১০ দিনের ব্যধানে চৌদ্দগ্রামে আবারো চালককে জবাই করে হত্যা : আটক ৩

চৌদ্দগ্রাম (কুমিল্লা) প্রতিনিধি :

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের শুভপুর ইউনিয়নের হাজারীপাড়া গ্রামে এক সিএনজি চালককে জবাই করে তার লাশ পুকুরে লুকিয়ে রেখে সিএনজিটি ছিনতাইয়ের একদিন পর উদ্ধার করেছে পুলিশ। ঘটনার সাথে জড়িত ৩ ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদে তাদের স্বীকারোক্তিতে গত শনিবার রাত দশটায় পুলিশ ওই চালকের লাশ উদ্ধার করে। নিহত চালকের বাড়ি উপজেলার কনকাপৈত ইউনিয়নের কালকোট গ্রামে।

জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার সকালে কালকোট গ্রামের দিনমজুর আবদুল মতিনের ছেলে শাহিন (১৬) প্রতিদিনের মতো পাশ্ববর্তী বশকরা গ্রামের মীর হোসেনের মালিকানাধীন সিএনজি চালিত একটি অটোরিকশা ভাড়ায় চালানোর উদ্দেশ্যে বের হয়। ওইদিন সন্ধ্যায় চৌদ্দগ্রাম বাজার থেকে যাত্রীবেশি ৩ ছিনতাইকারী প্রথমে উপজেলার কনকাপৈত ইউনিয়নের চানখার দীঘির পাড় ও পরে সেখান থেকে শাহ ফখর উদ্দিন সড়ক যোগে মুন্সিরহাট বাজারে নিয়ে যায়। সন্ধ্যা থেকেই চালক শাহিনের মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় তার পরিবারের মাঝে উৎকণ্ঠা দেখা দেয়। এক পর্যায়ে অটোরিকশা মালিক রাতেই চৌদ্দগ্রাম থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেন। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে খবর পেয়ে চৌদ্দগ্রাম থানার সেকেন্ড অফিসার আবদুল্লাহ আল মাহফুজের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল পরদিন শুক্রবার সন্ধ্যায় পাশ্ববর্তী শুভপুর ইউনিয়নের হাজারীপাড়া গ্রামের একটি শালবাগান থেকে অটোরিকশাটি উদ্ধার ও আবুল বশর (২৫) নামের এক ছিনতাইকারীকে আটক করে। আটককৃত বশর উপজেলার বাতিসা ইউনিয়নের চাঁন্দকরা গ্রামের আবুল কাশেমের ছেলে। তার স্বীকারোক্তি মোতাবেক পুলিশ গত শনিবার দিনভর অভিযান চালিয়ে সন্ধ্যায় আরো ২ ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করে। ছিনতাইকারীরা হলো- মুন্সিরহাট ইউনিয়নের বারাইশ গ্রামের হানিফ সওদাগরের ছেলে এলাকার চিহ্নিত বখাটে সুমন (২৭) ও শুভপুর ইউনিয়নের কটপাড়া গ্রামের মোস্তফার ছেলে সোহেল (২৫)। পরে তাদের স্বীকারোক্তি মোতাবেক চৌদ্দগ্রাম থানার ওসি কামরুল হাসানের নেতৃত্বে বিপুল সংখ্যক পুলিশ হাজারীপাড়া গ্রামের একটি পুকুর থেকে জাল টেনে চালক শাহিনের লাশ গলা কাটা ও হাত-পা বাঁধা অবস্থায় উদ্ধার করে।

এঘটনায় সিএনজি অটোরিকশা মালিক মীর হোসেন বাদী হয়ে চালক শাহিনকে হত্যার সাথে জড়িত আটককৃত ৩ ছিনতাইকারীসহ ৫ জনের নাম উল্লেখ করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

এদিকে গতকাল রোববার সকালে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে বিকেলে পুলিশ শাহিনের লাশ পরিবারের নিকট হস্তান্তর করে। তার লাশ কালকোট গ্রামের বাড়িতে পৌছলে এসময় এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।

শাহিনের মা আবিয়া খাতুন, ফুফু আনোয়ারা বেগম, বোন তাছলিমা, তানজিনা ও রোকছানাসহ স্বজনদের আহাজারিতে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠে। বার বার মা আবিয়া খাতুন মুর্চা যাচ্ছেন। তিনি বিলাপ করে বলছেন, ‘আন্নেরা আঁর মনারে জিন্দা আনি দেন’।

চালক শাহিনের কালকোটের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে জানা গেছে, তার বাবা দিনমজুর আবদুল মতিন বর্তমানে অসুস্থ্য হয়ে ঘরে দিনাতিপাত করছেন। মা আবিয়া খাতুন মানুষের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করেন। ২ ভাই ও ৩ বোনের মধ্যে শাহিন তৃতীয়। বড় ভাই আলমগীর পাশ্ববর্তী একটি মসজিদের মোয়াজ্জিন হিসেবে কাজ করছে। শাহিনের উপার্জনের টাকা দিয়ে তাদের সংসার চলতো।

গতকাল রোববার বিকেলে নামাজে জানাযা শেষে গ্রাম্য কবরস্থানে শাহিনকে দাফন করা হয়। জানাযায় আশ-পাশের বিপুল সংখ্যক জনগণ অংশ নেন।

চৌদ্দগ্রাম থানার সেকেন্ড অফিসার আবদুল্লাহ আল মাহফুজ জানান, ঘটনার সাথে জড়িত তিনজনকে আটক করা হয়েছে। হাজারীপাড়া গ্রামের একটি পুকুর থেকে শাহিনের লাশ উদ্ধার করা হয়। অপর আসামীদের গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

প্রতিবাদে সিএনজি চলাচল বন্ধ ঃ
সিএনজি চালক শাহিনকে হত্যার প্রতিবাদে ১৮ ডিসেম্বর চৌদ্দগ্রাম বাজার থেকে বসকরা বাজার ও তারাশাইল সড়কে সিএনজি চলাচল বন্ধ রাখে সিএনজি চালক ও মালিকরা। এছাড়া ওইদিন দুপুর ১২টা থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কেও সিএনজি চলাচল বন্ধ রাখা হয়।

ঘাতক সোহেলের দম্ভোক্তি ঃ
সিএনজি অটোরিকশা ছিনতাইয়ের ঘটনার পর মালিক মীর হোসেনের অভিযোগ পেয়ে চৌদ্দগ্রাম থানার এএসআই ইকবাল হোসেন শুভপুর ইউনিয়নের হাজারীপাড়া গ্রামে গেলে সোহেল নিজের সম্পৃক্ততা ও অপরাধ গোপন করতে অতি উৎসাহী হয়ে পুলিশকে সিএনজি উদ্ধারে সহযোগিতা করে। এমনকি সে থানায় গিয়ে পুলিশের সাথে কথাও বলে। যাতে পুলিশ কিছুতেই বুঝতে না পারে যে, সে হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত। অথচ সোহেলের থাকার ঘরেই চালক শাহিনকে জবাই করে হত্যা করা হয় বলে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য বেরিয়ে আসে।

ঘাতক সুমনের এলাকায় স্বস্তি ঃ
বারাইশ গ্রামের হানিফ সওদাগরের বখাটে ছেলে মাদকসেবী সুমন এলাকার বিভিন্ন চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িত ছিল। সে বিভিন্ন সময় নিজেকে ছাত্রলীগ কর্মী ও সাংবাদিক হিসেবে ভূয়া পরিচয় দিয়ে এলাকায় অপকর্ম করে বেড়াত। তার বিরুদ্ধে চৌদ্দগ্রাম থানায় একাধিক মাদক ও চুরির মামলা রয়েছে। তার গ্রেফতারের খবর এলাকার সাধারণ মানুষের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে।

প্রসঙ্গত ; গত ৬ ডিসেম্বর মঙ্গলবার রাতে উপজেলার শ্রীপুর ইউনিয়নের ভাইজকরা গ্রামে যাত্রীবেশি ২ ছিনতাইকারী চালক জাকির হোসেনকে জবাই করে হত্যা শেষে সিএনজি চালিত অটোরিকশা ছিনতাইকালে গণধোলাইয়ে এক ছিনতাইকারীর মৃত্যু হয়। ১০ দিনের ব্যবধানে সিএনজি অটোরিকশা ছিনতাই ও আবারো চালককে হত্যার ঘটনায় জনমনে সিএনজি চালক, মালিক ও সাধারণ মানুষের চরম আতংক বিরাজ করছে। ভয় ও আতংকে অনেক চালক সিএনজি চালানো বন্ধ করে দিয়েছেন।

Check Also

চৌদ্দগ্রামে শেখ রাসেল জাতীয় শিশু কিশোর পরিষদের প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত

মোঃ বেলাল হোসাইন, চৌদ্দগ্রাম :– প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও মন্ত্রীপরিষদের প্রভাবশালী ব্যাক্তিবর্গকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ ছবি ...

Leave a Reply