যৌতুক মহাব্যাধির ভয়াবহতায় নারীর জীবন বিপন্ন : তিতাসে এক গৃহবধূকে নির্মমভাবে হত্যা

মো. আলী আশরাফ খান :

এ হত্যাকান্ডের খবরটি শুনে মনে ভীষণ কষ্ট হলো। জাতীয় দৈনিকসহ বেশ ক’টি স্থানীয় দৈনিক ও সাপ্তাহিক প্রত্রিকার হেড লাইনে ছাপা হয় এ মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের সংবাদ। যা পড়ে মনে হলো, হায়রে দেশ! হায়রে সমাজ! হায়রে আমরা মানুষ! আমাদের পাশ্ববর্তী তিতাস উপজেলার দড়িকান্দি গ্রামের পাষন্ড আলমাছ মিয়া তার স্ত্রীকে যৌতুকের জন্য শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছে। উপজেলার শাহপুর গ্রামের লিলু ভূইয়ার সুন্দরী কন্যা ৩ মাসের অন্ত:স্বত্বা হালিমা আক্তার (২২)-এর সঙ্গে আলমাছ মিয়ার বিয়ে হয় চার বছর পূর্বে। বিয়ের পর হালিমার স্বামীকে ১ লক্ষ টাকা যৌতুক দেয়া হলেও পরে আবার পীড়াপীড়ির কারণে আরো ২৫ হাজার টাকা দিতে বাধ্য হয় হালিমার পরিবার। কিন্তু কিছু দিন অতিবিাহিত হওয়ার পরে আবারো হালিমার স্বামী আরো এক লক্ষ টাকা যৌতুক দাবি করে বসে। হালিমার অসহায় পরিবার টাকা দিতে না পারায়, ১ জানুয়ারি রোববার রাতে হালিমাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে আলমাছ। হত্যার পর হালিমার লাশটি সে দাউদকান্দির (গৌরীপুর) হাসপাতালের বারান্দায় রেখে পালিয়ে যায়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গৌরীপুর পুলিশ ফাঁড়িকে খবর দিলে পুলিশ লাশটি উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য কুমিলা মর্গে পাঠায়। এভাবেই একের পর এক যৌতুকের অভিশাপে আমাদের প্রিয় বোনেরা নির্মমভাবে কত্যাকাণ্ডের স্বীকার হচ্ছে। ভয়ানকভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে যৌতুক নামের মহাসর্বনাশা ব্যাধিটি। যৌতুকের কারণে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা দিনে দিনে বেড়েই চলছে। এ যৌতুক যেনো অপ্রতিরোধ্য হয়েগেছে আমাদের সমাজে। সামাজিক কোনো নীয়মনীতির তোয়াক্কা তো কেউ করছেই না, বরং দেশের সংবিধানকে বৃদ্ধাঙ্গুলী প্রদর্শন করছে যৌতুকলোভী পাপিষ্ঠরা।

দেশে ১৯৮০ সালের যৌতুক নিরোধ আইনে যৌতুক এ কু-প্রথাটি ব্যক্তি-পরিবার-সমাজ তথা রাষ্ট্রের জন্য বিরাট ধরনের এক অভিশাপ হিসেবে উলেখ করা হয়েছে। কিন্তু আমাদের এই ঘুনেধরা সমাজে দিনে দিনে এ কু-প্রথাটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে; সৃষ্টি করছে এক ভয়াবহ সামাজিক সমস্যার। যতই দিন যাচ্ছে ততই এ সমস্যাটি গলারকাটা হয়ে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করছে জাতীয়জীবনে। এককথায়,যৌতুক এখন রাষ্ট্রীয় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নারীর সম্মান, সামাজিক প্রতিষ্ঠা ও আত্মউন্নতি লাভে আমরা আইন করছি, দৌঁড়ঝাঁপ হচ্ছে নারীনীতি নিয়ে। অথচ, এসব গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা নিয়ে উলেখযোগ্য কোনো ভূমিকা আমাদের নেই। যা আসলেই আমাদের চরম লজ্জায় ফেলে দিচ্ছে। যেখানে আমরা একবিংশ শতাব্দিতে এসে নিজেদের অতিআধুনিক মনে করছি, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ব বলে রাকডাক করছি, বদলে যাওয়ার শোগান-মন্ত্রে হচ্ছি বিভোর। অথচ, সিংহভাহ ওইসব তথাকথিত লেবাসধারী শিক্ষিত-ভদ্রলোকদের দ্বারাই যৌতুক নামের নীলবিষে প্রতিনিয়ত আক্রান্ত হচ্ছে মায়ের জাত নারীরা। তাদের হিংস্রতায় ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছে স্বল্পবয়সী মেয়েদের থেকে শুরু করে ২-৩ সন্তানের জননীরাও। পশুর মতো বিবেকহীন পৈশাচিক নিকৃষ্ট কর্মকাণ্ডে কোমলমতি নারীজাতি আজ দিশেহারা হয়ে পড়েছে; তাদের সামগ্রীক জীবনে অশান্তি সৃষ্টি হচ্ছে।

আর এসব সামাজিক অবক্ষয় রোধকল্পে আমরা দীর্ঘ সময় ধরে নানা কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছি। এর মধ্যে যৌতুক মহাব্যাধিকে নিয়ে আমরা প্রায় ১২ বছর সভা-সেমিনার, র‌্যালি, লংমার্চ, লিফলেট-পোস্টারিংসহ জাতীয় দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকায় লেখালেখি করে আসছি। কিন্তু আশানুরূপ ফল আসেনি। দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পালা দিয়ে এ যৌতুক ব্যাধিটি ব্যাপকভাবে আক্্রান্ত করছে আমাদের। ‘যৌতুক’ মহা অভিশাপের ফলে সামাজে এমন এক সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে-যা বিষাক্ত ক্যান্সারের ন্যায় গোটাজাতিকে আকড়ে ধরেছে। দেশের নিন্মবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত তথা কোনো পরিবারই মুক্ত নয় এই যৌতুক প্রথার কু-প্রভাব থেকে। এই ভয়াবহ ‘যৌতুকঅভিশাপ’ এ পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে পড়েছে এখন সকলেই। আমাদের মতো দেশে অনেক সংগঠন আছে, যারা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, যৌতুক ব্যাধিটিকে সমাজ থেকে দূর করার জন্য। শুধু তাই নয়, আমরা মনে করি, এ ক্ষেত্রে সরকারেরও ইচ্ছার কমতি নেই। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন অর্থাৎ উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দদের যথাযথ উদ্যোগ ও আন্তরিকতার অভাবে এ মহাব্যাধিটিকে ঠেকানো যাচ্ছে না। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতার অভাবে বাংলাদেশের অসংখ্য নারী যৌতুক অভিশাপে প্রতিনিয়তই দগ্ধ হচ্ছে, পতিত হচ্ছে মৃত্যুমুখে; কেউ কেউ নিরুপায় হয়ে ঘর-সংসার ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। আবার কেউ কেউ স্বজনদের দুঃখের সাগরে ভাসিয়ে আত্মহত্যার মধ্যদিয়ে জাতির বিবেককে নাড়া দিয়ে যাচ্ছে।

এককথায়, অপ্রতিরোধ্য যেনো এ যৌতুক সমস্যাটি। কোনোভাবেই যেনো রোধ করা সম্ভব নয়-এই সামাজিক বিভীষিকাময় অবক্ষয়কে, এমন ভাবসাব এখন অনেকের। আসলেই কি তাই? না, তা মোটেই নয়, পাবলিক পরীক্ষায় নকলকে আমরা যদি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারি. তাহলে যৌতুককে কেনো পারবোনা। অবশ্যই সম্ভব। আমাদেরকে পারতেই হবে। আমাদেরকে হাল ছেড়ে দিলে চলবে না। আমাদের মা-বোনরদের এই নরকযন্ত্রণা থেকে মুক্ত করতে, সকলকে সচেতন হতে হবে; নিতে হবে যথাযথ ব্যবস্থা। সরকারের পাশাপশি প্রত্যেক ব্যক্তি-পরিবারকে যৌতুেকর কু-ফল সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে, নিরুৎসাহীত করতে হবে যৌতুক অভিশাপকে। ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করতে হবে সামগ্রীকভাবে যৌতুক প্রথাকে। উপঠোকন বলি আর উপহার বলি, এসব থেকে বিরত থাকতে হবে। প্রয়োজেনে সরকারকে এমন আইন করতে হবে, যে আইনে যৌতুক আদান ও প্রদানকারীকে অর্থদন্ড ও শ্রমদন্ড প্রদানের পাশাপশি মিডিয়াগুলোতে পুনঃপুনঃ প্রচারের ব্যবস্থা করে যৌতুক আদান ও প্রদানকারীদের লজ্জায় ফেলে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। আর এসব কাজ করতে হবে দায়িত্বশীলদের স্ব-স্ব উদ্যোগে।

পরিশেষে বলবো আমরা চাই না, আমাদের মা-বোনেরা-মেয়েরা আমাদের সামাজিক বিচারব্যবস্থা তথা সরকারের উদাসীনতার কারণে সামাজিক চরম অবক্ষয়ের শিকার হবে, হবে নিপীড়নের শিকার, বঞ্চিত-নির্যাতীত হয়ে জীবনকে আত্মহত্যার মতো জঘন্য কাজে ধাবিত করবে। দৈনিক প্রত্রিকা খুলে আমরা দেখতে চাই না, যৌতুকে জন্য হত্যা, আত্মহত্যা ও তিন মাস-নয় মাসের অন্তসত্ত্বা স্ত্রী খুন ইত্যাদি ইত্যাদি সংবাদ। আমরা চাই, সব অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক, অন্যরা শিক্ষা লাভ করুক এসব দৃষ্টান্ত থেকে। এই আমাদের দাবি, দেশনেত্রী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি। আমাদের বিশ্বাস, তিনি যৌতুক মহাব্যাধি রোধে অবশ্যই গুরুত্ব দেবেন। যেহেতু তিনিও একজন কন্যা, মা ও শ্বাশুড়ী সর্বোাপরী তিনি একজন নারী।

-লেখক:
কবি, কলামিস্ট, প্রবন্ধকার ও সংগঠক, গৌরীপুর, দাউদকান্দি, কুমিলা।

Check Also

তিতাসের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যানে মাতার জানাজায় শোকাহত মানুষের ঢল

নাজমুল করিম ফারুক :— বৃহত্তম দাউদকান্দির কৃতিসন্তান, বিশিষ্ট দানবীর, শিক্ষানুরাগী ও সমাজ সেবক বাতাকান্দি সরকার ...

Leave a Reply