মেয়র নির্বাচনে জয়ের পর সমর্থকদের উদ্দেশ্যে বিজয়ের প্রতীক ''ভী'' প্রদর্শন করছেন মনিরুল হক সাক্কু

সাক্কুর জয়ে উজ্জীবিত কুমিল্লা নগর বিএনপি : থমকে আছে আওমী রাজনীতি

মোঃ শরিফুল আলম চৌধুরী :

মেয়র নির্বাচনে জয়ের পর সমর্থকদের উদ্দেশ্যে বিজয়ের প্রতীক ''ভী'' প্রদর্শন করছেন মনিরুল হক সাক্কু
কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থী মনিরুল হক সাক্কুর বিপুল বিজয় দলের নেতা কর্মীদের উজ্জীবিত করেছে। রাজনীতিতে সাক্কুকে ঘিরে কুমিল্লা বিএনপির নতুন মাত্রা যোগ হবে। নির্বাচনের আগে দল থেকে অব্যাহতি নেওয়া বা দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সরাসরি সমর্থন কিংবা সহযোগিতা কিছু না পেলেও তার জয়কে ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন দলের স্থানীয় এবং কেন্দ্রীয় নেতারা। এই জয়ের কারনে দলের মধ্যে দীর্ঘ দিন যে অন্তকোন্দল ছিল, তার দ্রুত কেটে যাবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।

দলীয় সূত্র যানায়, বিএনপির কেন্দ্রিয় কমিটির সদস্য কন্ঠ শিল্পী আসিফ আকবর এবং কুমিল্লা দঃ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাজী আমিন উর রশীদ ইয়াছিনের মধ্যে বিরুধ দীর্ঘ দিনের। সাক্কুর নির্র্বাচনী প্রচারে এই দুইজন একসাথে কাজও করেছেন। এমনকি নির্বাচনের রাতে চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণার সময়ও হাজী ইয়াছিন নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণ কক্ষে এবং আসিফ প্রার্থীর নিয়ন্ত্রণ কক্ষে রাতভর কাজ করেছেন।

সাক্কুর নির্বাচনী প্রচারে ছিলেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য এম.কে আনোয়ার, বিএনপির চেয়ার পার্সনের উপদেষ্টা শওকত মাহমুদ, বরকতুল্লাহ বুলু, বিরোধী দলীয় চীফ হুইপ জয়নুল আবেদীন ফারুক ও নাজিমুদ্দিন আলমসহ একাধিক সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রিয় নেতা এবং কুমিল্লা ও চাঁদপুর অঞ্চলের বিএনপি জামায়েত জাপা এলডিপি খেলাফত মজলিশ ও কল্যাণ পার্টির নেতারা। একই মঞ্চে বসে তাঁরা বক্তব্যও দিয়েছেন। এভাবে কাজ করতে গিয়ে কুমিল্লা বহুধা-বিভক্ত বিএনপির নেতাদের দূরত্ব অনেক খানি কমে এসেছে বলে দলীয় নেতারা মনে করেছেন।

তবে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের বক্তব্য অন্যরকম। তাঁদের মতে, নগরের জলাবদ্ধতা, যানযট,পানি সংকট, ফুটপাত দখল ইত্যাদি সমস্যা দূর করাই এখন সাক্কুর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। একাজ বাদ দিয়ে দলীয় রাজনীতির আবর্তে ঘুরপাক খেলে তিনি ভুল করবেন। তাঁরা আরো মনে করেন চট্টগ্রাম, নারায়নগঞ্জ ও সর্বশেষ কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচন দলীয় সরকারের আওতায় ইভিএম পদ্ধতিতে নিরপেক্ষ্য ও সফল হয়েছে। একারণে বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচী বাস্তবায়নের সুযোগ খুবই কম পাবেন বলেও মনে করেন তাঁরা।

সাক্কু নিজেও মনে করেন, মেয়রের প্রধান কাজ সর্বোচ্চ নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, আমি সব কাজ পর্যায়ক্রমে করব। মেয়র কোন একক রাজনৈতিক দলের জন্য কাজ করতে পারে না নির্দলীয় বিবেচনা থেকে সব উন্নয়ন কাজ করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে হাজী আমিন উর রশীদ ইয়াছিন বলেন, মেয়রের পাশাপাশি অনেকগুলো দলীয় কাউন্সিলরের বিজয় মাঠপর্যায়ে দলের অবস্থানকে সুদৃঢ় করেছে। এই ফল নগর বিএনপির অগ্রযাত্রায় নতুন মাত্রায় যোগ করেছে।

হাজী আমিন উর রশীদ ইয়াছিন এর খুব ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত নগর বিএনপির সভাপতি রাবেয়া চৌধুরী বলেন, এই নির্বাচন দলীয় বিভেদ দূর করে সবপক্ষকে সুদৃঢ় ঐক্যের কাছাকাছি এনেছে।

বিএনপির কেন্দ্রিয় কমিটির সহসভাপতি এমকে আনোয়ার
বলেন। হাজী আমিন উর রশীদ ইয়াছিন এর খুব ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত নগর বিএনপির সভাপতি রাবেয়া চৌধুরী বলেন, এই নির্বাচন দলীয় বিভেদ দূর করে সবপক্ষকে সুদৃঢ় ঐক্যের কাছাকাছি এনেছে।

বিএনপির কেন্দ্রিয় কমিটির সহসভাপতি এমকে আনোয়ার বলেন, “রাজনৈতিক সমর্থনের প্রার্থী বিজয়ী হওয়ায় বিএনপি কুমিল্লায় একটি শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড়াতে পেরেছ। এই ভিত্তি দলকে আগের চেয়ে ভালো অবস্থানে নিয়ে গেছে। দলের মহানগর কমিটি অচিরেই ঘোষণা করা হবে।

অপর দিকে, কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর থেকে এই জেলার আওয়ামীলীগ রাজনীতি থমকে দাঁড়িয়েছে। দলের সিনিয়র নেতাদের আগের মতো রাজনৈতিক কর্মকান্ডে দেখা যাচ্ছেনা। দলের সিনিয়র নেতারা দলের মাঠ পর্যায়ের নেতা কর্মীদের সাথেও যোগাযোগ কমিয়ে দিয়েছেন বলে দলীয় সূত্র জানায়। জেলা কমিটি কবে গঠন করা হবে তাও এখন অনেকটা অনিশ্চিয়তার মধ্যে পরেছে। জল্পনা-কল্পনাও চলছে কে হবেন জেলা আওয়ামীলীগের আগামী দিনের কান্ডারী? তবে দলের মধ্যে এ অবস্থা চলতে থাকলে দলের সাংগঠনিক অবকাঠামো ভেঙ্গে পরবে। তার পাশাপাশি দলীয় কর্মকান্ড থেকে নেতা কর্মীরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে বলে দলের প্রবীণ নেতাদের আশঙ্কা। তারা মনে করছেন দলের ভেতরে যে সব নেতা রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে তাদের নিয়ে দ্রুত জেলা ও মহানগর কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। অন্যথায় আগামী দিনে জেলা আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে নেতৃত্বের সংকট দেখা দিবে। ফলে বিরোধী দলের অন্দলোনকে রাজনৈতিক ভাবে মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হবেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

সূত্র মতে, কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর দিন হতে ঝিমিয়ে পরেছে জেলা আওয়ামীলীগএর রাজনীতি। আগের মতো সিনিয়র নেতাদের প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছেনা। যোগাযোগও বন্ধ রয়েছে দলের নেতা কর্মীদের সাথে। শুধু আওয়ামীলীগ এর মূল দলের নেতাই নয় সহযোগী সংগঠনের নেতাদেরও আগের মতো প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছেনা। নির্বাচনের পর রাজনৈতিক তৎপরতাও বন্ধ রয়েছে। জেলা আওয়ামীলীগ এর যুগ্ম আহবায়ক অধক্ষ্য এডভোকেট আফজাল খান কুসিক নির্বাচনে পরাজিত হওয়ায় দলের নেতা কর্মীরা আগের মতো এখন আর চাঙ্গা নেই। আফজাল খানের নির্বাচনে পরাজয় নেতা কর্মীরা সহজে মেনে নিতে পারছে না। যে কারণে জেলা আওয়ামীলীগ এর রাজনীতিতে ভাটা পরেছে বলে মনে করছেন দলীয় নেতা কর্মীরা।

এদিকে সিটি নির্বাচন নিয়ে জেলা আওয়ামীলীগ এর নেতা কর্মীরা চার ভাগে বিভক্ত হয়ে একই দলের তিন প্রার্থীর পক্ষ্যে মাঠে নামেন, আরেক পক্ষ দলীয় প্রার্থীর বিপক্ষ্যে নিরব থাকেন। নির্বাচনের পর এসব কর্মী সমর্থকরাই পৃথক হয়ে কেউ জয়ের আনন্দে উল্লাসিত আবার কেউ বা পরাজয়ের গ্লানি মাথায় নিয়ে দল থেকে দূরে সরে আছেন। নেতা কর্মীদের সাথে আলাপ করে এমনটাই জানা গেছে। তবে নির্বাচনের আমেজকে ছাপিয়ে এখন দলকে নতুন করে চাঙ্গা করার প্রতি মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন দলের রাজনৈকিত বিশ্লেষকরা। দলকে নতুন করে চাঙ্গা করতে দলের প্রবীণ নেতা আফজাল খান ও ছাত্র নেতা নূরু উর রহমান মাহমুদ তামিম ও এডভোকেট আনিছুর রহমান মিঠুসহ সহযোগী সংগঠনের নেতা কর্মীদের সাথে নিয়ে বসে আলোচনার মাধ্যমে আগামী দিনের কর্মকান্ড বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন দলের মাঠ পর্যায়ের নেতা কর্মীরা। অপর দিকে জেলা আওয়ামীলীগের মধ্যে চলে আসা দীর্ঘ দিনের দ্বন্দ্বগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধাণ করে জেলা কমিটি গঠন করা না হলে এখানকার দলীয় কর্মকান্ড আগের মত চাঙ্গা হয়ে উঠবে না। দলকে পূর্বের ন্যায় চাঙ্গা করতে হলে জেলা কমিটি গঠনের কোন বিকল্প নেই। দলের মধ্যে শক্ত নেতৃত্বের অভাবে ধীরে ধীরে দলীয় কর্মকান্ডে ভাটা পরছে। এই কারণে নেতা কর্মীরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষক মহল। মাঠ পর্যায়ের নেতা কর্মীরা মনে করছেন বর্তমানে জেলা আওয়ামীলীগ এর ক্রান্তিকাল যাচ্ছে। দলের ভেতরে কোন চেইন অব কমান্ড না থাকায় দলের এমন কারুণ পরিনতি হয়েছে। দলের বর্তমান অবস্থা থেকে উত্তরনে দলের সিনিয়র নেতাদের এখনই উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন। তার পাশাপাশি দলের মধ্যে চলে আসা উত্তর-দক্ষিণ মেরুর রাজনীতি প্রত্যাখান করে দলের সকল নেতা কর্মীদের নিয়ে নতুন করে জেলা কমিটিকে ঢেলে সাজানোর পক্ষে দলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতা কর্মীরা । আর এভাবে দলকে সাজানো হলে বর্তমান অবস্থান থেকে বের হওয়াটা সময়ের ব্যাপার মাত্র এমনটাই মনে করছেন অভিজ্ঞ মহল। এ ব্যাপারে দলের সকল স্তরের নেতা কর্মীদের অন্তরিক হয়ে কাজ করা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে বৃহত্তর কুমিল্লার সকল সিনিয়র নেতাদের সহযোগীতা ও হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন নেতা কর্মীরা।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply