আরজ আলী মাতুব্বরকে কি আমরা ভুলতে বসেছি ?

মো.আলী আশরাফ খান :

আরজ আলী মাতুব্বর
এই ধরাধামে স্রষ্টা এমন কিছু মানুষ প্রেরণ করেন, যাদের মধ্যে তিনি দান করেন ব্যতিক্রমী সৃজনীশক্তি। যে চিন্তা ও কর্মশক্তির মধ্যদিয়ে ওইসব মানুষ সমাজের অন্যসব মানুষের মাঝে জাগরণের প্রতীপ জ্বেলে আলো ছড়িয়ে দূর করেন অন্ধকার। এমনই একজন আরজ আলী নামের মানুষ বরিশালের অজপাড়াগা লামচরিতে জন্ম নিয়েছিলেন বাংলা ৩ পৌষ ১৩০৭, ১৭ ডিসেম্বর ১৯০০ সালে। যার পুরু নাম আরজ আলী মাতুব্বর। এই ক্ষণজন্মা মানুষটিকে নিয়ে কিছু লিখতে হলে, অবশ্যই তাঁর সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকা আবশ্যক। আমরা যখনই জ্ঞানচর্চা তথা দর্শনচর্চার প্রসঙ্গে কোনো কথা বলি, তখনই আমাদের সামনে ভেসে ওঠে মহান পাক রাব্বুল আলামিনের সৃষ্টির নান্দনিক সব সৃষ্টিসমূহ। আর এর মধ্যে সর্ব প্রথম যে বিষয়টি আমাদের ভাবায় তা হলো-আমরা যেখানে জন্ম লাভ করি, সেখানকার পরিবেশ-পরিস্থিতি। শুধু তাই নয়, এই পরিবেশই আমাদেরকে জ্ঞানচর্চার দ্বার উন্মোচন করে। এটি নিঃসন্দেহে বলা যায়। পৃথিবীতে জন্মলাভের পূর্বে প্রত্যেক মানুষই মায়ের গর্ভে এক ব্যতিক্রমধর্মী প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে আশ্চর্যরকম অভিজ্ঞতা সঞ্চার করে। এখানে আরও একটি বিষয় উল্লেখ করা দরকার, (প্রকৃতির নিয়মানুসারে যেসব মানুষ জন্মলাভ করে) প্রতিটি মানুষই এক কঠিন যুদ্ধের সমুক্ষিণ হয় পৃথিবীতে আগমনের প্রাক্কালে। যদিও এ যুদ্ধে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে আরো অনেকেই অংশ নেয় কিন্তু এখানে ওই শিশু ও তার মায়ের ভূমিকা পৃথিবীর যেকোনো যুদ্ধকে হারমানায়-যা অস্বীকার করার কথা নয় কারো।

তারপরেও কথা থাকে, ওইসব জটিল জটিল প্রক্রিয়াসমূহ থেকে সকল মানুষই যে উন্নত জ্ঞানচর্চা-দর্শনচর্চায় ব্রত হয়-হবে তা কিন্তু নয়। খুব কম সংখ্যক মানুষই স্রষ্টার সৃষ্টিকে নিয়ে ভাবে, সৃষ্টি করে আরো ভাবনার কিছু বিষয়, যা ব্যক্তি-সমাজ-দেশ-জাতি ও বিশ্বমানুষকে জ্ঞানচর্চা-দশর্নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের অনুশীলনে আগ্রহী করে তুলে। আমাদের সহজ-সরল বাঙ্গালি মায়ের এক গর্ব বরিশালের লামচরি গ্রামের আরজ আলী মাতুব্বরের কথা বোধ করি শিক্ষিত-সচেতনজনদের না জানার কথা নয়। এই মুক্তচিন্তার দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বর চার বছর বয়সে পিতাকে হারান। বাবার অভাব-অনটনে খাজনা না দিতে পারায় সম্বল পাচঁ বিঘা কৃষি জমি ও বসত বাড়ি দখল করে নিয়েছিল জমিদার নামের তৎসময়ের আমলারা। ক্ষুধা-দারিদ্রতা আর মাথা গোঁজার লড়াইয়ে এই দার্শনিকের মা হেরে যাননি। সাহস আর দৃঢ়প্রত্যয়ে কলাপাতার ছাউনিতে বুকে আগলে রেখেছিলেন মা জননী তার আদরের সন্তানকে। কখনও রোদ কখনও বৃষ্টি আবার কখনও ঝড়ো হাওয়ায় নির্ঘূম রাত পারেনি তাকে খানিকটা টলাতে। তিনি কঠোর সংগ্রামের মধ্যদিয়ে অকৃত্রিম মমতায় বড় করে তুলেন এই কিংবদন্তী দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বরকে।

এই ব্যতিক্রমী দার্শনিক আরজ আলী স্কুলে পাঠগ্রহণ করার সুযোগ বেশি দিন পাননি। পুঁথিগত বিদ্যা বলতে গ্রামের মক্তবে প্রায় এক বছর পড়ার সুযোগ হয়েছিল তাঁর। ১৯১৫ খ্রীস্টাব্দে ওই মক্তবটি অর্থাভাবে বন্ধ হয়ে গেলেও থেমে থাকেননি তিনি। বরিশালে পড়–য়া ছাত্রদের পুরনো বই সংগ্রহ করে তিনি পড়তে শুরু করেন। পাশাপশি তিনি তার কর্মজীবন শুরু করেন পৈত্রিক পেশা কৃষি কাজের মাধ্যমে। পরে অবশ্য কৃষি কাজের অবসরে আমিনি পেশায় সূক্ষ্ম গাণিতিক ও জ্যামিতিক নিয়ম সম্পর্কে এক বৈপ্লবিক অসাধারণ কৃতিত্ব অর্জন করেছিলেন এ বিরল প্রকৃতির মানুষ আরজ আলী।

তিনি তাঁর মাকে খুব বেশি ভালোবাসতেন। সেই মায়ের পরলোকগমনে আরজ আলী যারপরনাই মর্মাহত-ব্যথিত হলেন। মায়ের স্মৃতিকে বুকে ধরে রাখতে তিনি ১০/১২ কিলোমিটার পথ হেঁটে বরিশাল শহর থেকে একজন ফটোগ্রাফার নিয়েছিলে নিজ গ্রামে। ছবি তোলাকে অপরাধ মনে করে তৎকালীন ধর্মান্ধরা তাঁর মায়ের দাফন-কাফনে অংশ নেননি। (কথিত আছে তাঁর মায়ের কবর তিনি নিজেই দিয়েছিলেন।) শুধু তাই নয়, আরজ আলী মাতুব্বরকে নিয়েও এক বির্তকের জন্ম হয়েছিল তাঁর কর্মকাণ্ডকে ঘিরে। যা মনোজগতে প্রবলভাবে আঘাত হানে তার। তিনি মানব জীবনের বৈচিত্র, প্রকৃতি-পরিবেশ, জড়জগৎ, বিশ্ব সংসার তথা স্রষ্টার সৃষ্টি কারিশমাকে জানতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। প্রতিদিন দীর্ঘ ১০/১২ কিলোমিটার পথ হেঁটে বরিশাল শহরের লাইব্রেরীতে বই পড়তে যেতেন আরজ আলী। আর এরই নিদর্শণ ১৯৭৪ খ্রীস্টাব্দে তাঁর লেখা ‘সত্যের সন্ধানে’ এবং ১৯৭৮ সালে ‘জীবন জিজ্ঞাসা’ শীর্ষক বই দু’টো। এই বই দু’টি প্রকাশের পর দেশের বুদ্ধিজীবী মহলে এই দার্শনিককে নিয়ে ব্যাপক আলোচনার ঝড় ওঠে। অনেকে বিশ্বাসই করতে পারছিলন না বই দু’টি আরজ আলীর লেখা।

তিনি মানুষের চোখেআঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন, গ্রামের সহজ-সরল কৃষকরা গ্রামে অতি সাধারণভাবে জীবনযাপন করেও স্বশিক্ষায় ও বস্তুবাদী দর্শনে দুঢ়মনোবল ও বিশ্বাস নিয়ে সংগ্রাম করে সমাজের অন্ধতা, অজ্ঞনতা, কুসংস্কার ও ধর্মীয় গোঁড়ামীকে দু’পায়ে মাড়িয়ে সৃষ্টি করাতে পারে নতুন কিছুর। এছাড়াও তাঁর লেখা ‘সৃষ্টি রহস্য’(১৯৭৭), অনুমান (১৯৮৩), মুক্ত মন(১৯৮৮) এবং প্রকাশিত অপ্রকাশিত লেখা নিয়ে আরজ আলী মাতুব্বর রচনাবলী প্রকাশিত হয়েছে। এককথায় জীবনের দীর্ঘপথ চলায় তিনি বহু বিষয়ে পাণ্ডিত্য লাভ করেন।

তিনি মানবকল্যাণে ও বিশ্বধর্ম আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে দারিদ্র ও মেধাবী ছাত্রদের জন্য বৃত্তি প্রদান, পাঠাগার স্থাপন ও রচনা প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করেন। পাঠাগারটি ২৫ জানুয়ারি ১৯৮১ সালে নিজের জমি বিক্রির ৬০ হাজার টাকায় ‘আরজ মঞ্জিল পাবলিক লাইব্রেরী’ নামে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন। ওইসময় জেলা প্রশাসকের উপস্থিতিতে ৮০ বছর বয়সে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন,‘আজ হোক কাল হোক এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে। শুভবুদ্ধির উদয় হবে। আমার কাছে লাইব্রেরী হলো উপাসনালয়ের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। আর এ কথা চিন্তা করেই আমি লাইব্রেরী স্থাপন করেছি’। তিনি তাঁর সংগ্রহকৃত সংহস্রাধিক মূল্যবান বই, তাঁর হাতের লেখা ৪০ খানা দিনপঞ্জি, বই রাখার তাকিয়া, তার ব্যবহৃত পোশাকাদি রেখে যান এই লাইব্রেরীতেই। (যা উঁইপোকার কবলে পড়ে ধ্বংস হয়ে গেছে অনেক আগেই)। তিনি তার নিজ দেহ-চক্ষু মানবতার সেবায় উৎসর্গ করে যান। তিনি বাংলা একাডেমির আজীবন সদস্যপদ ও সংবর্ধনা (১৯৮৫), বাংলাদেশ লেখক শিবিরের হুমায়ুন কবির স্মৃতি পুরস্কার (১৯৭৮) ও বাংলাদেশ উদীচি শিল্পী গোষ্ঠী (বরিশাল শাখা) সম্মাননা (১৯৮২) লাভ করেন।

আমাদের গর্ব এই আরজ আলী মাতুব্বর অত্যন্ত বিনয়ী, মৃতব্যয়ী ও হিসেবী মানুষ ছিলেন। তিনি যেমন সময়ের মূল্যায়ণ করতেন, তেমনি সব সময় আয়-ব্যয়ের হিসেবও রাখতেন। তিনি দিনপঞ্জি লিখতেন। সেখানে গ্রামের অধিবাসীদের জন্ম-মৃতু থেকে সব কিছু লিপিবব্ধ করতেন তিনি। এই ব্যতিক্রমধর্মী চিন্তা থেকেই তিনি নিজের প্রতিষ্ঠিত লাইব্রেরী ভবন সম্মুখে কবর নির্মাণ করেছিলেন জীবদ্দশাতেই। এবং প্রথাবিরোধী হয়ে নিজের কবরের মেজে নিজেই পাকা করে রেখে যান। আমাদের এই স্মরণীয় ও বরণীয় দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বর ১ চৈত্র ১৩৯২ বাংলায় তিনি পরলোকগমন করেন।

আজ অপ্রিয় হলেও এই দার্শনিক আরজ আলীকে নিয়ে অতিপ্রয়োজনীয় কিছু কথা বলা দরকার। আমাদের সরকার ও দেশের বিভিন্ন সামাজিক সেবামূলক সংগঠন এমন সব দিন ও বিষয় উদ্যাপন করতে দেখা যায়, যেসব অনুষ্ঠানাদি অনেক সময় হাস্যকর ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। অথচ, আমাদের দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বরকে নিয়ে তেমন কোনো মাথা ব্যথা নেই কারো। আমরা যেন তাকে আজ ভুলতে বসেছি। আমরা ভুলে গেছি, দার্শনিকদের জীবনী ও কর্মকাণ্ড আমাদের তরুণ সমাজেকে বড়রকমের দিক-নির্দেশনা প্রদান করে, পরিশুদ্ধতার পথে এগিয়ে দেয়। উন্নত জীবন গঠনে সহযোগিতা করে। মানুষ হিসেবে বাঁচতে শেখায়। এখন সমাজ যে ভাবে দিনে দিনে অক্ষয়ের দিকে ধাবমান, এই সময়ে কি দার্শনিক, সমাজসংস্কারক ও উন্নত চিন্তার মানুষদের জীবনী নিয়ে চর্চার প্রয়োজন নয় কি? এ প্রশ্ন এখন দেশের বিবেকবান মানুষদের কাছে।

লেখক: কবি, কলামিস্ট, প্রবন্ধকার ও সংগঠক, গৌরীপুর,দাউদকান্দি,কুমিল্লা।

Check Also

মিনি ওয়াক-ইন-সেন্টারের মাধ্যমে রবি’র গ্রাহক সেবা সম্প্রসারণ

ঢাকা :– গ্রাহক সেবাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে মোবাইলফোন অপারেটর রবি আজিয়াটা লিমিটেড সম্প্রতি মিনি ওয়াক ...

Leave a Reply