মন্তব্য প্রতিবেদন : কুমিল্লা মহানগরীর নির্বাচনী হালচাল

দেলোয়ার জাহিদ :

দেলোয়ার জাহিদ
কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে প্রবাসে বাংলাদেশীদের মধ্যে যেন আগ্রহের কোন কমতি নেই, নারায়নগন্জের পর কিইবা ঘটতে যাচ্ছে কুমিল্লায়? কুশলাদি জানা শেষে একই প্রশ্ন আসে ঘুরে ফিরে, পরিচিত ও বোদ্ধামহলে। নানাহ নাটকীয়তায় এগুচ্ছে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের দিনক্ষণ। অরাজনৈতিক এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কুমিল্লায় ঘটে গেছে এক নীরব রাজনৈতিক মেরুকরণ। দলীয় মনোনয়নের কোন আনুষ্ঠানিকতা না থাকলেও অনানুষ্ঠানিকভাবে দলীয় সমর্থনের আদলে কাজ করছে সংষ্লিষ্ট দলের সকল নেতা, কর্মীগন।
প্রতীক বরাদ্ধের আনুষ্ঠানিকতা ও ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই ও প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর মেয়র পদে ৯ জন, সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর পদে ৬৯ জন ও সাধারণ কাউন্সিলর পদে ২১৭ জন বর্তমানে প্রতিদন্ধিতায় রয়েছেন। মেয়র পদে আওয়ামীলীগ সমর্থিত অধ্যক্ষ আফজল খান (আনারস), বিএনপি থেকে অব্যাহতি নেয়া প্রার্থী মনিরুল হক সাক্কু (হাঁস), জাপা’র কেন্দ্রীয় সহসভাপতি এয়ার আহমেদ সেলিম (টেলিভিশন), সাবেক ছাত্রলীগ নেতা নূর উর রহমান মাহমুদ তানিম (চশমা)ও আনিসুর রহমান মিঠু (জাহাজ),মেজর (অবঃ) মামুনুর রশিদ (কাপ-পিরিচ), চঞ্চল কুমার ঘোষ (ঘোড়া), সালমান সাঈদ (দোয়াত-কলম) এবং নারী মেয়র প্রার্থী জাসদ নেত্রী শিরিন আক্তার (তালা) প্রতীক বরাদ্ধ পেয়েছেন।প্রতীক বরাদ্ধের পরই পাল্টে গেছে নির্বাচনী দৃশ্যপট।

অধ্যক্ষ আফজল খান কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের ২১ ও ২২নং ওয়ার্ডে গণসংযোগ করার প্রাক্কালে মহানগরীর সকল জলাবদ্ধতা নিরসনের আশ্বাস দেন এবং নিজকে কুমিল্লার সন্তান ও আওয়ামীলীগের মেয়র প্রার্থী দাবি করে তিনি সকলের ভোট ও দোয়া চান।

মেয়র প্রার্থী মনিরুল হক সাক্কু সাধারণ মানুষের কল্যাণে কাজ করা জন্যে ভোট চান, তিনি কুমিল্লা পৌরসভার সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যান হিসাবে তাকে আরেকটিবার সুযোগ দেয়ার অনুরোধ জানান।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফর আহমেদ এয়ার আহমেদ সেলিমের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারনা ও গণসংযোগে অংশ নেন। জাতীয় পার্টি ক্ষমতায় থাকাকালীন ব্যাপক উন্নয়ন করেছে দাবী করে তিনি সেলিমের জন্যে ভোট চান।

অন্যদিকে আওয়ামীলীগ ঘরনার অপর দুই প্রার্থী কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের সাবেক ভিপি নুর-উর রহমুান মাহমুদ তানিম (চশমা) প্রতীক ও এডভোকেট আনিসুর রহমান মিঠু (জাহাজ) প্রতীক নিয়ে এখনো নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন। এরাও ছুটে বেড়াচ্ছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে, নগরীর এ প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে। প্রত্যাশা নতুনদের প্রতি ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষন। নগরীর প্রতিটি এলাকায় চলছে প্রার্থীদের ব্যাপক গণসংযোগ।

নির্বাচন আচরণবিধি লঙ্ঘন পর্যবেক্ষণে এখনো দৃশ্যতঃ কঠোর অবস্থানে আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ও রিটার্নিং অফিসার আবদুল বাতেন। তিনি গণমাধ্যমে এক সতর্কবার্তা ঘোষনা করেছেন যে কেউ আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে প্রার্থিতা বাতিল হবে। তারপরও লঙ্ঘনের এ সংস্কৃতি অব্যাহত রয়েছে। কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনী আচরণ বিধি প্রতিপালন পর্যবেক্ষণের জন্য জেলা প্রশাসনের আওতাধীন ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ধারাবাহিকভাবে গত ৩০ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া এ অভিযান চালিয়ে গত বুধবার পর্যন্ত মোবাইল কোর্ট পরিচালনার সংখ্যা ৭৫ ও রুজুকৃত মামলার সংখ্যা ২১। দন্ডিত ব্যক্তির সংখ্যা ২১। অর্থদন্ড তথা জরিমানার পরিমাণ আদায় ৮২ হাজার ৫শ টাকা। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট সাঈদ মাহবুব খান স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তি এসব তথ্য গণমাধ্যমকে জানানো হয়েছে। বিজ্ঞ নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেটগণ মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে মামলা রুজুসহ নানা অংকের জরিমানা আদায় করেছেন। সার্বিকভাবে নির্বাচনী এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলে প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।

৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য এ নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ১ লাখ ৬৯ হাজার ২৭৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৮৩ হাজার ১৯৯ জন এবং মহিলা ৮৬ হাজার ৭৪ জন। কুমিল্লায় সাধারণ ওয়ার্ড ২৭টি আর ৯ টি সংরক্ষিত ওয়ার্ড।মোট ভোটকেন্দ্র ৬৫টি এবং ভোটকক্ষ ৪২১টি। ঘোষনা মতে প্রতিটি কক্ষেই ইভিএম ব্যবহার করা হবে। প্রত্যেক ভোটকেন্দ্রে অতিরিক্ত একটি করে ইভিএম মজুদ থাকবে। এছাড়া ৯ জন সহকারী রিটার্নিং অফিসারের প্রত্যেকের কাছে অতিরিক্ত তিনটি করে ইভিএম থাকবে। সূত্রমতে, মোট ৫১৩টি ইভিএম কুমিল্লায় আসছে। ইভিএম এর সাহায্যে ভোট গ্রহন ও সেনাবাহিনী না দেয়ার প্রতিবাদে যদিও ভোট বর্জন করছে বিএনপি, জামাত ও কল্যান পার্টি কিন্তু ভেতরে ভেতরে নির্বাচনী মাঠ ছাড়েনি কেউ। পর্যবেক্ষকরা বিএনপি ও জামাত এর এ সিদ্ধান্তের গভীরতা নিয়ে এখনো সন্দিহান।

নানা গুজব, উৎকণ্ঠার মধ্যদিয়ে এগুচ্ছে সময়, সাম্প্রতিক একটি মামলা জটিলতায় কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে আবারো দেখা দিয়েছে কিছু অনিশ্চয়তা।ভোটার তালিকা সংশোধনের নিমিত্তে হাইকোর্টের একটি নির্দেশের কারনে এ শংকার সৃষ্টি হয়েছে। যদিও এ মূহুর্তে এর সবটাই এখনো অনুমান নির্ভর।

জনমনে আতংকের আরেকটি উল্লেখযোগ্য কারন হলো নির্বাচনী মাঠে চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের ব্যাপক আনাগোনা। খুন, দখল, সন্ত্রাস, চাদাবাজি ও অস্র আইনে মামলাভুক্ত আসামীরা এখনো ঘুরে বেড়াচ্ছে কিন্তু একটি সুত্রমতে পুলিশ প্রশাসন এখনো তাদের কৌশল নির্ধারনে ব্যস্ত তারা যথাসময়ে নারায়নগন্জের মতো একটি পরিবেশ গড়ে তুলতে সচেষ্ট হবে। তবে এর জন্য প্রয়োজন জনগনের সর্বাত্মক সহায়তা। সময়ের ঘড়ি এগিয়ে চলেছে ৫ ই জানুয়ারীর পথে।

লেখকঃ মুক্তিযোদ্ধা দেলোয়ার জাহিদ, নোটারী পাবলিক অব সাস্কাচুয়ান, হিউমান রাইটস এডভোকেট, একজন সাংবাদিক, জাতীয় সংবাদপত্রে নিয়মিত প্রবন্ধ, ফিচার ও স্তম্ভ লেখক। কুমিল্লা প্রেসক্লাব ও কুমিল্লা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি, বর্তমানে কানাডা’র লয়েড মিনিষ্টার সিটি নিবাসী।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply