চাকুরীরর মেয়াদ শেষ না হতেই নাম নেই যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা তালিকায়

রাজনৈতিক কারণে চাকুরীরর মেয়াদ শেষ না হতেই সেনাবাহিনীর চাকুরী হতে অবসরে যাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষক ও বঙ্গবন্ধু হত্যামামলার স্বাক্ষী করপোরাল অবসরপ্রাপ্ত আবদুল মতিন চৌধুরীর নাম নেই যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা তালিকায়
মোঃ শরিফুল আলম চৌধুরী, মুরাদনগর (কুমিল্লা) থেকে, ০৬ ডিসেম্বর ২০১১ :

মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষক ও বঙ্গবন্ধু হত্যামামলার স্বাক্ষী যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা করপোরাল (অবসরপ্রাপ্ত) আবদুল মতিন চৌধুরী
যুদ্ধাহত এক বীর মুক্তিযোদ্ধা রাজনৈতিক কারণে বাধ্যতামূলক সেনাবাহিনীর চাকুরী থেকে অবসরে আসা সহ যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধার তালিকা থেকে বাদ দেয়ার অভিযোগ করেছেন কুমিল্লার মুরাদনগরে (অবঃ) সেনাদ সদস্য কর্পোরেল আবদুল মতিন চৌধুরী। মহান মুক্তিযোদ্ধে পাক হানাদার বাহিনীর গুলিতে আঘাত প্রাপ্ত হওয়ার কারণে মাত্র ৯ বছর কর্মজীবন শেষ না করতেই সেনাবাহিনীর চাকুরী হতে অবসর দেওয়া হয় তাকে। তিনি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে একজন শিক্ষক প্রশিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পালন ছাড়াও বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার অন্যতম স্বাক্ষী ছিলেন।

যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম লিখাতে না পারা, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষক জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যামামলার অন্যতম স্বাক্ষী কর্পোরেল অবসরপ্রাপ্ত আবদুল মতিন চৌধুরী জানান, কী কারণে এবং কার অবহেলায় যোদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় আমার নাম নেই তার সুনির্দিষ্ট কোন ব্যাখ্যা জানা নেই, তবে তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির স্বীকার হয়েছেন বলে তিনি অভিমত পোষণ করেন।

যোদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম অন্তর্ভূক্তির জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সহযোগিতা চান তিনি। কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলা ১৯নং দারোরা ইউনিয়নের কাজিয়াতল গ্রামের মৃত- আম্বর আলীর ৩য় ছেলে আবদুল মতিন চৌধুরী মহান স্বাধীনতার মহানায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সেই ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষনে অনুপ্রাণীত হয়ে মুক্তিযুদ্ধে শতঃস্ফুর্ত ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ২০ বছর বয়সে আবদুল মতিন চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য ভারতের অম্বিনগর, মতিনগর, মেলাঘর, আগরতলার, শালবন ও লাটিটিলায় দীর্ঘ্য ১ মাস ১৮ দিন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করার পর ১৯৭১ সনের ২৫শে এপ্রিল তৎকালীন কুষ্টিয়ার মেহেরপুর ১৭ এপ্রিল গঠিত মুজিবনগর সরকারের অধীনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ২ ফিল্ড আর্টিলারী (২য় গুলন্দাজ বাহিনী) তে ২৯৩৮৪০৪ নং সৈনিক হিসাবে যোগ দেন।

সেনাবাহিনীতে যোগদানের পর তিনি মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। সৈনিক হিসাবে পারদর্শিতার সহিত তিনি গার্ণার, নায়েক, কর্পোরাল পদে উন্নিত হন। ১৯৭১ সালে যুদ্ধে ২নং সেক্টরের অধীনে ভারতের লাটিটিলা নামক স্থানে মেজর রাশেদ এবং লেঃ সাজ্জাদ জহির এর সাথে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। তিনি মেরিন টি গার্ডেন সমসেরনগর, মঙ্গলাবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, আখাউড়া সহ প্রত্যন্ত অঞ্চলে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেন। এছাড়া কোকিতলা যুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনীর গুলিতে তার বাম পায়ের হাটুতে মারাতœক আঘান পান এবং আহন হন। তবুও তিনি পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে এগিয়ে যান। ফলে কোকিতলা যুদ্ধে জয়লাভ করেন।

বিরুত্তপূর্ণ লড়াইয়ের কারণে তিনি বিভিন্ন খেতাবে ভূষিত হন। তার মধ্যে মেডেল, সামরিক খেতাব, ইমতিয়াজ খেতাব, ভিক্টোরিয়া মেডেল, কন্সটিটিশান মেডেল, ক্যাপ্টেন স্টার, ওয়ার মেডেল, লিভ্রারেশন স্টার উল্লেখযোগ্য। যুদ্ধাহত হওয়ার কারণে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ডাক্তারি মতে ও.এ.আর (আই)’র ১৭২ নং নির্দেশ অনুযায়ী চরিত্র সম্পর্কিত মন্তব্য ভাল ঘোষনা নিয়ে ১৯৭৯ সালের ১ডিসেম্বর দীর্ঘ ৮ বৎসর ৬ মাস ৬দিন চাকুরী করার পর সেনাবাহিনীর চাকুরীতে হতে তাকে অবসর দেওয়া হয়।

স্বাধীনতা সংগ্রামে জয়ী এ যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বঙ্গবন্ধু হত্যামামলার অন্যতম ১৯ নং স্বাক্ষী, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষক কর্পোরেল অবঃ প্রাপ্ত আবদুল মতিন চৌধুরী জীবন সংগ্রামে জয়ী হতে পারেননি। তার স্বপ্ন ছিল দেশকে পরাধীনতার হাত হতে মুক্ত করবেন, তাই সেই স্বপ্ন পূরণ হলেও কেন কী কারণে অবহেলায় যুদ্ধাহত তালিকায় তার নাম নেই। মুক্তিযোদ্ধা কর্পোরেল অবঃ আবদুল মতিন চৌধুরী (৬০) বয়সের ভারে নুয়ে পরলেও বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ ও মুক্তিযোদ্ধা সংগঠনের ডাকা প্রত্যেক সভা সমাবেশ, মিটিং, মিছিলে এখনো তারুন্যের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। গত শনিবার এ প্রতিবেদন তৈরীর যখন প্রস্তুতি চলছিল ঐ দিন কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার বিজয় দিবসের প্রস্তুতি সমাবেশে যোগ দেওয়ার জন্য তার নেতৃত্বে জেলার মুরাদনগর উপজেলার শতাধিক মুক্তিযোদ্ধাদের একটি মিছিল দীর্ঘ ২০ কিঃ মিঃ পায়ে হেটে মুরাদনগরে আসে।

বর্তমানে তিনি মুরাদনগর উপজেলার কাজিয়াতল গ্রামে দুচালা একটি টিনের ঘরে স্ত্রী, দুই ছেলে চার মেয়ে নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। মুক্তিযোদ্ধা কর্পোরাল অবঃ আবদুল মতিন চৌধুরী প্রতিবেদক কে বলেন, বর্তমানে দেশে ভুয়া তথ্য দিয়ে রাজাকারা মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট নিয়ে স্বার্থ সিদ্ধি আদায় করছে। আর আর জীবন বাজী রেখে দেশের জন্য যুদ্ধ করে ১৯৭৫ সালে ১৪ আগষ্ট রাতে স্বাধীনতার মহান কর্তা জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবার বর্গকে নৃসংশ হত্যার পরিকল্পনাকারীদের পক্ষ অবলম্বন না করায় যোদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে স্বীকৃতি না পাওয়া ছাড়াও নানাভাবে হয়রানীতে স্বীকার হয়েছেন তিনি। বঞ্চিত হয়েছেন মুক্তিযোদ্ধাও অবঃ সেনা সদস্য হিসাবে সকল রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা থেকে। ষরযন্ত্রের শিকার মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মতিন চৌধুরী আওয়ামীলীগ সমর্থক হওয়ায় বিগত জোট সরকারের আমলে তার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ না থাকা সত্বেও তাকে কয়েকবার জেল হাজতে যেতে হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপর তিনি অভিমান করে বলেন বঙ্গবন্ধু কণ্যা দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দুইবার ক্ষমতায় এসেও আমাদের অবহেলিত লোকদের খোজ খবর নেননি। প্রধানমন্ত্রীর সাতে সরাসরী স্বাক্ষাত করে তার সাথে খোলামেলা আলাপ করতে চান কি না এ প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে গিয়ে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর মনে উদার ও মহানুভবতা থাকলে তথা সত্যিকার অর্থ তাঁর বাবার সমর্থকদের খোঁজ খবর নিতে চাইলে তিনিই ভাল বুঝেন কী করতে হবে। তিনি আক্ষেপ করে আরও বলেন প্রধানমন্ত্রী মহানভবতা কিংবা কোন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চাইলে তিনিই তো আমার বাড়ী আসতে পারেন। কাজিয়াতল আবু বকর আল ইসলামিয়া মাদরাসা কমপেক্সের প্রতিষ্ঠাতা হাফেজ সুয়াইবুল হোসেন শাহজাহান মুন্সী জানান, আমাদের এলাকায় মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মতিন চৌধুরী সহ তার আতœীয় স্বজন দেখলেই আওয়ামীলীগ বলে এলাকার লোকজন ডাকে। তিনি আরো জানান, বিগত জোট সরকারের আমলে ঐ এলাকার গার্মেন্টস কর্মী জসীম উদ্দিন একটি জমি ক্রয় করার পর বি এন পি নেতাদের বাধার মুখে আজও দখলে যেতে পারেন নি কারণ ওই জমি ক্রয়কারী গার্মেন্টস কর্মী জসিম উদ্দিন সম্পর্কে আওয়ামীলীগ নেতা মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মতিন চৌধুরীর আপন বড় ভাই আক্রাম আলীর ছেলে।

Check Also

দেবিদ্বারের সাবেক চেয়ারম্যান করোনা আক্রান্ত হয়ে ঢাকায় মৃত্যু: কঠোর নিরাপত্তায় গ্রামের বাড়িতে লাশ দাফন

দেবিদ্বার প্রতিনিধিঃ কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার ভাণী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল হান্নান (৫৫) করোনায় আক্রান্ত ...

Leave a Reply