ওসি’র কান্ত ! বাদী-সাক্ষীর অস্তিত্ব নেই : নারী নির্যাতন মামলা রেকর্ড

আরিফুল ইসলাম সুমন ॥

‘কাজীর গরু কিতাবে আছে, গোয়ালে নেই।’ এই কথাটির বাস্তব প্রমান দিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর থানার ওসি মিজানুর রহমান। তিনি গত ৩ ডিসেম্বর বাদী, সাক্ষী ও ঘটনার অস্তিত্ব না খোঁজেই একটি নারী নির্যাতন মামলা রেকর্ড করে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি করেছেন। এদিকে ভূয়া মামলায় আসামি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন সরাইলের বিশ্বরোড সংলগ্ন সদর উপজেলার বেতবাড়িয়া গ্রামের মৃত ইমাম উদ্দিন সরকারের ছেলে কৃষক ইউনুছ মিয়া সরকার। এ সুযোগে পুলিশ কামিয়ে নিয়েছে মোটা অঙ্কের টাকা। আলোচিত ওই মামলার বাদী ও সাক্ষীর অস্তিত্ব খুঁজে না পেয়ে স্বয়ং পুলিশই এখন দিশেহারা।

গতকাল বুধবার সরাইল প্রেসক্লাবে এসে কৃষক ইউনুছ সরকার (৪৯) সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করে বলেন, জীবনে কখনো দেখিনি, চিনিও না। এমন এক মহিলাকে স্ত্রী সাজিয়ে আমার বিরুদ্ধে নবীনগর থানায় নারী নির্যাতন মামলা দায়ের হয়েছে। আমি বিয়ে করেছি ১৯৯০ সালে নাসিরনগর উপজেলার কুন্ডা গ্রামের আবদুল হাই মাস্টারের মেয়ে মাহমুদাকে। আমি সাত সন্তানের জনক। স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে ও নাতি-নাতকার নিয়ে খুব সুখেই দিন কাটছিল।

গত ৬ ডিসেম্বর বিকেলে সদর থানার এ এস আই মনির হোসেন বাড়িতে এসে জানান, আমার বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন মামলা। বাদী নবীনগর উপজেলার বড়াইল ইউনিয়নের জালশুকা গ্রামের মৃত রফিকুল ইসলামের ছেলে মো. ছিদ্দিকুর রহমান। মামলা দিয়েছে এই বলে, বাদীর কন্যা সাফিয়া আক্তারকে তিন বছর আগে দুই লাখ টাকা মোহরানায় আমি নাকি বিয়ে করেছি। আবার চলতি বছরের ২৯ নভেম্বর তাকে যৌতুকের জন্য মারধর করে তাড়িয়ে দিয়েছি। পুলিশের মুখে এসব কথা শুনে আমি সহ পরিবারের সকলেই হতবাক হয়ে যায়। এসময় পুলিশ আমাকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে যেতে চায়। নিজেকে নিরপরাধ জেনেও সম্মানের ভয়ে পুলিশের চাহিদা ছিল ২০ হাজার টাকা, পরে ১০ হাজার টাকা দিয়ে ছাড়া পায়। পুরো বিষয়টি আমার কাছে এখন স্বপ্ন মনে হচ্ছে। আমি এ মিথ্যা-বানোয়াট মামলা থেকে রক্ষা পেতে চায়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, নবীনগর থানার মামলা নং-০২, তাং-০৩/১২/২০১১ইং। ধারা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০(সংশোধনী/০৩) এর ১১(গ)। মামলায় একমাত্র আসামি ইউনুছ সরকার। এজাহারে তার বয়স দেখানো হয়েছে ৩০ বছর। কিন্তু বাদী ও সাক্ষীদের বয়স উল্লেখ নেই। মারধোরের ঘটনা ২৯ নভেম্বর। কিন্তু সাফিয়া আক্তার(জখমী) ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে (স্লিপ নং-৪৮৩০৩) চিকিৎসা নিয়েছেন ২ ডিসেম্বর। বাদী ৩ ডিসেম্বর দুপুরে নবীনগর থানায় এজাহার দায়ের করেন। ওইদিনই নথিভূক্ত হয়ে যায় মামলাটি। উপজেলার ১নং বড়াইল ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুল খালেক বাবুল এক প্রত্যয়নপত্রে জানান, ওই মামলার বাদী ও সকল সাক্ষী নামীয় কোন ব্যক্তি তার ইউনিয়নে নেই। জালশুকা গ্রামের ইউপি সদস্য এনায়েত মোল্লা, চৌকিদার(গ্রামপুলিশ) ও একাধিক ব্যক্তি জানান, প্রকৃত পক্ষে এ গ্রামে এই নামে ও ঠিকানায় কোন লোকই নেই। এদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া মডেল থানার এ এস আই মনির হোসেন ইউনুছ সরকারের বাড়িতে দৌড়ঝাপ করছেন নিয়মিত।

এ প্রসঙ্গে সদর থানার এ এস আই মনির হোসেন বলেন, নবীনগর থানা থেকে প্রেরিত কাগজপত্রের ভিত্তিতে আমি ইউনুছ সরকারের বাড়িতে গিয়েছিলাম। তিনি ভাল মানুষ। তার নামে থানায় অতীতে কোন মামলা বা জিডি নেই। আমি কোন টাকা নেয়নি। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নবীনগর থানার উপ-পরিদর্শক সাইফুল ইসলাম বলেন, বাদীর কোন অস্তিত্ব পাওয়া যাচ্ছে না। আমি বিষয়টি তদন্ত করছি। নিয়ম মাফিক আইনানুগ ব্যবস্থা নিব। বাদী বিহীন মামলার নথিভূক্তির বিষয়টি ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ভাল জানেন।

এ মামলার বাদী ও সাক্ষীর অস্তিত্ব না পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে নবীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান বলেন, প্রথমদিকে এজাহারটি এস আই সাইফুলকে তদন্ত করার জন্য বলা হয়। অ্যাডভোকেট কুদ্দুছের সম্মান রক্ষার্থে মামলাটি নথিভূক্ত করেছি। টাকা লেনদেনের বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন।

Check Also

আশুগঞ্জে সাজাপ্রাপ্ত আসামির মরদেহ উদ্ধার

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি :– ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে মো. হারুন মিয়া (৪৫) নামে দুই বছরের সাজাপ্রাপ্ত এক আসামির ...

Leave a Reply