ইজি বাইকে বিজি নগরী : চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন মেয়র সাক্কু

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, কুমিল্লা :

প্রাচীনতম কুমিল্লা পৌরসভা ও সদর দক্ষিণ পৌরসভার সমন¦য়ে গঠিত হয়েছে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন। অষ্টম এই কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের বয়স আজ ১৮৮ দিন। ১৮৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কুমিল্লা পৌরসভা। ৫ জানুয়ারি এ সিটির নির্বাচনে কুমিল্লাবাসী তাদের অভিভাবক হিসেবে নির্বাচিত করেছেন রাজনৈতিক ঐতিহ্যবাহী পরিবারের সন্তান মনিরুল হক সাক্কুকে। অন্যদিকে সাক্কুর জন্য আর একটি চ্যালেঞ্জ হলো শহর ও গ্রামের সমন¦য় সাধন। কৃষি নির্ভর ৬৩টি গ্রাম নিয়ে গড়ে ওঠা পৌরসভার সঙ্গে একত্রিত করে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনে মেয়র সাক্কু। শহর ও গ্রামাঞ্চলের ৯টি ওয়ার্ডের ৬৩টি গ্রামকে আধুনিকায়নে পরিণত করতে বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে সাক্কুকে। ক্ষমতাসীন সরকারে প্রতিনিধিত্বশীল এতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেয়েও এ নির্বাচনে জিততে পারেননি অপর হেভিওয়েট! প্রার্থী এডভোকেট অধ্যক্ষ আফজল খান। তিনি কি শুধুই পরাজিত হয়েছেন। ৫৬ শতাংশ ভোট বেশি পেয়ে সাবেক পৌর মেয়র মনিরুল হক সাক্কুর বিশাল বিজয়ে বিএনপিতে এখন চাঙ্গাভাব দেখা দিয়েছে। দলীয় কেন্দ্রীয় নেতা থেকে শুরু করে জেলার মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও এখন উজ্জীবিত। সাক্কুর বিজয়ের মধ্য দিয়ে জেলা বিএনপির মধ্যে বিরাজমান কোন্দলও শিগগির নিরসন করা হচ্ছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। কুমিল্লায় বিএনপির সাংগঠনিক তৎপরতায় চাঙ্গাভাব এলেও এখন অনেকটা নিরিবিলি হয়ে পড়েছে দলটির কার্যক্রম। তবে রোডমার্চকে ঘিরে দলের বিভক্তি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এতে কুমিল্লা নগরী ও জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বিএনপি’র এ বিভক্তির প্রভাব পড়েছে। দলের এ বিভক্তিতে নেতা কর্মীদের মাঝে হতাশা বিরাজ করেছে।

দলীয় সূত্রে জানা যায়,জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাজী আমিন উর রশিদ ইয়াছিনের নেতৃত্বে সাংগঠনিক কার্যক্রম থাকলেও কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের পর জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মনিরুল হক সাক্কু মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পরপরই মাথাচাড়া দিয়ে উঠে তার সমর্থিতরা। তারা এখন জেলা বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম তাদের নিয়ন্ত্রণে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এতে সরকার বিরোধী আন্দোলনের চেয়ে নিজেরা মাঠ দখলের রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। জেলা বিএনপির বিদ্রোহী সিটি মেয়র মনিরুল হক সাক্কুর মিডিয়া সমন¡য়কারী আসিফ আকবর বলেন, রোডমার্চের পথসভায় একটি গ্র“পের অতি বাড়াবাড়ির কারণেই এ ঘটনা ঘটেছে। কারণ রাজনীতি করতে হলে সকলের মাঝে সহ অবস্থান প্রয়োজন। কেউ যদি মনে করে তার বাইরে বিএনপি করা যাবে না তাহলে এ ধরনের ঘটনা ঘটাই স্বাভাবিক। কারণ বিএনপি নেতাকর্মীরা গণতন্ত্রে বিশ¡াস করে। তারা কারও কর্মচারী নয়। অপরদিকে বিএনপি’র প্রবীণ নেতারা বলেন,জেলা বিএনপিতে কোণঠাসা করে রাখা নেতা মনিরুল হক সাক্কু আবারও প্রমাণ করলো ত্যাগি ও তৃণমূলের নেতাকর্মী ছাড়া রাজনীতির সঠিক বিস্তৃতি হয় না। দল থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত এই নেতা নিজের অনুসারি ও সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ও ভালোবাসার ওপর আশ্বাস রেখে সদ্য সমাপ্ত কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিশাল ভোটের ব্যবধানে আওয়ামী লীগের বর্ষিয়ান প্রবীণ নেতা অধ্যক্ষ আফজল খানকে পরাজিত করেন। আফজল খানের পক্ষে জেলার শীর্ষ ও কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকেই কুমিল্লায় অবস্থান করে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়েছিলেন। আর সাক্কুর পক্ষে তার কিছু অনুসারী নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ ছাড়া কেহই ছিলেন না। জেলা বিএনপির অপর অংশের নেতা হাজী ইয়াছিনের বিন্দুমাত্র পরোক্ষ সহযোগিতাও ছিল না সাক্কুর জন্য। দলিয় কোন্দলের কারণে সাক্কু গ্র“পকে দলের কোণঠাসার পাশাপাশি পদ বঞ্চিত করেও রাখা হয়েছিলো। সেই সাক্কু গণমানুষের কাতারে নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে অর্জন করলেন ঐতিহাসিক বিজয়। ঐতিহাসিক এই বিজয়ের পথ ধরে সাক্কু গ্র“প’র আরও চাঙ্গা হয়েছে। সাক্কু বিজয়ী হওয়ার সুবাদে তার দল আরও সুসংগত হবে। আগামী সংসদ নির্বাচনেও সাক্কু’র সমর্থিত প্রার্থীকে প্রার্থিতা করার বিষয়ে আলোচনা ও সমালোচনার জড় সৃষ্টি হচ্ছে নগরী জুড়ে।

এদিকে অধ্যক্ষ আফজল খানকে বিজয়ী করতে দলের কুমিল্লা উত্তর, দক্ষিণ জেলার নেতৃবৃন্দ ছাড়াও দলের অনেক কেন্দ্রীয় নেতা মাঠে গণসংযোগ করেন। কিন্তু মহাজোটে মহাজট রেখে দলীয় শীর্ষ নেতৃবৃন্দ মাঠে নামমাত্র কাজ করে গেলেও কোন প্রভাব ফেলেনি। গত সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা সদর ও সদর দক্ষিণের একাংশ নিয়ে গঠিত সংসদীয় এলাকায় আ.লীগ দলীয় সংসদ সদস্যরা বিজয়ী হন। উপজেলা নির্বাচনেও তাই। নবগঠিত কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন এলাকার বিলুপ্ত কুমিল্লা পৌরসভার ১৮টি ওয়ার্ড রয়েছে কুমিল্লা-৬ সদর আসনের এমপি আকম বাহাউদ্দিনের নির্বাচনী এলাকায় এবং বিলুপ্ত সদর দক্ষিণ পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ড রয়েছে কুমিল্লা-৮ আসনের একই দলের নাছিমূল আলম চৌধুরী নজরুল এমপির নির্বাচনী এলাকায়। নগরীর ৬৫টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৪২টি রয়েছে এমপি আকম বাহাউদ্দিন বাহার ও অপর ২৩টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে এমপি নাছিমূল আলম চৌধুরী নজরুলের নির্বাচনী এলাকায়। দু’এমপি’র এলাকায় অধ্যক্ষ আফজল খান পাস করতে পারেনি। তোষামোদী কায়দায় দলের অনেক নেতাই আফজল খানকে শতভাগ পাশের নিশ্চয়তা দিয়ে মাঠ গরম রেখেছিলেন, তারা এখন চুপসে গেছেন।

অপরদিকে ঐতিহ্যবাহী কুমিল্লা পৌরসভা ও সদর দক্ষিণের কৃষি নির্ভর ৬৩টি গ্রাম নিয়ে গড়ে ওঠা পৌরসভার সঙ্গে একত্রিতত করে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনে উন্নীত করে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ নির্বাচনে বিশাল বিজয় নিয়ে মনিরুল হক সাক্কু মেয়র হিসেবে অধিষ্ঠিত হয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যে শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান শেষে কর্মস্থলে যোগ দিবেন। যোগদানের পর থেকে দু’দিকেই তার জন্য চ্যালেঞ্জ সমান-সমান। রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের পর কুমিল্লায় বেসরকারি আবাসন ব্যবসায়ীদের আগ্রাসন সবচেয়ে বেশি। আর এদের ৯৯ ভাগই সরকার অনুমোদিত। এরা এক সঙ্গে যেমন শহরের আড়াইশ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যগুলো ধ্বংস করে হাইরাইজ ভবন তৈরি করছে ঠিক তেমনি সদর দক্ষিণ পৌরসভার গ্রাম্য ফসলের ক্ষেত, মাছের খামার, বাশ বাগান, সব্জী ক্ষেত্র, পুকুর, নালা, খাল দখল করে হাউজিং ব্যবসার শেকড় গাড়ছে। এতে ধ্বংস হচ্ছে কুমিল্লার ঐতিহ্য ও ফসলের ক্ষেত। এসব ভূঁইফোড় কোম্পানি অনেক ক্ষেত্রেই জমির আইল ভাড়া নিয়ে সাইন বোর্ড টাঙ্গিয়ে ব্যবসা করছে। এদের ব্যবসার পুঁজিও সংগ্রহ হচ্ছে অদ্ভূত পদ্ধতিতে। অনেকটা হায়হায় কোম্পানির মতো এরা অধিক মুনাফার কথা বলে সামাজিক ব্যবসার আদলে আমানতকারীদের কাছ থেকে তহবিল সংগ্রহ করছে। ডেইলি সানের কুমিল্লা প্রতিনিধি মাসুদূর রহমান ও তার স্ত্রী এমন একটি হাউজিং কোম্পানিতে লগ্নি করেছেন ৬ লাখ টাকা। এ জামানত থেকে তিনি প্রতি মাসে মুনাফা পান লাখ প্রতি দুই হাজার টাকা। অনেক কোম্পানি আবার এর চেয়ে অনেক বেশিও মুনাফা দিয়ে থাকে। নগর পিতা হিসেবে মনিরুল হক সাক্কু কি এসব কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা বিনিয়োগকারীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বিষয়ে ভাববেন? না ভেবে তার উপায় নেই। কেনে না এসব কোম্পানি যেমন নতুন এ সিটি কর্পোরেশনের অবকাঠামো উন্নয়নে সহযোগিতা করছে তেমনি ধ্বংস করছে পরিবেশ, প্রতিবেশ ও ঐতিহ্য। হুমকির কিনারে নিয়ে যাচ্ছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদেরও। সাক্কুর জন্য আর একটি চ্যালেঞ্জ হলো শহর ও গ্রামের সমন¦য় সাধন। কুসিকের ১৮ থেকে ২৭ নম্বর ওয়ার্ড পর্যন্ত ৯টি ওয়ার্ডে মোট ৬৩টি গ্রাম নতুন এ সিটি কর্পোরেশনের অন্তর্ভুক্ত। এসব গ্রামের হাজার হাজার মানুষের ফসলি ক্ষেত, মাছের পুকুর, বাঁশ বাগান, ফলের বাগান, সব্জিক্ষেত খেলার মাঠ অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়েছে। ঠিক তেমনি বেড়ে যাবে অধিক কর ও জীবনযাত্রার খরচ। মেয়রকে তা শক্ত হাতেই সামলাতে হবে। নজর দিতে হবে কৃষক ভোটারের যেনো চোখের দু:স্বপ্নে বিলীন না হয়। কুমিল্লা শহরের মানুষের চোখে সবচেয়ে বড় সমস্যা মাদক, যানজট ও জলজট। শহরে সাড়ে তিনশ’ ইজি বাইকের চলাচলের বৈধ অনুমোদন আছে সাবেক পৌরসভার। কি’ু শহরে এখন চলছে সাড়ে সাত হাজার ইজি বাইক। তাই অনেকেই এ শহরকে বলে থাকেন ইজি বাইকে বিজি শহর। এ শহরে অবৈধ রিকশার সংখ্যাও বৈধের কমপক্ষে ৭ গুণ। তাই এ শহরে যে কেউ এলেই তার মনে হবে- তিনি বুঝি পুরোনো ঢাকার কোন সড়ক পার হচ্ছেন। সিটি মেয়র হিসেবে এই দুঃসহ যানজট দূর করা সাক্কুর জন্য আর একটি চ্যালেঞ্জ। কুমিল্লা শহরবাসী শহরের জলাবদ্ধতার জন্য সাবেক পৌর মেয়র ও নব নির্বাচিত সিটি মেয়র মনিরুল হক সাক্কুকেই দায়ী করেন। তাদের ধারণা, শহরের মূল ড্রেনগুলো সংকুচিত করে বাগান তৈরির জন্যই এখন সামান্য বৃষ্টিতে শহর হাঁটু পানিতে ডুবে থাকে। এ দুর্ভোগ লাঘবে তাই নগর পিতাকেই সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে। মনিরুল হক সাক্কু মেয়র বলেন, তিনি প্রতিশ্র“তি দিতে পছন্দ করেন না এবং তিনি দলমত নির্বিশেষে সবার পরামর্শে কাজ করবেন। এমন মন্তব্য অবশ্যই প্রশংসাযোগ্য। তবে তিনি কেবল বিএনপির ভোটে বিজয়ী মেয়র নন। তার ভোটারদের একটি বড় অংশই হলো মন্দের ভালোর সমর্থক। তাই সেসব ভোটারের চাহিদার দিকে নজর না দিলে জনগণও সময়মতো তার প্রতিফল দেবে। তবে এ নির্বাচনেরর মাধ্যমে যেমন কুমিল্লাবাসী শতভাগ প্রযুক্তির নির্বাচনে অংশ নিয়ে ইতিহাসের সাক্ষী হয়েছেন, তেমনি তারা তাদের ভোটে নির্বাচিত মেয়রকেও সব ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সব সময় বিজয়ী দেখতে চান। তাই ভোটারদের ভালোবাসার জবাব অবশ্যই আমি উন্নয়নের মাধ্যমে দিবো। এখন এসব কথা বলে কোন লাভ নেই। বাস্তবমুখী কর্মকাণ্ডে আমি বিশ্বাসী। আমি সকলের কাছে ঋণী হয়ে গেলাম।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply