নষ্ট মেয়ের কষ্ট

শামীমা সুলতানা :
‘অধরা’ তার ছদ্ম নাম। নামের সঙ্গে যর্থাথতা রেখেই যেন তার জীবন প্রবাহ। নদী যেমন খোঁজে সাগরের সান্নিধ্য তেমনি অধরাও খোঁজে একাধিক ‘আদিত্যে’র লোমশ বুক; সুঠাম দেহ; শক্ত বাহু; বলিষ্ঠ পুরুষত্ব। আর এ চাওয়ার পেছনে তার যুক্তি হলো পুরুষ যদি একাধিক বিবাহ করতে পারে; পারে অধিক নারীর সঙ্গে মেলামেশা করতে; তাহলে আমি কেনো পারব না।

তাছাড়া, তার স্বামী তাকে রেখে দু’টি বিয়ে করেছে। তার দু’টি সন্তানের বয়স পর্যায়ক্রমে ১২ বছর ও ৮ বছর। সন্তানদের খোঁজ-খবর সে নেয় না; পড়াশুনার, খাওয়া-দাওয়ার খবরাদির জন্য দশটি টাকাও দেয় না। তাদের বিয়ে হয়েছে প্রায় ১৪ বছর। যার সিংহভাগ সময় তার স্বামী কাটিয়েছে প্রবাসে। যৌবনের সুবর্ণ দিনগুলো হেলায় ফেলায়-অবহেলায় খুয়েছে বলেই অধরা মনে করে। তার স্বামী বহু নারীর সঙ্গে অবৈধ মেলামেশা করেছে এটা তার অভিযোগ। কিন্তু সে কখনও প্রতিবাদ করেনি। তার মনের বিরুদ্ধে করেনি কখনও কোনো কাজ। তারপরও স্বামী কেনো এক এক করে দু’টি বিয়ে করে আজ দূরে অনেক দূরে। এ প্রশ্ন সারাক্ষণ তার মাঝে তোলপাড় সৃষ্টি করে। এখন তার ধারনা ’ভাল মানুষের দাম নেই’। সুতরাং যত পারো নিজের মত করে স্বার্থ হাসিল করো। করো আনন্দ উল্লাস। বৈধ অবৈধের ধার ধারে না হয়ে চালিয়ে যাও জীবন যেখানে যেমন। আর এ চিন্তার মোহ ধরেই নামের ৩ বছরের সুদর্শন রমনীটি পা বাাড়ায় অন্ধকার জগতে। কি তার প্রেম কি তার ভালোবাসা, হ্যান্ডসাম যুবক ও বিত্ত বৈভবশালী পুরুষদের ভোলাতে সব রকমের কৌশলই অবলম্বন করে অধরা। তার মিষ্টি কথায় লম্বাটে গড়নের উজ্জ্বল শ্যামলা মায়াবী চেহারার ফাঁদে পড়ে যায় অনেকেই। প্রথম প্রথম নিজের দুঃখকে পুুঁজি করেই শুরু হয় তার কাছে টানার মন্ত্রগুলো। আস্তে আস্তে কাছে থেকে আরো কাছে টেনে নেয় আপন করার স্বপ্ন দেখিয়ে। ঘন্টার পর ঘন্টা ফোনে চলে প্রেমালাপ। রাত্র নিশিতে মোবাইল সেক্স-এ নিবারণ করে যৌন তাড়নাকে। এমনি কয়েকদিন যাওয়ার পর বরাবর তিনি অফার করেন, কোনো বিলাসবহুল আবাসিক হোটেলে রাত্রি যাপনের। আসা যাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো কোনো সময় কোথাও কোথাও ১০/২০ টাকা ভাংতির প্রয়োজন হলে ব্যানেটি ব্যাগ থেকে বের করে দেন। বোঝার কোনো সুযোগ থাকে না, এটি তার আন্তরিকতা নাকি কৃত্রিম। ভালবাসার ছলাকলায় ওই মানুষটিকে এমন মাতোয়ারা করে যে, সে তার সবকিছু ভুলে গিয়ে তাকে নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে ওই বহুপুরুষ লোভী নারীর চাহিদা আস্তে আস্তে কমে আসে, তার প্রতি সৃষ্টি হয় অনীহার। দেখা যায়, রাত্রিযাপনের বদলে দিনের বেলা মেলামেশার কথা বলা হয়। এভাবে কিছুদিন কাটে। তারপর প্রেম এক….দুই… ঘন্টা…. এক-দুইটা কিস। আর এ সময়ের মধ্যেই অধরা জুটিয়ে নেয় অন্য কোন পুরুষ। এমনও হয় একই সঙ্গে কয়েকজন পুরুষের সঙ্গে চলে তার মিছে মিছে প্রেম-ভালবাসা। এ সপ্তাহে একজনকে সময় দেওয়া এবং পরের সপ্তাহে অন্য জনকে। ২/৪ দিনের ব্যবধানেও চলে এসব বিকৃত যৌনকলা।

অধরা ইউরোপসহ অনেক দেশেই ভ্রমণ অতঃপর চাকুরী করেছেন। যে কারণে পাশ্চাত্য অপসংস্কৃতি তথা ওপেন সেক্স, বিকৃত ও কুরুচিপূর্ণ আচরণ করতে বেশি পছন্দ করে থাকেন। যে কারণে একবার একজন পুরুষ তার সান্নিধ্যে এলে তাকে ভূলতে পারে না। বিষয়টি এমন যে, ‘নিষিদ্ধ বস্তু ভোগে তৃপ্তি বেশি’। চুড়ান্ত নষ্ট কাজগুলো তার দ্বারা সম্পন্ন হয় অতি সহজেই। অধরা মিথ্যা বলায় বেশ পটু। এতো সুন্দর করে সাজিয়ে গুছিয়ে মিথ্যাটা তুলে ধরতে পারে যে, বোঝার কোন সাধ্য নেই; নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করাই কঠিন। অনেক সময় চোখে দেখা বিষয়টিকেও ঘোরপ্যাচ খাইয়ে অন্যদিকে ধাবিত করে বিষয়টিকে। চমৎকার অঙ্গ-ভঙ্গীমা প্রদর্শনে কঠিন বিষয়টিকেও সে সহজ করে নিজের স্বার্থকে করে চরিতার্থ।

তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে তার নীতি নৈতিকতা সবাইকে অবাক করিয়ে দেয়। যেমন কারো সংসার ভাঙ্গার পক্ষে নেই অধরা। সে মনে করে একটা সংসার যে কেউ ইচ্ছে করলে ভাঙ্গতে পারে। কিন্তু গড়তে পারে ক’জন। যে কারণে বিবাহীত অবিবাহীত যে কোন পুরুষই তার প্রতি দূর্বল থাকে। ওরা ভাবে আজকাল সব মেয়েরাই তো প্রেম ভালবাসার কিছু দিন অতিবাহিত হতে না হতেই বিয়ের জন্য পীড়াপীড়ি করে। কিন্তু অধরা’র মাঝে এর উল্টোটা থাকায় সবাই বিষ্মিত হয়। আরও কিছু ভাল দিক তার মাঝে বিদ্যমান। সে অপরের দেয়া কোন উপহার নেয়া পছন্দ করে না; বরং উপহার দিয়ে থাকে অনেককেই। যাদের সঙ্গে মেশে তাদের কথাগুলো সবসময় খুব মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করে। স্মৃতি শক্তি ও প্রখর তার।

অনেক আগের কথাও হুবহু বলতে পারে অনর্গল। ঘন্টার পর ঘন্টা বসে কথোপকোথনে বিন্দুমাত্র ধৈর্যচ্যুতি ঘটে না তার । মুখ মন্ডলে আলাদা রঙ মাখার অভ্যাস নেই অধরার। সাদামাঠা চলন বলনে যে কাউকে মুগ্ধ করা যেন তার নেশা ও পেশা। এমনি করে প্রতিশোধের নামে বিরামহীন চলছে অধিক পুরুষ ভোগের পালা। তবুও আদিত্য তাকে ভালবাসে। গভীরভাবে ভালবাসে। মনপ্রাণ উজাড় করে ভালবাসে। আদিত্য মনে করে, প্রকৃত ভালবাসায় একদিন ঠিকই অধরাকে সুপথে ফিরিয়ে আনতে পারবে। কিন্তু ভীষণ ভয় হয় আদিত্যের, যখন অধরা বজ্রকন্ঠে চিৎকার করে বলে আমি কি করেছি! আমি কখনও কোন অপরাধ করিনি। আমার জীবনে কোন ভূল নেই। অথচ সে একজন নষ্ট নারী। আদিত্য ভাবে যে মানুষ ভূলকে ভূল মনে করে না, কোন ক্ষেত্রেই তার কাছে ভুলের উদোয় হয় না, বিবেক সত্ত্বাকে যে বরাবরই পদাঘাত করে মাড়িয়ে বেড়ায়, তার মধ্যে কখন সৃষ্টি হবে সত্য-সুন্দরের; কবে জাগবে তার ঘুমন্ত বিবেক; তাকে তো সৃজনশীল কথাবার্তা শেখাতে চাইলে, আজকাল সে তা শুনতে চায় না। তার সঙ্গে রোমান্টিক আলাপ করলেই সে তা পছন্দ করে। তাহলে কি করে তাকে ফিরে আনবে সুপথে? সময় তো কম গেলো না; কিন্তু তার মাঝে কোন পরিবর্তন আনতে পারল না আদিত্য। এ বিষয়টিকে ঘিরে আদিত্য ভীষণ চিন্তায় সময় কাটায়। ইদানিং আদিত্য অধরাকে সুপথে আনতে মেডিটেশনের আশ্রয় নিয়েছে। একটানা চল্লিশ দিন চলবে তার এ মিশন। রাতের আঁধারে নির্জনে একাএকী আদিত্য সৃষ্টার কাছে প্রার্থনা করে। তার চোখ বেয়ে পড়ে তপ্ত অশ্র“বারি। আদিত্য কখনও নিজের স্বার্থের কথা ভাবেনি। অধরা সুখী হলেই সে সুখী। কিন্তু অধরাকে এসব বুঝানো যায় না। দিনে দিনে সে বেপরোয়া হয়ে উঠছে। তার নষ্টামীর সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। প্রতিশোধের ভূল সংজ্ঞা তাকে দাহিত করছে প্রতিক্ষণ। আর নষ্ট হযে কষ্টের মালা গলায় জড়াচ্ছে সে মনের অজান্তেই। কিন্তু এভাবে আর কত দিন চলবে জীবন? এ নষ্টামীতে কি তার কমবে কষ্ট? মরা নদীর বাঁকে দাঁড়িয়ে আদিত্য বার বার প্রশ্ন করে নিজেকে।

Check Also

দুখী বালকের স্বপ্ন ও অধ্যবসায়ের ফল

মোঃ আলাউদ্দিন:– জুঁই মামণি ভাত খেতে এসো। জুঁই’র মা বললেন। –    আসছি মা। জবাব দিল ...

Leave a Reply