কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহি রসমলাই দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশেও রপ্তানিও হচ্ছে

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী,কুমিল্লা :

প্রতিদিন গড়ে ৫০ মণ রসমলাই বিক্রি হচ্ছে
স্বাধীনতার পূর্ব থেকেই কুমিল্লার রসমলাইয়ের সুনাম বাংলাদেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে বিগত ৩০ বছর ধরে কুমিল্লার রসমলাইয়ের চাহিদা দেশ ছাড়িয়ে বিদেশ পর্যন্ত গড়িয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ৫০ মণ রসমলাই বিক্রি হয় কুমিল্লা শহর ও বিশ্বরোডের দোকানগুলোতে। প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত শহরের কান্দিরপাড় মনোহরপুরে অবস্থিত মাতৃভান্ডার,ভগবতী, জলযোগ, জেনিস,পোড়াবাড়িতে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ ভিড় জমায় রসমলাই কেনার জন্য। ক্রেতাদের ভীড় সামাল দিতে দোকানের কর্মচারিদের অনেক হিমসিম খেতে হয়। কেউ বাড়ির ছেলে-মেয়ে,স্ত্রীর জন্য, কেউবা মেহমানদের আপ্যায়ন করার জন্য,কেউবা আতœীয়দের বাসার জন্য,নতুন সর্ম্পক হচ্ছে এমন বাড়িতে নেয়ার জন্য এবং কেউবা অফিসের বসদের উপহার দেয়ার জন্য প্রতিদিন হাজার হাজার টাকার রসমলাই কিনে নিয়ে যাচ্ছে। কুমিল্লা জেলার বাইরে দেশের সর্বত্র রসমলাই কিনে নিচ্ছে এক ধরণের ব্যবসায়ীরা । কুমিল্লার বাইরে ফেনি,চাদঁপুর,নোয়াখালি,ঢাকার বিভিন্ন মিষ্টি দোকান ব্যবসায়ীরা কুমিল্লা থেকে প্রায় প্রতিদিনই ১/২ মণ রসমলাই কিনে নিয়ে যায়। হারুন নামের ফেনির এক মিষ্টি দোকানদার রসমলাই কিনতে এসে জানান, তিনি নিজে অথবা কর্মচারীর মাধ্যমে সপ্তাহে ৩/৪ দিন কুমিল্লায় এসে প্রতিবারে ৩০/৩৫ কেজি রসমলাই কিনে নিয়ে যান। প্রতি কেজিতে প্রায় ৩৫ টাকা লাভ হয় বলে তিনি জানান। এভাবে অনেকেই শহরে অথবা জেলার বাইরে রসমলাই কিনে নিয়ে লাভে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। মনোহরপুরের রসমলাই ব্যবসায়ীরা এ ব্যাপারে জানান, জেলার মধ্যে কিংবা জেলার বাইরে কোন ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করার জন্য রসমলাই নেয় কিনা জানিনা। আমাদের কাছে সব ক্রেতারাই সমান। অনেকে একাই ১০/১৫ কেজি কিনে নেয়। সূত্রমতে,এছাড়া হিন্দুদের বড় বড় পূজাগুলোতে বর্ডার কিছুটা উন্মুক্ত হয়ে যাওয়ার ফলে ওই সময়ে কুমিল্লার বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন ৫/৬ মণ রসমলাই ভারতে নিয়ে যাওয়া হয় বলে জানা যায়। আবার অনেকে বিদেশে থাকা তাদের আতœীয়-স্বজনের জন্যও কুমিল্লার রসমলাই প্যাকেট করে পাঠাচ্ছে। কুমিল্লার রসমলাই বিভিন্ন বিদেশী রাষ্ট্রের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদেরকেও আকৃষ্ট করে। যেমন,২০০৭ সালের ১১ই নভেম্বর বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত গীতা পার্সি বাংলাদেশ সফরে আসলে তার দুই সহযোগি কুমিল্লার মাতৃভান্ডারে এসে রসমলাই খেয়ে যাওয়ার সময় গীতা পার্সির ইচ্ছাতেই তার জন্য ২ কেজি রসমলাই ও দেড় কেজি ক্ষীর কিনে নিয়ে যান। কুমিল্লা শহরে ১৫টি রসমলাই ও মিষ্টির দোকান রয়েছে। তবে উৎকৃষ্ট ও সুস্বাদু রসমলাই পেতে হলে মনোহরপুরে অবস্থিত মাতৃভান্ডার, ভগবতী দোকানে আসতে হবে। এছাড়া জেলার রেল ষ্টেশন,গুরুত্বর্পূণ বাস স্ট্যান্ড,আলেখারচর বিশ্বরোড,ময়নামতি ক্যান্টনমেন্ট এলাকা,হাইওয়ে রোডের বড় বড় হোটেলগুলোসহ ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার ৯৭ কিঃমিঃ রাস্তার আশেপাশে ব্যাঙের ছাতার মত গড়ে উঠছে রসমলাইয়ের মাতৃভান্ডার শো-রুম। এসব দোকানগুলোর সাইনবোর্ডে লেখা থাকে আদি মাতৃভান্ডার,নিউ মাতৃভান্ডার,কুমিল্লা মাতৃভান্ডার,মাতৃভান্ডারের প্রথম শো রুম,২য় শো রুম,বা কুমিল্লার মাতৃভান্ডারের রসমলাই পাওয়া যায়। শহরের মাতৃভান্ডারের কর্তৃপক্ষ জানায়,কোথাও তাদের কোন শো রুম নেই। অপর দিকে শো রুম বলে দাবি করা দোকানের কর্তৃপক্ষরা জানায়,এগুলো মাতৃভান্ডারের শো রুম। সূত্র জানায়, এসব দোকানে মূলত আসে ঢাকা,চট্রগ্রাম,কক্সবাজার,সিলেট ও বি-বাড়িয়া ভ্রমণকারি লোকজন,যারা যাত্রাপথে গাড়ি থামার পর রসমলাই কিনে নিয়ে যায়। কুমিল্লার রসমলাইয়ের দোকানগুলোর মধ্যে মাতৃভান্ডার,ভগবতী ভান্ডারে প্রতিদিন ৫/৬ মণ করে রসমলাই তৈরি করা হয়। এই দোকানে প্রতিদিন ভোর ও বিকাল বেলায় ৫/৬ জন দুধ ব্যবসায়ী প্রায় ১০ থেকে ১৫ মণ দুধ সরবরাহ করে থাকে। তবে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার অন্যান্য দিনের তুলনায় ২০/৩০ কেজি দুধ বেশি দেয়া লাগে বলে দুধ ব্যবসায়ীরা জানায়। এর কারণ এই দুই দিন অন্যান্য দিনের তুলনায় বেশি রসমলাই তৈরি করা হয়। মাতৃভান্ডারে ১ কেজি রসমলাইয়ের দাম ১৭০ টাকা আর ১ প্লেইট রসমলাইয়ের দাম ৩০ টাকা হিসেবে বিক্রি করা হয়। অন্যান্য দোকানেও প্রায় একই দাম। সূত্র মতে, মাতৃভান্ডার,ভগবতী ভান্ডারে প্রতিদিন প্রায় ৯০ হাজার থেকে ১ লক্ষ টাকার উপরে আর বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার বিক্রির পরিমান প্রায় দেড় থেকে ২ লক্ষ টাকার উপরে হয় বলে জানা গেছে।বিভিন্ন সূত্রমতে, কুমিল্লা শহরের ১৫টি মিষ্টি দোকানে প্রতিদিন গড়ে ৫০ মণ রসমলাই বিক্রি হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন রসমলাই কর্মচারী জানায়, কুমিল্লা শহরের দোকানগুলোতে প্রতিদিন প্রায় ৪ লক্ষ টাকার রসমলাই বিক্রি হচ্ছে। দেশের সর্বত্র ভোজন বিলাসীদের কাছে রসমলাই বলতে কুমিল্লার রসমলাইকে বুঝায়। তাইতো কুমিল্লায় আসলে যে কেউই রসমলাই খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে সহজেই ভুল করেনা।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply