোগে স্থাপিত হয়। ব্রিটিশ মিউজিয়াম লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠিত হয় ১৭৫৩ সালে।

এই উপমহাদেশে লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা এবং লাইব্রেরী চর্চার ইতিহাসও কম প্রাচীন নয়। মোগল আমলে এবং তার আগেও প্রাসাদকেন্দ্রিক ছিল লাইব্রেরী। ব্রিটিশ শাসনামলে অভিজাত শ্রেণীর অনেকের বাড়িতে ছিল পারিবারিক লাইব্রেরী। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে স্থানে স্থানে পাবলিক লাইব্রেরী স্থাপনে বিভিন্ন মহল উদ্যোগী ভূমিকা লক্ষ্য করা যায়। পঞ্চাশ-ষাট এমনকি সত্তর দশকেও আমাদের দেশের প্রতিটি স্কুল-কলেজে ছাত্র ও শিক্ষকগণের জন্য ছিল লাইব্রেরী।

কাগজপত্রে এবং বাস্তবে অবশ্য এখনও আমাদের দেশে অনেক লাইব্রেরী রয়েছে। কিন্তু এসব লাইব্রেরী চর্চা উল্লেখযোগ্য নয়। আজকাল শিক্ষকদেরও লাইব্রেরী চর্চায় এবং ছাত্র-ছাত্রীদেরও এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে উৎসাহ প্রদান করতে তেমন দেখা যায় না। অতীতে শহরাঞ্চলের পাড়ায়-মহল্লায় এমনকি গ্রামগুলোতেও শিক্ষিত লোকেরা মিলে লাইব্রেরী গড়ে তুলতেন। আর এক্ষেত্রে তরুণরাই পালন করতো অগ্রণী ভূমিকা। স্বল্পশিক্ষিত গৃহবধূ, মা ও বোনেরাও পাড়ার লাইব্রেরী থেকে লোকজনের সহায়তায় বই পাঠ করতেন।। কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে ততই তথ্য প্রযুক্তির নামে আধুনিক ও বিলাসী হয়ে পাঠচর্চা তথা লাইব্রেরীর প্রতি মনোযোগ হারাতে বসেছি আমরা! অথচ শিক্ষা অর্জন, জ্ঞান অন্বেষণ ও বিদ্যা লাভ, মনের খোরাক জোগানো কিংবা অবসরের অতুলনীয় সঙ্গী হিসেবে বই তথা পাঠাগার আমাদের প্রয়োজনের এক অপরিহার্য সামগ্রী বলে কাগজে আমরা লিখি এবং পড়ি কিন্তু বাস্তবে এর নামমাত্রই রয়েছে প্রয়োগ আমাদের মধ্যে।

সেকালের ওমর খৈয়াম, একালের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, প্রমথ চৌধুরী, সৈয়দ মুজতবা আলীসহ বহু মনীষী বইয়ের প্রয়োজনীয়তা সমন্ধে গুরুত্বারূপ করেছেন। অথচ আমাদের দেশে বই ও পাঠাগার নিয়ে ফলপ্রসু কার্যক্রম তেমন নেই বললেই চলে। আজকাল দেখা যায়, অধিকাংশ তরুণ-তরুণী, ছাত্র-ছাত্রী যৎসামান্ন উপন্যাস, গল্প, কবিতা, থ্রিলার এর মধ্যে এবং পাঠ্যপুস্তকের বাড়তি কোনো বই পড়তে চায়না। যে কারণে তাদের জ্ঞানও থাকে সীমাবদ্ধ।

আমাদের জীবনকে সুন্দর করে সাজাতে হলে অবশ্যই উচুঁ মানের বিভিন্ন ধরনের বই পড়তে হবে। ইতিহাস দর্শন, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, রাজনীতি চলমান ঘটনা, বিশ্ব পরিস্থিতি, শিল্প-সংস্কৃতি, মহামানবদের জীবনকাহিনী প্রভৃতি পুস্তক অধ্যয়ন করতে হবে। এবং পাশাপাশি আদর্শিক ও ধর্মীয় পুস্তক অধ্যয়নের মধ্যদিয়ে আদর্শ চরিত্র ও উন্নত নৈতিকতা অর্জন করতে হবে। আর এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকে উপলব্ধি করেই যুগে যুগে কিছু সৃষ্টিশীল মানুষ সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বই আদান-প্রদান তথা প্রতিষ্ঠা করেছেন পাঠাগার।

পাঠাগার সম্পর্কে বলতে গিয়ে আরব দার্শনিক-ইবনে খালদুন পাঠাগারশূন্য রাষ্ট্রকে অপ্রয়োজনের প্রয়োজনীয় বস্তু হিসেবে অভিহিত করেছেন। দার্শনিক হেগেল মন্তব্য করেছেন, “পাঠাগারের মাধ্যমেই জনসমাজ যখন রাষ্ট্রীয় সমাজে রূপান্তরিত হয়, তখনই সে সাবালকত্ব অর্জন করে এবং বিশ্ব সমাজের অংশ হয়ে দাড়াঁয়”। এঙ্গেলস্-এর সুনির্দিষ্ট বক্তব্য হলো-“পাঠাগার শূন্য রাষ্ট্র যেনো শুকিয়ে মরার মতো”। সুতরাং সৃজনশীল পুস্তক সমৃদ্ধ পাঠাগারের প্রয়োজনীয়তা দায়িত্বশীলরা কখনই এড়িয়ে চলতে পারেন না। আজকাল সমাজে যারা অতিবুদ্ধিমান বা সচেতন বলে দাবী করেন, তারা কতটা এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে ভাবেন তা আমার বোধগম্য নয়। আমার মনে হয়, সমাজের বিত্তবান বা সৃষ্টিশীল মানুষগুলো যদি ইচ্ছা করে, তাহলে ২/৪ বছরের মধ্যেই দেশে সৃজনশীল বইয়ের পাঠক সৃষ্টি তথা তত্ত্ব ও তথ্য সমৃদ্ধ বইয়ের সমাহারে অসংখ্য পাঠাগার গড়ে তোলা যায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। আর তবেই আমাদের মধ্য থেকে দূর হবে অন্ধকার, কুসংস্কার, হিংসা-প্রতিহিংসা, অরাজকতা সর্বোপরি যাবতীয় সামাজিক অবক্ষয়।

-লেখক: কবি, কলামিস্ট, প্রবন্ধকার ও সংগঠক, গৌরীপুর, দাউদকান্দি, কুমিল্লা।

Check Also

দেবিদ্বারে মাদ্রাসার ফলাললে শিক্ষার্থীরা এগিয়ে : পিছিয়ে কলেজ

দেবিদ্বার প্রতিনিধি :– কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলায় এবারের এইচ এস সি ও আলিম পরীক্ষায় মোট জিপিএ-৫ ...

Leave a Reply