নতুন করে বিয়ে হবে আবার তালাক হবে : সালিশের রায়

আরিফুল ইসলাম সুমন, সরাইল :
বিচারক উপজেলার শীর্ষ জনপ্রতিনিধি ও আ’লীগ নেতারা

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে গত সোমবারের এক সালিশ নিয়ে এলাকায় মুখলোচক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। আলোচিত ওই সালিশের রায় সরাইলের বিবেকবান অনেক মানুষকে ভাবনায় ফেলে দিয়েছে। উপজেলার শীর্ষ ব্যক্তিদের সালিশেও কলেজ ছাত্রী তানিয়া স্ত্রীর স্বীকৃতি না পেয়ে, ন্যায় বিচারের আশায় এখন দ্বারস্থ হচ্ছে আদালতে। কিন্তু সেখানেও অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতার কারণে দরিদ্র পরিবারের ওই মেয়েটি পড়েছে বেকায়দায়। বেশক’দিন নানা নাটকীয়তার পর সালিশ হলেও বিচারকদের রায়ে তানিয়ার সব স্বপ্ন ভেঙ্গে গেল। উপজেলা মিলনায়তনে সালিশ সভায় বিচারক ছিলেন সরাইল আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান হাজী রফিক উদ্দিন ঠাকুর, আ’লীগ নেতা ও উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান শাহজাহান মিয়া, যুবলীগ নেতা মনির হোসেন, হাজী আব্দুন নূর বাবু ও আব্দুল লতিফ। সালিশকে ঘিরে ছিল উৎসুক জনতার কৌতুহল। কি রায় আসবে। অভিযুক্ত নজরুল ও নির্যাতিতা কলেজ ছাত্রী তানিয়ার উপস্থিতিতেই শুরু হয় সালিশ। একসময় জুড়িবোর্ড থেকে ফিরে বিচারকরা রায় দেন ‘তানিয়ার দাম্পত্য জীবনের মূল্য ১ লাখ ১০ হাজার টাকা। বিয়ের কাবিন নজরুল জোরপূর্বক ছিড়ে ফেলায় আবার নতুন করে কাবিন হবে। কাবিনের পর নজরুল তানিয়াকে তালাক দিবে।’ উপজেলার শীর্ষ ব্যক্তিদের দেয়া এই রায় শুনে উপস্থিত লোকজন হতবাক হন। চিৎকার দিয়ে উঠে কলেজছাত্রী তানিয়া। সালিশ সভায় সে জানায় এই রায় আমি মানি না। ভেঙ্গে যায় সালিশ। বর্তমানে বিচারের আশায় আদালতের দোরগোড়ায় ঘুরছে তানিয়া। আর লম্পট নজরুল বীরদর্পে ঘুরে বেড়াচ্ছে এলাকায়। এদিকে ভবিষ্যৎতের ভাবনায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন তানিয়ার পরিবার।

জানা যায়, উপজেলার পানিশ্বর ইউনিয়নের বিটঘর গ্রামের দরিদ্র পরিবারের মৃত আব্দুর রহমানের কনিষ্ঠ কন্যা তানিয়া। ৪ ভাই, ৩ বোনের মধ্যে তানিয়া সবার ছোট। ভাইয়েরা রিকশা চালায়। প্রতিবেশী বিত্তশালী পরিবারের আহাদ ফকিরের পুত্র নজরুল বেড়তলা নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্যারা শিক্ষক। একসময় তানিয়াকে নজরুল প্রাইভেট পড়াত। বিগত তিন বছর আগে পড়ানোর ফাঁকে জোরপূর্বক তানিয়াকে ধর্ষনের সময় জনতার হাতে ধরা পড়ে নজরুল। স্থানীয় ইউপি সদস্য মোবারক মিয়া, বাবুল মিয়া সহ অনেকে সালিশ করে তানিয়ার ইজ্জতের মূল্য নির্ধারন করেছিল ২৬ হাজার টাকা। এ ঘটনার পর এসএসসি পাশ করে তানিয়া কলেজে ভর্তি হয়। নজরুল ফের প্রেমের জালে ফেলে তানিয়াকে। বিয়ের আশ্বাস দিয়ে দৈহিকভাবে ভোগ করতে থাকে। অনেক স্বজন ও বন্ধুর বাসায় স্বামী-স্ত্রীর পরিচয়ে রাত্রিযাপন করে তারা। এভাবে চলে দুই বছর।

গত ৩ ডিসেম্বর রাতে নজরুল ও তানিয়া আপত্তিকর অবস্থায় জনতার হাতে ধরা পড়ে। দু’জনকে নিয়ে আসা হয় সরাইল উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান মাহমুদা পারভীনের সরকারি কোয়াটারে। চার লাখ এক টাকা দেনমোহরে তাদের বিয়ে হয়। বিয়ের চার দিন পর বেঁকে বসেন নজরুল। গত ৮ ডিসেম্বর পানিশ্বর মাদ্রাসার মসজিদে গিয়ে নজরুল জোর করে কাজীর বলিয়ম বই থেকে তাদের বিয়ের কাবিননামা ছিঁড়ে ফেলে। এ ঘটনায় কাজী আবদুল আউয়াল ১১ ডিসেম্বর নজরুলের বিরুদ্ধে সরাইল থানায় জিডি করেন। কাবিননামা ছিঁড়ে ফেলার খবর পেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে তানিয়া। ন্যায় বিচারের আশায় ঘুরতে থাকে সমাজপতিদের দ্বারে দ্বারে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কান্নাজড়িত কন্ঠে তানিয়া বলেন, এই সমাজে গরীবের বিচার নাই। নজরুল আমাকে ভালবেসেছে। বিয়ে করার কথা বলে অসংখ্যবার আমার দেহ ভোগ করেছে। কাবিন ছিঁড়ে এখন আমাকে স্ত্রীর অধিকার থেকে বঞ্ছিত করতে চাচ্ছে। সর্দাররা এখন আমাকে টাকা দিয়ে স্বামীহারা করতে চাচ্ছে। লম্পট নজরুল টাকা দিয়ে সব ম্যানেজ করেছে। আমি সালিশের রায় মানি না। নজরুল আমাকে স্ত্রীর অধিকার না দিলে আত্মহত্যা করব। মৃত্যুর আগে লিখে যাব আমার মৃত্যুর জন্য দায়ী নজরুল। ভাইস চেয়ারম্যান মাহমুদা পারভীন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, নজরুলের পরিবারের লোকজন টাকা দিয়ে বিষয়টি মিটিয়ে ফেলছে চাইছে। নজরুলের বড় ভাই আমাকে ৪০ হাজার টাকা দিতে চেয়েছিল। বিনিময়ে আমি যেন তানিয়ার পক্ষ না নেয়। এ ব্যাপারে উপজেলা চেয়ারম্যান হাজী রফিক উদ্দিন ঠাকুর ও ভাইস চেয়ারম্যান শাহজাহান মিয়া সালিশের কথা স্বীকার করে বলেন, ছেলে মেয়ের পরিবারের মধ্যে বিশাল পার্থক্য বিদ্যমান। উভয় গোষ্ঠীর মধ্যে বিরোধ রয়েছে। মেয়ের অভিভাবকদের মতামতের ভিত্তিতেই আমরা সালিশ করেছি। রায় না মানলে তারা যা ভাল মনে করে, তা-ই করুক।

Check Also

আশুগঞ্জে সাজাপ্রাপ্ত আসামির মরদেহ উদ্ধার

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি :– ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে মো. হারুন মিয়া (৪৫) নামে দুই বছরের সাজাপ্রাপ্ত এক আসামির ...

Leave a Reply