বিজয়ের দিনে আমাদের অঙ্গিকার হোক পরিশুদ্ধতার

মো. আলী আশরাফ খান

বহু কষ্টার্জিত, ত্যাগ-তিতিক্ষা ও আত্মত্যাগ সর্বোপরি বিশ্ব ইতিহাসের হৃদয়বিদারক, নৃশংস হত্যাকাণ্ড তথা বীভৎসতার জলজ্যান্ত সাক্ষী পাকিস্থানী হানাদারের অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক বিজয় ১৬ ডিসেম্বর। আজ ৪০তম এ মহান জাতীয় বিজয় দিবসে কার না হৃদয়ে আনন্দবন্যা বহে, কে সেই মানব-স্বর্গীয় আলোকদ্যুতি বিচ্ছুরিত হবে না মনোকুটিরে, স্নাত-সিক্ত কার না হবে খরা-পীড়িত উর্বর বুকমৃত্তিকায়? এই বিরল মহান বিজয় আমাদের বাঙালি জাতির গৌরব, দেশপ্রেমিকের গর্ব, সমগ্র জাতির এক বিরাট অর্জন তথা বিশ্বমাঝে পরিচিতি লাভের এক অন্যতম সোপান।

’৭১-এ দীর্ঘ নয় মাস অনভিপ্রেত অবৈধ চাপিয়ে দেয়া এ যুদ্ধে একসময় পাকিস্থান পরাজয়ের কালিমা লেপন করে ঠিকই কিন্তু ইতিমধ্যে নিরপরাধ ত্রিশ লক্ষ তাজা প্রাণ, অগনিত দামালের পবিত্ররক্ত ও সুকোমল মায়ের জাত নারীর আবরুকে খুইয়ে বাঙালি আরো সাহসী আরো উজ্জীবিত হয়ে বিশ্বকে জানান দেয়-সারি সারি স্বজনের লাশের ওপর দাঁড়িয়েও সত্যের পতাকা ওড়াতে জানে এ বীরের জাতি-বাঙালি জাতি; মা-মাটির দরদে কেঁদে ওঠে বাঙলার প্রতিটি প্রাণ; বুকে ধারণ করতে জানে সুখে-দুঃখে সব গ্লানীকে দু’পায়ে মাড়িয়ে আনন্দকে; কাঁধে কাঁধ রেখে সবকিছু ভাগাভাগি করে একই ছাতার নিচ থেকে গায় বিজয় সুখের উল্লাসে-‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’…..

আজ বিশ্ববাসী জানে, বাঙালি জাতি বরাবরই স্বাধীনপ্রিয়। বাঙালিরা পরাধীনতার জিঞ্জির ভেঙ্গে খান খান করে দিতে পারে নিমিষে। বহিরাগত অপশক্তি যতো শক্তিশালী-ই হোক না কেনো, তা তুচ্ছ ও নগন্য সর্বঐক্যের কাছে, এর প্রমাণ যুগে যুগে প্রমাণিত হয়েছে এ জাতির কাজে কাজে। আর এমনটির মূলে অন্তর্নিহিত বাঙালির খাঁটি দেশপ্রেম, নিজ মাটির প্রতি গভীর ভালোবাসা ও সঠিক নেতৃত্বের প্রতি অকুন্ঠ শ্রদ্ধার এক সময়কার দৃষ্টান্ত। আমাদের এসব বৈশিষ্ট্য আজন্ম, সতত, সঞ্জীবিত ও স্বভাবসিদ্ধ। যদিও কখনও কখনও তা মনে হয় ধূসর-মীরচিকায় ঢাকা, আসলে এসব সময়ের প্রয়োজনে পথ চলার বাঁকে বাঁকে কিছু ব্যক্তি-গোষ্ঠীকে সর্তক তথা শিক্ষা গ্রহণ করার জন্যই হয়তো বা সংঘটিত হয়ে থাকে। যাকিনা আবার পরক্ষণেই সব আঁধারকে দূর করে এক আলোকছটায়।

সময়ের প্রয়োজনে এ বাঙালি জাতি জ্বলে ওঠে এতটাই তেজদীপ্ততায় যে, পৃথিবীর অন্যসব জাতির ইতিহাসকে হারমানিয়ে এক ব্যতিক্রমধর্মী দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। দৃষ্টি কাড়ে সকলের-বিরল ইতিহাস সৃষ্টি করে স্বগৌরবে। বিশ্বকে জানিয়ে দেয়-বাঙালি জাতি ধৈর্য ধরতে জানে ঠিকই। আবার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেলে হার না মানা প্রত্যয়ে সত্যের কেতন উড়ায়ে জয় করে নেয় অসম্ভবকেও। কুচক্রি-বিশ্বাসঘাতক-দুষ্টরা যখনি যেখানে এ জাতিকে কল্ককিত করতে চায়, ভাইয়ে ভাইয়ে দ্বন্দ্ব-সংঘাত লাগিয়ে জ্বালাতে চায় তাদের প্রতিহিংসার আগুন আর তখনি এর দাঁতভাঙ্গা জবাব দিয়ে বুঝিয়ে দেয় বাঙালি-আমরা একই মায়ের সন্তান, আমাদের মধ্যে নেই কোনো বিভক্তি ও প্রভেদ। যদিও কখনও কখনও আমাদের নিজেদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়, হতে পারে তাই বলে তোমরা পারো না এই বাঙালি জাতির অস্তিত্ব নিয়ে নির্মম পৈশাচিক খেলায় মেতে ওঠতে। যার প্রমাণ দেশশত্র“রা পেয়েছে যুগে যুগে-কালে কালে। ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিয়েছে বাঙালির বীরত্ব সু-উজ্জ্বলতর হয়ে।

কালের সাক্ষী, সেই প্রাচীন আমল থেকে শুরু করে প্রায়সব আমলেই বাঙলাকে স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল রাখার অভিপ্রায়ে বাঙালির ছিলো বিরামহীন প্রয়াস। ব্রিটিশ শাসনামলে বাঙালির বীরত্বপূর্ণ সুদীর্ঘ সংগ্রাম এই উপমহাদেশে ব্রিটিশ আধিপত্যেকে প্রোথিত করতে যে বিরাট ভূমিকা রাখে তা এক অনুপম দৃষ্টান্ত। যার ধারবাহিকতার ফসল পাকিস্থান ও ভারত পৃথক রাষ্ট্র দু’টির। পরে পরিচিতি লাভ করে ‘পূর্বপাকিস্তান’ নামে আজকের বাংলাদেশ। একসময় জ্ঞানহীন স্বল্পসংখ্যক বাঙালি ‘দ্বি-জাতিতত্ত্ব’ অবৈজ্ঞানিক ধারায় প্রলুব্ধ হয়ে পুরো জাতিকে ঠেলে দেয় এক বিভীষিকাময় অন্ধকারে। সময়ের ব্যবধানে যা মস্তবড় ভুলে পর্ববসিত করে বাঙালিকে। অবশ্য পরক্ষণেই ঐতিহ্যপুষ্ট বাঙালি সাহসিকতায় পর্দাপণ করে অরুণ আলোকের এক ব্যতিক্রমী অধ্যায়ে। তারপর সময় চলে সময়ের গতিতে-পেরিয়ে যায় মাস-বছর-যুগ। ছলচাতুরি আর গোঁজামিলের অপসংস্কৃতির চর্চার ফলে অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায় আরেক সংগ্রামের।

পর্যায়ক্রমে বাঙালির সনদ ছয় দফা ঘোষণা, পূর্ব পাকিস্তানে সর্বাত্মক হরতাল, পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর চরম বৈরীতা-হীনতা, গণ-অভ্যুত্থান, বাঙালিদের ওপর শাসক-বাহিনীর পৈশাচিক আক্রমন ইত্যাদি ইত্যাদি এসব কিছু মিলিয়েই বিরাট এক ক্ষোভের দানাবাধে মুক্তিকামী বাঙালির মাঝে। অবস্মরণীয় ’৭১-এর ২৩ মার্চ প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়, পাক হানাদারের বিরুদ্ধে ঘোষণা করা হয় সর্বাত্মক প্রতিরোধের। আর এভাবে এভাবেই সংগ্রাম আর জয়ের আনন্দে সৃষ্টি হয় আরেক নতুন ইতিহাসের। বাঙালিরা এসব ভয়াবহ-নৃশংসতা ও অমানবিক কর্মকাণ্ডের শিকার হয়ে জয়ের সুর্যকে আলিঙ্গন করে। আজ আমরা বাঙালিরা সুখে-দুঃখে পেছনে ফেলে এসেছি চার দশক। আজ আমরা কৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ করি জাতীয় সকল মহান নেতাদের। আমরা চির ঋণী তাদের কাছে-যেসব মহান নেতাদের জন্ম না হলে হয়তো আমরা পেতাম না এই বাংলাদেশ নামের বদ্বীপটি। আমরা তাদের আত্মত্যাগকে সম্মান জানাই, শ্রদ্ধা জানাই এই স্বাধীনতা ও বিজয়ের মালা যারা পরিয়ে গেছে সবুজ বাংলার মায়ের গলায়।

পরিশেষে বলবো বিজয়ের দিনে আমাদের অঙ্গিকার হোক পরিশুদ্ধতার। বলবো, এসো বন্ধু এসো ভাই, আজ এই শুভ দিন-বিজয়ের দিনে সকলে হাতে হাত মিলাই। সকলে কাঁধে তাঁধ মিলিয়ে করি অঙ্গিকার, রাখবো অটুট-মর্যাদা অক্ষুণœ প্রাপ্ত এ দান-বাংলাদেশ নামের এই সবুজ-সোনালী দেশের; আর নয় হানাহানি, রাহাজানি, নয় কোনো বিভেদ। এখনও সময় আছে সকল রাজনৈতিক ব্যক্তি-গোষ্ঠী’র দেশের বিশৃঙ্খলা রোধে ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার। আমরা বিশেষভাবে সরকার ও বিরোধীদলসহ সকল রাজনৈতিক দলকে অনুরোধ করছি, সব বিভেদ ভুলে একই পতাকা তলে সমবেত হয়ে সময়কে অপচয় না করে দেশ উন্নয়নের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য। নচেৎ অপূরণীয় ক্ষতি অপেক্ষা করছে আমাদের বাঙালি জাাতর সামনে। যা পরে কোনোভাবেই পোষানো সম্ভব হবে না। বরং তা আগামী প্রজন্মের জন্য রূপান্তরিত হবে এক ভয়াল জঞ্জালের দেশ হিসাবে; বিশ্ব দরবারে লজ্জার চিহ্ন হিসাবে স্থান পাবে আমাদের এই প্রিয় বাংলাদেশ।

লেখক: কবি, কলামিস্ট ও সংগঠক

Check Also

মিনি ওয়াক-ইন-সেন্টারের মাধ্যমে রবি’র গ্রাহক সেবা সম্প্রসারণ

ঢাকা :– গ্রাহক সেবাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে মোবাইলফোন অপারেটর রবি আজিয়াটা লিমিটেড সম্প্রতি মিনি ওয়াক ...

Leave a Reply