দলীয়দের জেলা প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে সরকার গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেকটি ঢোকাল

মো. আলী আশরাফ খান :

আমি প্রথমে বুঝতে পারিনি, সরকার এ অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়-জনগণের অধিকারকে মাটিচাপা দিয়ে তাদের আয়েত্বে নেয়ার সব ব্যবস্থা করে ফেলেছে। আসলে আমার মাথায়-ই ধরেনি, সরকারের এমন হঠকারীতামূলক সিদ্ধান্তের ব্যাপারটি। যেখানে রাষ্ট্রের শাসনতন্ত্রের মূলভিত্তি জনগণের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করণে গণতন্ত্রের কোনো বিকল্প নেই, সেখানে সরকারের এমন আচরণ গণতন্ত্রকে গলাটিপে হত্যা করা নয় কি? সরকার তো বরাবরই সংবিধান লঙ্ঘন করে দেখিয়ে দিল, যে করে হোক তারাই আবার ক্ষমতায় আসছে। আগামী নির্বাচনে বিজয়কে নিশ্চিত করতেই হয়তো এখন থেকে তাদের নীলনকশা বাস্তবায়ন শুরু করেছে তারা। বলে রাখা ভাল, আমি কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নই। ভ্রান্তধারার রাজনীতিকে বরাবরই ঘৃণা করি এবং এর বিরুদ্ধে যতটা সম্ভব লেখালেখিও করে আসছি দীর্ঘদিন যাবৎ। কেউ যদি মনে করেন, কোনো দলপ্রীতির ঘোরে আমার এ লেখা, তাহলে চরম ভুল করবেন। বিষয়টি আমাকে বেশ ভাবিত করেছে বলেই দু’ চার লাইন লিখে মনের ভাবটা প্রকাশ করার অভিপ্রায় মাত্র।

স্থানীয় সরকার যে কতটা গুরুত্ব বহন করে একটি দেশ ও জাতির জন্য এবং ক্ষমতায় টিকে থাকা কিংবা ক্ষমতায় আসার জন্য, এটা বিগত অন্যান্য সরকারের চেয়ে বর্তমান সরকার যে বহুগুণে বেশি বোঝে এটাই প্রমাণ করলেন তারা। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে সিটি করপোরেশন পর্যন্ত স্থানীয় সরকারগুলোকে শক্তিশালী করার জন্য দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছে দেশের বিশিষ্ট বিশিষ্ট ব্যক্তি, সমাজ, প্রতিষ্ঠান ও কিছু কিছু রাজনৈতিক দলও। দেশের সার্বিক উন্নয়ন এবং সাংবিধানিক অবস্থার উন্নতিকল্পে উপজেলা পরিষদ কিংবা ইউনিয়ন পরিষদের মতো জেলা পরিষদেরও নির্বাচিত প্রতিনিধি থাকা বাঞ্জনীয়। আর এ ধারাবাহিকতাই তৈরি করে পরিপক্ক ও দক্ষ রাজনৈতিক। কিন্তু সরকার এ গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতাকে গলাটিপে হত্যা করে লাশের উপর দাঁড়িয়ে নৃত্য প্রদর্শন করে দেখিয়ে দিলেন যে, তারা এমন কোনো কাজ নেই যা করতে পারেন না।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সরকার দলীয় নেতাদের স্থানীয় ক্ষমতাকে অপব্যবহার করার মন্ত্রে দীক্ষা দিয়ে আবার ক্ষমতায় আসার অপকৌশল হিসেবেই নির্বাচনকে ব্যতিরেকে যে জেলা পরিষদ প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছেন, এটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। দিনের আলোর মতই এখন স্পষ্ট তাদের এ সংবিধান লঙ্ঘন করে দেশের তিন পার্বত্য জেলা ছাড়া ৬১ টি জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগের বিষয়টি। যদিও আমরা লক্ষ্য করছি, কোনো কোনো জেলায় স্বয়ং সরকারী দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে জেলা পরিষদের প্রশাসক নিয়োগ নিয়ে হট্টগোল শুরু হয়েছে। তারা হয়ত বোঝে ফেলেছে সরকারের এ দুর্ভিসন্ধিমূলক আচরণ জনগণের উপর খড়গ উঠবে এবং তা তাদের একটি অংশের উপরেও প্রভাব ফেলবে। অথচ সরকার বলছে, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার জন্যই নাকি তাদের প্রতিশ্র“ত এ নিয়োগের অংশ এটি! আমরা দেখেছি, বর্তমান মহাজোট সরকারের সময় ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, কয়েকটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সঙ্গে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে পারায় সরকার প্রশংসাও পেয়েছে বিভিন্ন মহল থেকে। কিন্তু উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের পর জেলা পরিষদকে কার্যকর ভূমিকায় নিয়ে আসতে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারেনি। এটা সরকারের ব্যর্থতাই প্রমাণ করে।

তাদের বোঝা উচিৎ ছিল, জেলা পরিষদের ইতিহাস দুইশ’ বছরের পুরনো। ১৯৮৮ সালে এরশাদ সরকারের আমলে জেলা পরিষদ আইন প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু বিগত ২২ বছরেও জেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা সম্ভব হয়ে উঠেনি। এমন অবস্থায় নির্বাচিত জেলা পরিষদ নিঃসন্দেহে বড়ধরনের ভূমিকা রাখতে সক্ষম হতো। নির্বাচিত ব্যক্তিরা জেলার উন্নয়ন কাজে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হয়ে নিজেদের প্রয়োজনীয় বিষয়াদি উপস্থাপন অতঃপর প্রয়োজন মেটাতে পারতো। এ ক্ষেত্রে জেলা পরিষদ একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান-এটা কি সরকার অস্বীকার করতে পারবে? একটি জেলার ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদ যদি নির্বাচিত প্রতিনিধি দ্বারা পরিচালিত হয়, আমলাতন্ত্র ও দলতন্ত্র থেকে যদি মুক্ত থাকতে পারে. তাহলে সেই জেলার উন্নয়নসহ প্রতিটি ক্ষেত্রের অগ্রগতি দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।

যদিও সরকারের পক্ষ থেকে এখন বলা হচ্ছে, যথাশিগগির জেলা পরিষদে নির্বাচনের উদ্যোগ নেয়া হবে। এ ক্ষেত্রে জেলা পরিষদে নির্বাচিত প্রতিনিধি দায়িত্ব নেয়ার আগ পর্যন্ত বর্তমান নিয়োগপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসকরাই দায়িত্ব পালন করবেন। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন, যেখানে সরকারই সংবিধান লঙ্গন করে এ অনৈতিক পহ্নায় তাদের নিয়োগ দিলেন, সেখানে এমন গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীনরা কি তাদের নিজেদের ও দলের জন্য অনৈতিকতার পথ পরিহার করতে পারবেন? আমরা তো মনে করি, সরকার এ ন্যক্কারজনক কর্মকাণ্ডের মধ্যদিয়ে গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেকটি ঢোকাল। পরিশেষে আমরা আশা করছি, গণতন্ত্রের সঠিক চর্চা বজায় রাখতে সরকার দ্রুত জেলা পরিষদের মত একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিষরদে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করবে। এবং সকল দল ও মতের প্রার্থীদের অংশগ্রহণের পথকে সুগম করতে সব রকমের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। আর তবেই বোঝা যাবে যে, সরকার জনগণের কতা কল্যাণ বয়ে আনতে কাজ করছে।

লেখকঃ কবি, কলামিস্ট ও সংগঠক, গৌরীপুর, দাউদকান্দি, কুমিলা।

Check Also

মিনি ওয়াক-ইন-সেন্টারের মাধ্যমে রবি’র গ্রাহক সেবা সম্প্রসারণ

ঢাকা :– গ্রাহক সেবাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে মোবাইলফোন অপারেটর রবি আজিয়াটা লিমিটেড সম্প্রতি মিনি ওয়াক ...

Leave a Reply