অপসংস্কৃতির হরতাল ও চলমান নৈরাজ্য মেনে নেয়া যায়না

মো. আলী আশরাফ খান :

দেশও দশের ক্ষতি হয় এমন কর্মকাণ্ড কস্মিনকালেও সুস্থ ও মানবতাবাদী ব্যক্তি, গোষ্ঠী-জাতি কিংবা কোন দল বা সংগঠনের কর্মসূচী হতে পারে না। প্রকৃতই যদি দেশ ও দশের কল্যাণের লক্ষ্যে কোন দরদী ব্যক্তি-গোষ্ঠী কিংবা সংগঠন কোন কর্মকাণ্ড হাতে নেয়, তাহলে অবশ্যই সেটা হতে হবে জনগণের সার্বিক কল্যাণমুখী এবং নির্ঝঞ্ঝাট ও সুন্দর জীবনযাপন বাস্তবায়নের পথকে সুগম করা। এ ক্ষেত্রে সরকারের তো আরো বেশি দায়িত্বশীল ভূমিকা থাকবে এটাই বাঞ্ছনীয়। অথচ নির্মম সত্য, হচ্ছে এর সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী। কি সরকার কি বিরোধী দল এখন সকলেই দেশে এমন সব কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে, যা বরাবরই প্রতিভাত হচ্ছে-তাদের চরম হীনতা ও ব্যর্থতার বিষয়টি।

একবিংশ শতাব্দীতে এ দেশের রাজনীতিক দলগুলো আধুনিক ও যুগোপযোগী বলে দাবি করলেও নিজেদের অপস্বার্থ রক্ষায় এমন কোনো কাজ নেই যা তারা এখন করছে না। সরকারি দল চাচ্ছে নিজেদের ক্ষমতা ও স্থায়ীত্বতাকে সুদৃঢ় করতে। আর এ জন্য নীতি-নৈতিকতাকে বির্জন দিতেও বিন্দুমাত্র সংকোচ নেই তাদের। শুধু তাই নয়, সংবিধান সংশোধন, সংযোজন-বিয়োজন এবং পরিমার্জনের মধ্যদিয়ে একটি পরিকল্পিত রাস্তাধরে এগুচ্ছে তারা। শুধু তাই নয়, ঐতিহ্যবাহী স্থান-প্রতিষ্ঠানের নাম বদল এমনকি ঢাকার বুককে চিরে ফেলতে দ্বিধা করেনি তারা। অপর দিকে বিরোধী দলগুলো মনে করছে, সরকার নীয়ম-নীতিকে তোয়াক্কা না করে যথেচ্ছভাবে দেশ চালাবে, তা আমরা মানবো না। আমরাও আমাদের মতো করে দেশের জনগণ ও সম্পদকে নিয়ে হলিখেলায় মেতে ওঠবো। ব্যস কেল্লা ফতেহ! এখন যা হারানোর জনগণ হারাবে। সরকার ক্ষমতার দাপটে অন্ধ হয়ে একের পর এক উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ড ও বক্তব্য দিয়ে যাবে আর বিরোধী দলগুলো তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে জনগণের বারোটা বাজাবে। এ হলো এদেশের বর্তমান রাজনীতি চর্চার চিত্র।

অপ্রিয় সত্য হলো, ভ্রান্তরাজনীতি চর্চার যাঁতাকলে এখন এদেশের মানুষ চরম সমস্যায় পর্যবসিত। বৃহৎ জনগোষ্ঠীর পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকে গেছে। জনসাধারণের দিনে দিনে বহু সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে এদেশের রাজনৈীতিক দলগুলোর ভ্রান্ত পথে চলার কারণে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে ভ্রান্তরাজনীতি চর্চায় জণসাধারণদের বহু ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। যদিও আমরা মনে করেছিলাম, আস্তে আস্তে ভ্রান্তধারার অপসংস্কৃতিগুলো দূর হবে এ দেশ থেকে। কিন্তু না, তা তো হচ্ছেই না বরং নতুন নতুন সমস্যা যোগ হচ্ছে আমাদের জাতীয় জীবনে। দিন যতই এগুচ্ছে সরকার ততই নিজেদের স্বার্থকে চরিতার্থ করার অপপ্রয়াসে বহু অপ্রত্যাশিত কাজ করছে। তেমনি বিরোধী দলগুলোও হরতাল-অবরোধ-বিক্ষোভের নামে দেশে বীভৎসতা ও চরম জনদুর্ভোগের সৃষ্টি করছে। তারা দেশটিকে একান্তই নিজেদের সম্পদ মনে করে যেমন খুশী তেমন নাচাতে চাইছে। আসলে জনগণ কিন্ত এখন যথেষ্ট সচেতন, সময় হলে এসব নেক্কারজনক কর্মকাণ্ডের জবাব ঠিকই দেবে-এটা কিন্তু তাদের বুঝতে হবে। যদিও সরকার ও বিরোধী দলগুলো মনে করে এ পথে তারা সফল হবে, আসলে তাদের এ ধারণা মরীচিকা বলেই এক সময় প্রমাণিত হবে।

আমরা বলি কি, সময় থাকতে সরকার ও সকল রাজনৈতিকদের ভ্রান্তধারার অপকৌশল পরিত্যাগ করলেই তাদের জন্য মঙ্গল হবে। জনগণ এখন কাজকে বিশ্বাস করে, কথাকে নয়। মানুষ চায়, এক মুঠো ভাত কম খেয়ে হলেও শান্তিতে-নিরাপদে বসবাস করতে। সরকারকেও এই বিষয়গুলো গুরুত্ব দিতে হবে। হরতাল-অবরোধ নামের ধবংসলীলা থেকে জনগণকে বাঁচাতে সকল কর্ণধারদের একজোটে কাজ করতে হবে। বের করতে হবে অন্য কোন রাস্তা এসবের বিকল্প হিসেবে। যাতে করে প্রত্যেক মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত হয়। জ্বালাও পোড়াও ধ্বংস-ধ্বংস খেলা আর নয়, সৃজনশীলতার পরিচয় দিতে হবে; আর তবেই রাজনীতির উপর জনগণের আস্থা বাড়বে, ভালোবাসা অর্জন করা সম্ভব হবে। জনগণের রায় পেতে হলে সঠিক দায়িত্ব পালনের বিকল্প নে-এটা মনে রাখতে হবে। নেতা-নেত্রীদেরওপর নিপিড়ন, হরতাল-অবরোধের পক্ষে-বিপক্ষে মোবাইল কোর্ট, বেধরক লাটিচার্জ, মুষ্টিমেয় কিছু দলীয় বখাটে উচ্ছৃঙ্খল পিকেটার ও অস্ত্রবাজ দ্বারা দেশে অরাজকতা সৃষ্টির মাধ্যমে ক্ষমতায় টিকে থাকা বা ক্ষমতা পাবার চিন্তা মাথা থেকে বাদ দিতে হবে। “আমরা হরতাল-অবরোধ চাই না, আমরা বিরোধী দলে থাকলেও কখনো হরতাল করবো না”। এ কথাগুলো ভুলে গেলে চলবে না। সরকারেরও উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ড, পুলিশকে লেলিয়ে দেওয়া ও বেফাঁস বক্তব্য প্রদান থেকে বিরত থাকতে হবে। জাতীয় সব বিষয়ে আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টি করা কিন্তু সরকারে দায়িত্ব-এটা মনে রাখতে হবে। সব সমস্যার সমাধান ‘আলোচনা’ এটা সকলকে বিশ্বাস করতে হবে। সোজা কথা,অপসংস্কৃতির হরতাল ও চলমান নৈরাজ্য কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায়না। এর জন্য সরকার যেমন দায়ি তেমনি বিরোধী দলও দায়ি। শুধু তাই নয়, দেশে যাবতীয় বিশৃংখলার জন্য রাজনৈতিক দল ও কর্মীদের সমানভাবে দায়ি করতে হয়। আর এটা মেনে নিয়ে সকল রাজনৈতিক দল একজোটে কাজ করলেই নিজেদের ভুল-ত্র“টিগুলো শুধরানো সম্ভব হবে।

আমাদের বুঝতে হবে, দেশে যখন ৩ কোটি মানুষ বেকার, মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছে দেশের সিংহভাগ তরুণ-তরুণি, দ্রব্যমূল্য আকাশ ছোঁয় ছোঁয় অবস্থা, সার্বিকভাবে মানুষ ভীষণ কষ্টে দিনযাপন করছে, আইন-শৃঙ্খলার হচ্ছে ভয়াবহ অবনতি; সরকার ও রাজনীতিক দলগুলোর ভূমিকা নিয়েও যথেষ্ট প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, তখন কিন্তু সকলকেই দায়ী করতে হয়। তাছাড়া দেশ চালনার ক্ষেত্রে সকলেরই প্রশংসনীয় ভূমিকা থাকবে-এটাই স্বাভাবিক। আমরা চাই না, কোন ব্যক্তি-রাজনীতিক দল কিংবা সরকারের কোন ভুল সিদ্ধান্তের কারণে, দেশের প্রায় সব ক্ষেত্রেই ভয়াবহ সমস্যার সৃষ্টি হোক, অন্য কোনো শক্তির উত্থান হোক এদেশে-এটা আমাদের কারোই কাম্য নয়।

লেখকঃ
কবি, কলামিস্ট ও সংগঠক,গৌরীপুর, দাউদকান্দি, কুমিল্লা।

Check Also

মিনি ওয়াক-ইন-সেন্টারের মাধ্যমে রবি’র গ্রাহক সেবা সম্প্রসারণ

ঢাকা :– গ্রাহক সেবাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে মোবাইলফোন অপারেটর রবি আজিয়াটা লিমিটেড সম্প্রতি মিনি ওয়াক ...

Leave a Reply