যুদ্ধে যুদ্ধে জীবনঃ মুক্তিযোদ্ধা দেলোয়ার জাহিদের এক সংগ্রামী জীবনালেখ্য

কানাডা প্রবাসী বীর মুক্তিযোদ্ধা, লেখক, সাংবাদিক ও মানবাধিকার সংগঠক দেলোয়ার জাহিদের জীবন জীবিকা ও দেশ ভাবনা নিয়ে সাক্ষাতকার

সাক্ষাতকার গ্রহণে: মিজান আহমেদ ও আবু সাঈদ চৌধূরী

কানাডা প্রবাসী একজন মুক্তিযোদ্ধা, একজন লেখক, একজন সাংবাদিক ও একজন মানবাধিকার সংগঠক এবং সর্বোপরি একজন শিক্ষক, নাম তার দেলোয়ার জাহিদ। ’৭১এর মুক্তিযুদ্ধ থেকে জীবনযুদ্ধে, লড়াইয়ের পর লড়াই করে এখন ক্ষানিকটা ক্লান্ত, শ্রান্ত ও অবসন্ন। দেশ ছেড়েছেন অনেক বছর কিন্তু শেকড় গ্রথিত বাংলাদেশে। দেশের প্রতিটি ঘটনা প্রবাহ নিয়ে আবর্তিত তার সুখ, দুঃখ হাসি, কান্না। কখনো কখনো লিখনীতে ফুটে উঠে দেশের ভবিষ্যের স্বপ্নজাল। জীবনের প্রতিটি কাজে যে মানুষটি শুধুই খুজে ফিরেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সেই মানুষটির সাথে আলাপচারিতায় এ প্রজন্মের আমরা দুইজন তরুন পেশাজীবি আমি মিজান আহমেদ ও আবু সাঈদ চৌধূরী।

দেলোয়ার জাহিদের জন্ম নরসিংদী জেলার উত্তর প্রান্তে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদীর তীরে সররাবাদ নামক ছোট্র একটি গায়ে। ভৈরব বাজারের পশ্চিমে অবস্থিত এ গা কিন্তু শৈশব, কৈশোর ও তার যৌবনের দূরন্ত সময় কেটেছে তার কুমিল্লায়। শিক্ষাজীবন কেটেছে আর দশজন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান-সন্তুতিদেরই মতো, শুরু যার এক মাটির ঘরের বিদ্যাপীঠে- ঠাকুরপাড়া নিরোধা সুন্দরী পাঠশালা, ঈশ্বর পাঠশালা, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারী কলেজ ও যথাক্রমে চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে।

’৭১ এর মার্চের শেষের দিকে ছাত্র দেলোয়ার জাহিদ পালিয়ে যান কুমিল্লা থেকে ভৈরবে। তখন ভৈরব বাজার দখলে নেয়ার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পাক হানাদার বাহিনী। নুরুর নেতৃত্বে দেলোয়ার জাহিদ ও আরো কয়জন তাদের প্রতিহত করতে বল্লম হাতে সেদিন ছুটে গিয়েছিলেন। দৌলতকান্দি হয়ে প্রচন্ড গোলাগুলির মধ্য দিয়ে যখন ভৈরব পৌঁছেন তখন বিমান থেকে মেশিনগান দিয়ে পাক সেনারা অবিরাম গুলি ছুড়ছিলো। এদিক সেদিক ছুটাছুটি করছে সবাই, পালাচ্ছে মানুষ, নারী, পুরুষ, শিশু সবাই নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে । পরিত্যক্ত দুটি রাইফেল নিয়ে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদীর কিনারে ছুটে এলেন নূরু আর দেলোয়ার। হাজার হাজার নারী পুরুষ নদী পারাপারের অপেক্ষায় । অস্বীকৃতি জানাচ্ছে মাঝি-মাল্লারা লোক পারাপারে। বিপন্ন মানুষ মৃত্যুর প্রহর গুনছে। যেকোন সময় যমদূত পাক সেনারা এসে হাজির হবে। রাইফেল নিয়ে তরিৎ নুরু ও দেলোয়ার লাফিয়ে উঠলেন নৌকায়, পারাপার করলেন শত শত মানুষকে। এভাবেই নুরু ও দেলোয়ারের মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়া।

দেলোয়ারের সহযোদ্ধা নুরুর বিভিন্ন দু:সাহসী অভিযানের খবর ছড়াতে শুরু হয় চারিদিকে। স্বাধীন বাংলা বেতার থেকেও বিভিন্ন অপারশনের কথা প্রচারিত হয়। নুরুর সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিলেন দেলোয়ার। আর নুরুকে দায়িত্ব অর্পন নিয়োগ দান করেছিলেন তদানিন্তন মেজর (বর্তমানে অব: মেজর জেনারেল) মঈন এ চৌধুরী| নুরু তৎকালীন ভৈরব থানার ওসি কুতুবুর রহমান এবং কর্ণেল (অব:) নুরুজ্জামানকে ও ভারত পৌঁছে দেন। কুতুবুর রহমান সাহেব ভৈরববাজারে ব্যাংক লুটের সমস্ত টাকা-পয়সা অসীম সাহাসী নুরুকে নিয়েই স্বাধীন বাংলা সরকারের নিকট পৌঁছে দেন। ওসি কুতুবুর রহমান ও ছিলেন একজন দু:সাহসী মুক্তিযোদ্ধা ও এক কিংবদন্তীর নায়ক। দেলোয়ার প্রশিক্ষনের জন্য চলে যান ভারতের নরসিংগর হয়ে কাঠালিয়া ক্যাম্পে মাসাধিককাল পর ফিরে আসেন মুক্তাঞ্চল নারায়নপুরে। ৪ জুলাই, ১৯৭১ প্রকাশ্য দিবালোকে পাক বাহিনী পরিবেষ্টিত ভৈরব বাজারে দালাল শিরমনি মমতাজ পাগলার আড্ডায় তরকারীওয়ালার ছদ্মবেশে অতর্কিত আক্রমন চালায় নুরু আতিক ও মোহন, হত্যা করে মমতাজ পাগলা ও তার দোসরদের। ভৈরবের মধ্যভাগে এ আক্রমনে পাকবাহিনী ভয়ে পালাতে থাকে। দূর্ভাগ্যক্রমে ঘটনাস্থলে শহীদ হন আতিক এবং মারাত্মক আহত অবস্থায় পাকবাহিনীর কাছে ধরা পড়েন নুরু, আর পালিয়ে আসে মোহন। দেলোয়ারের সহযোদ্ধা নুরুকে বর্বরোচিত ভাবে গুলি করে হত্যা করে পাক সেনারা। শহীদ নূরু দেলোয়ারের শুধু সহযোদ্ধাই ছিলেন না, ছিলেন প্রানপ্রিয় মামা। শহীদ আতিক একজন মামাতো ভাই। দু’জন নিকটাত্মীয়কে হারিয়ে মুক্তিযোদ্ধা দেলোয়ার অনেকটা ভেঙ্গে পড়েন কিন্তু দায়িত্ব তাকে পিছু হটতে দেয়নি।

গেরিলা যুদ্ধের বিশিষ্ট সংগঠক নুরু-আতিকের শাহাদাত বরণের পর ৩ নং সাব সেক্টরের নারায়নপুর মুক্তাঞ্চলে চরম এক নেতৃত্ব শূন্যতার সৃষ্টি হয় । সেখানে তখন এফএফ এবং বিএলএফ এর যৌথ কমান্ড প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়। গঠিত হয় সর্বদলীয় যুদ্ধ পরিচালনা কমিটি। দেলোয়ার জাহিদকে ছাত্রফ্রন্টের সংগঠক নির্বাচিত করা হয়। তরুন বয়সে ও এ দায়িত্বের বোঝা তাকে অর্পন করা হয়। শহীদ নুরু আতিকের আশীর্বাদই ছিলো তার অনুপ্রেরনার উৎস। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা সার্জেন্ট (অবঃ) কাদের, নসা কাজী, ফকির সুরুজ মিয়া, আবদুল হান্নান, ছাত্রনেতা ওয়ালীউল্লা প্রমুখ এ পর্ষদে যোগ দেন|মুক্তিযোদ্ধা দেলোয়ারের জ্যেঠা মাওলানা ভাসানীর বিশিষ্ট সহচর ন্যাপ নেতা পন্ডিত আবদুস ছোবহান সহ আরো কয়েকজন ব্যক্তি ওই কমিটিতে অন্তর্ভূক্ত হন। কর্ণেল (অব:) নুরুজ্জামানের শিক্ষক গয়েস আলী মাস্টার (এফএফ কমান্ডার) এর সাথে কাজ করেন এবং দৌলতকান্দি, নারায়নপুর, বেলাব ও কালিকাপ্রসাদ সহ কয়েকটি যুদ্ধে অংশ নেন মুক্তিযোদ্ধা দেলোয়ার। রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের নিকটাত্মীয় বিএলএফ সংগঠক ও ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ভৈরবের ফয়সল আলমকে সংগে নিয়ে ৩ নং সেক্টরের আওতায় ৩ নং সাব-সেক্টরে এফএফ ও বিএলএফ এর কার্য্যক্রম সমন্বয় সাধন করে প্রভুত সফলতা লাভ করেন এবং সন্মান অর্জন করেন।এফএফ ও বিএলএফ সদস্যদের মধ্য সহযোগিতা ও সহমর্মিতার এক অনন্য নজির স্থাপন করেন মুক্তাঞ্চল নারায়নপুরে। সেদিনগুলো এখন শুধুই স্মৃতি।

যুদ্ধোত্তোর সময়ে মনোনিবেশ করেন শিক্ষায়, চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বি.এ অনার্স (’৭৬) ও এম-এ (’৭৭) ডিগ্রী নিয়ে দু’বছর ল ষ্টাডি করেন কুমিল্লা ল কলেজে । কর্মজীবনে তিনি ছিলেন পরিচালক, বাংলাদেশ সমাজকল্যান একাডেমী (৭৮-৮০), অধ্যক্ষ, নাঙ্গলকোর্ট কলেজ (৮০-৮২) প্রতিষ্টাতা সদস্য/ অধ্যাপক, কুমিল্লা মহিলা কলেজ (৮৩-৮৫) অধ্যক্ষ, কুমিল্লা আদর্শ কলেজ (৮৫-৮৮), সম্পাদক, বাংলা সাপ্তাহিক সমাজকন্ঠ (৮১-৮৮) যা স্বৈরাচারী সামরিক সরকার তৎসময়ে বন্দ্ধ করে দেয়। এর পুনঃ প্রকাশে হাইকোর্টে রীট আবেদন করতে হয় এবং সরকারের উপর হাইকোর্ট থেকে রুলনিশি ই্স্যু হয়। তিনি ছিলেন প্রধান নির্বাহী বাংলাদেশ মানবাধিকার ফাউন্ডেশান (৮৯-৯৫), কুমিল্লা জেলা সভাপতি, বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা (৮২-৯২)। কুমিল্লা প্রেসক্লাব ও কুমিল্লা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি এবং জাতীয় সাংবাদিক সংস্থার কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সভাপতি। ভূমিহীন কৃষক ও প্রান্তিক চাষীদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য নিবেদিত স্থানীয় এনজিও সেবা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্রের তিনি প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, যার নির্বাহী পরিচালক সালাউদ্দিন আহমেদ।

সংযুক্ত আরব আমিরাতে একটি জনসংযোগ চেম্বারের পরিচালক (৯২- ৯৪)। জার্মানে আইন সহায়তা পেশায় পিটার সিকের ল চেম্বার (৯৫-৯৭) ও প্রফেসার হাগার’স এর ল চেম্বার (৯৭-৯৯) এ একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা। ইউনিভার্সিটি অব এডুকেশান, ফ্রাইবুর্গ, জার্মানী এর রিসার্চ ফেলো (৯৬-৯৯), ইউনিভার্সিটি অব ভিগো, স্পেন এর রিসার্চ ফেলো (২০০০-২০০২) এবং স্পেনীশ ডেইলী’র একজন নিয়মিত কলামিষ্ট (২০০০-২০০২)। কানাডায়, কানাডীয়ান মেনোনাইট ইউনিভার্সিটি এর এসোসিয়েট রিসার্চ ফেলো (২০০৪) এবং সেন্ট পল্স কলেজ, ইউনিভার্সিটি অব ম্যানিটোবার রিসার্চ ফেলো ২০০৩ সাল থেকে বর্তমান। এছাড়াও কানাডার সাস্কাচুয়ান প্রদেশের মিনিষ্ট্রী অব জাষ্টিস এবং এটর্নী জেনারেল ২০১০ থেকে দেলোয়ার জাহিদকে ৫ বছরের জন্য নোটারী পাবলিক অব সাস্কাচুয়ান হিসাবে নিয়োগ দিয়েছেন । দীর্ঘ প্রবাস জীবনে জার্মান এবং স্পেনে মানবাধিকার ইস্যুতে গবেষনা, ও সাংবাদিকতায় প্রভূত অবদান রাখেন এবং বর্তমানে ইউরোপ থেকে কানাডায় এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন মুক্তিযোদ্ধা দেলোয়ার জাহিদ। রাজনীতি বিজ্ঞানে অধ্যাপনা, গবেষনা ও লেখালেখি ছাড়াও তিনি আইন এবং মানবাধিকার বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষন নেন। বিশ্বের অন্যতম কনফ্লিক্ট রেজুলিওশানের প্রফেসর ডঃ ডীন ই পীচি’র একজন সহযোগি গবেষক হিসাবে তিনি সালিস -রুরাল ম্যাডিয়েশনের উপর গবেষনা করেন। তিনি জন হাওয়ার্ড সোসাইটি অব ম্যানিটোবা’র বোর্ড অব ডিরেক্টরসের মেম্বার এবং ম্যানিটোবা সেন্টার ফর সোসাল এন্ড পীচ ষ্টাডিজ এর পরিচালক হিসাবে ও দায়িত্ব পালন করেন।

চিন্তার স্বাধীনতাঃ ধর্ম, মানবাধিকার ও সমসাময়িক রাজনীতি তার প্রথম নির্বাচিত প্রবন্ধ গ্রন্থ যা ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত হয়। মানবাধিকার বিষয়ে স্পেনীশ ভাষায় তার “একটি শুরুর যাত্রা” ই-বুক ২০০২ সালে স্পেন থেকে প্রকাশিত হয়। কানাডা সরকারের ইমিগ্রেশান ও রিফিউজি ইস্যুতে ইতিবাচক পরিবর্তন ও সংস্কার আনার জন্য তিনি ইমিগ্রেন্ট প্রফেশনালস অব ম্যানিটোবার সভাপতি নির্বাচিত হন (২০০৬-২০০৮) এবং দক্ষ পেশাদার ইমিগ্রেন্টদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিনিধিত্ব করেন। বাংলাদেশে মানবাধিকার বিষয়ে লিখনীতে শ্রেষ্ঠতার জন্য ১৯৯২ ও ১৯৯৫ সালে তিনি দুটি পুরস্কার লাভ করেন।

একজন যোদ্ধার জীবনে এ বৈচিত্র, সেবা ও শান্তির জন্য তার নিরন্তর লড়াই, এসব থেকে বর্তমান তরুন প্রজন্মের কি নেয়ার আছে? আমরা জানতে চেয়ে ছিলাম মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তার কিছু অভিব্যক্তি ও খোলা মনের কথা।

প্রশ্নঃ ষাটের দশকে একজন তরুন বা ছাত্র হিসাবে কিভাবে আপনি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন?

ষাটের দশকে অর্থনেতিক দাবী দাওয়া নিয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে তীব্র গণ-আন্দোলন দানা বেঁধে উঠেছিলো। সে আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিলো মূলতঃ ছাত্রসমাজ। মামা শহীদ নূরুর হক (নূরু) দ্বারা অনুপ্রানিত হয়ে আমি ও সে আন্দোলনে জড়িয়ে যাই যদি ও সেবা মূলক কাজে আমার আগ্রহ ছিলো প্রবল। নূরুর সান্নিধ্য আমাকে রাজনীতি সচেতন করে তোলে তবে রাজনৈতিক হিংস্রতা আমাকে কখনোই স্পর্শ করতে পারেনি। ’৬৯ এর ছাত্র আন্দোলন ও ’৭০ এর নির্বাচনে আমি ছাত্রলীগের একজন কর্মী হিসাবে কাজ করেছি। স্বাধীনতা যুদ্ধ আমার জীবনকে পাল্টে দেয়, পরিস্থিতি বাধ্য করে বন্দুক কাধে তুলে নিতে। প্রতিবাদ আর প্রতিরোধ থেকে যুদ্ধে অংশ নেয়া। একজন তরুনের জন্য এটা কত বড় একটা মনোস্তাত্তিক চাপ এবং এটা যে কতটা গভীর তা কেবল ভুক্তভোগীরাই জানেন।

প্রশ্নঃ তারুণ্যে স্বাধীনতার উপলব্ধি এবং ৪০ বছর পর সেই উপলব্ধিতে পার্থক্য কতটুকু

বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে একটি সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে কিন্তু স্বাধীনতার সূর্য ফসল আজো আমাদের ঘরে উঠে আসেনি। এসেছে শুধু ভৌগলিক স্বাধীনতা। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা আজো অর্জিত হয়নি। আজো হয়নি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার,হয়নি সন্ত্রাসমুক্ত অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়ার প্রচেষ্টাগুলোর সফল সমাপ্তি। এ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের বিশাল ইতিহাসের মুখোমুখি দাড়িয়ে আজো সত্যের অন্বেষায়।স্বাধীনতার সুর্য ফসল উঠেছে ’৭১ এর হায়েনা ও তার দোসরদের গোলায়। মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী শহীদ পরিবারগুলোর আজো অশ্রুসিক্ত, প্রতিনিয়ত তাদের বেদনাতুর মুখগুলো আমাদের চোখে ভাসে। পিতৃহারা সন্তানের,সন্তানহারা জননীর, স্বামীহারা বিধবার দূ:সহ ব্যথিত হৃদয়ের দীর্ঘশ্বাস আর নীরব, নি:শব্দ কান্নায় আজো এদেশের আকাশ বাতাস ভারী হয়ে আসে । ক্ষমতার পালা বদলে ওদের ভাগ্যের চাকা ঘুরেনি কখনো । সরকার বদল আর পট পরিবর্তনে শুধু প্রতিশ্রুতির পাল্লাই ভারী হয়েছে আর কিছু সুবিধাবাদী লুটে নিয়েছে এসকল সুবিধা। ৪০ বছরে শোষণ আর বঞ্চনার শিকার প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের মূল্যায়ন করতে হবে। শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের মৃত্যু’র পর ২১বার তোপধ্বনির মতো লোক দেখানো সন্মান নয় বরং বেচে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের মূল্যায়ন ও যথাযোগ্য সন্মান দিতে হবে। তাদের চার পার্শ্বে সামাজিক বঞ্চনার যে দেয়াল গড়ে উঠেছে তাকে ভেঙ্গে দিতে হবে। দেশে শান্তি, সমৃদ্ধি ও অগ্রগতির জন্য শিক্ষা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে।

প্রশ্নঃ মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধ, দূর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন এবং দেশের সার্বিক উন্নয়নে আমাদের কি করা উচিত বলে আপনি মনে করেন ?

আমার মতে মূল্যবোধ হলো নিয়ম, নীতি যা দ্বারা আমরা ভালমন্দ, ন্যায়, অন্যায় এর বিচার বিশ্লষণ করে থাকি। মূল্যবোধ এর নৈতিক ধারনাকে উপস্থাপন বা প্রতিফলিত করে। মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয় লাভের পর স্বাধীনতার মূল্যবোধগুলোকে আমরা কতটা সন্মান দেখিয়েছি? কতটা নৈতিকতা বা নিষ্ঠা নিয়ে আমরা বিধ্বস্ত দেশকে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছি এ প্রশ্ন আমরা একে অপরকে নয় বরং নিজকেই করতে হবে। বিজয় শুধু আনন্দে উদ্বেলিত হবার নয় । আমরা আমাদের বিশাল দায়িত্বকে অবজ্ঞা, অবহেলা ও পদদলিত করেছি। এটাই মানুষের আত্মকেন্দ্রিক ও দূর্নীতিগ্রস্ত হবার মূল কারন। মানুষের দেশপ্রেম এক্সপোর্ট বা ইম্পোর্ট করার বিষয় নয় এটা হলো আত্মোপলব্ধির ব্যাপার। দূর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনে যা করণীয় তা হলো দেশকে ভালবাসার স্পিরিট বা চেতনাকে শিশু, কিশোর, তরুন ও যুবকদের মধ্যে জাগিয়ে তোলা । এর জন্য আমাদের সার্বিকভাবে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন করতে হবে।

প্রশ্নঃ বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তর করতে সরকারের কি ভূমিকা গ্রহন করা উচিত এবং এ ব্যাপারে দেশবাসীরই বা কি করণীয়?

চার দশক পূর্বে একটি রক্তস্নাত মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে জাতির জন্ম, সে জাতি সঠিক দিকনির্দেশনা ও নেতৃত্ব পেলে সারা বিশ্বের বুকে মাথা উচু করে দাড়াতে পারবে। কেবল ৯ মাসে স্বাধীনতা লাভই আমাদের একমাত্র অর্জন নয়, বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় আমাদের রয়েছে অনেক গৌরবগাথা। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া প্রবাসে বাঙ্গালীদের সফলতা ও অর্জন অনেক, যা নাকি কোন কোন দেশের নাগরিকদের জন্য কখনো কখনো হয়ে উঠে ঈর্ষণীয়। আমাদের দেশের জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তর করতে প্রধান কাজ হলো শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা এবং কাজ সম্পর্কে মানুষের উপনিবেশিক ও প্রচলিত মানষিকতা এবং মূল্যবোধগুলোকে পাল্টে দেয়া। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষাকে স্থানীয় পর্যায়ে বিস্তৃত করা এবং মৎস্য, কৃষিকাজ সহ একটি পেশা তালিকা করে এগুলোকে শিক্ষা ও প্রশিক্ষনের আওতায় নিয়ে আসা। গণমাধ্যমের বদৌলতে প্রবাসে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও অভিবাসন সম্পর্কে মানুষ এখন অনেক উদ্যোগী ও সচেতন। বিশ্বায়নের এ যুগে প্রতিযোগিতামূলক শ্রম বাজারে আমাদের টিকে থাকতে হলে জনশক্তিকে সেভাবে প্রস্তুত হতে হবে।

প্রশ্নঃ একজন প্রবাসী মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে আপনি বা আপনার সহযোদ্ধারা কি ভূমিকা রাখতে পারেন?

বহু ত্যাগ তিতিক্ষার বিনিময়ে অর্জিত এ স্বাধীনতার সূর্য্যফসল প্রতিটি বাঙ্গালী’র প্রাপ্য, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সঠিকভাবে রক্ষিত হবে, মুক্তিযোদ্ধারা যথাযোগ্য মর্যাদা পাবে, মানুষ পাবে তার অধিকার- তথা মানবাধিকার, এটাতো করো কাছেই মুক্তিযোদ্ধাদের দাবি হওয়া উচিত নয় বরং মানুষ এখনো দাবি জানাবে তাদেরই কাছে। কারন মুক্তির জন্য ছিলো যে যুদ্ধ সে যুদ্ধ কি শেষ হয়ছে? আমার মতে মুক্তিযুদ্ধে পূর্ণ বিজয় আজো অর্জিত হয়নি। আজো শোষন, বঞ্চনা দুঃখ দারিদ্রে জর্জরিত দেশের কোটি কোটি মানুষ। অবশ্যই মুক্তিযোদ্ধাদের নৈতিক দায়বদ্ধতা রয়েছে এসকল মানুষের জন্য। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে আমাদের ইস্পাতকঠিন ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তথাকথিত প্রতিক্রিয়াশীল স্বৈরশাসক গোষ্টী অতীতে ধারাবাহিকভাবে ও অত্যন্ত সুকৌশলে মুক্তিযোদ্ধাদের মূল চেতনাগুলোকে ধ্বংস বা বিতর্কিত করার চেষ্টা করেছে। কোন কোন ক্ষেত্রে ওরা সফল ও হয়েছে । কারন দূর্ভাগ্য বশতঃ মুক্তিযোদ্ধারা ঐক্যবদ্ধ থাকতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং কোন কোন ক্ষেত্রে তাদের এককে অপরের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে। আমরা আমাদের স্বস্ব অবস্থান থেকে দেশের দারিদ্রপীড়িত মানুষের জন্য এখনো কাজ করতে পারি। আমাদের মাঝে যে দূরত্ব ও আস্থার সংকট রয়েছে একে দূর করতে হবে।

প্রশ্নঃ বিজয় লাভের চার দশক পর একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে জাতির কাছে আপনার প্রত্যাশা কি?

উপেক্ষিত-অবহেলিত বাঙলার সাড়ে সাত কোটি মানুষকে আমরা মুক্তিযোদ্ধারা ’৭১ এ লড়াই করে হায়েনার কবল মুক্ত করেছিলাম, এ আনন্দ ছিলো শৃংখল মুক্তির। এ আনন্দের মাঝে লুকিয়ে রয়েছে বিপুল রক্তের ঋণ ও ত্যাগের মহিমা। একদিকে যেমন গৌরব ও গর্ব হয় যে আমরাই জাতিকে হানাদার মুক্ত করে ছিলাম অন্য দিকে নিজকে অপরাধী ও ব্যর্থ মনে হয়, কারন আমরা মানুষকে তাদের প্রকৃত মুক্তির স্বাদ আজো দিতে পারিনি। মুক্তিযুদ্ধ শুধুমাত্র একটি ভূখন্ড দখলের লড়াই ছিলো না। বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান ও কারাগার অভ্যন্তরে জাতীয় চার নেতার হত্যা সহ বহু মুক্তিযোদ্ধার ফাসি ও আত্মবলিদান আমাদের বিজয় ও অর্জনগুলোকে শুধুই ম্লান ও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। যে দেশে খুন, হত্যা ও অপরাধের রাষ্ট্রীয় দায়মুক্তি মিলে সেটা কি কোন দেশ বা জাতির অহংকার? না কি লজ্জার? কোন রাজনৈতিক মতাদর্শের কারনে নয় বরং গত ৪০ বছরে আমরা মুক্তিযোদ্ধারা মানুষকে স্বাধীনতার সে সুফলগুলোর প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে পারিনি, প্রকৃত মুক্তির স্বাদ ও দিতে পারিনি। মুক্তিযোদ্ধের চেতনায় আমাদের বর্তমান প্রজন্মকে উজ্জীবিত করতে হবে। এ প্রজন্মের তরুন, যুবক/যুবতীরাই মুক্তিযুদ্ধের অসম্পন্ন কাজগুলো সম্পন্ন করে চূড়ান্ত বিজয়ের লক্ষ্যে আমাদের পৌছে দিবে, আমরা সে সময়েরই প্রতীক্ষায়। ৪০ বছর পর যুথবদ্ধ হয়ে আবারো কাধে কাধ মিলিয়ে আমার যুদ্ধ করার অঙ্গীকার। এ যুদ্ধে বন্দুক আর গোলাবারুদ নয়- চাই কলম, চাই ক্ষুধা, দুঃখ, দারিদ্রের বিরুদ্ধে লড়তে শান্তি ও মানবতার শিক্ষা ও প্রশিক্ষন। সে যুদ্ধ জয়ের স্বপ্ন ও প্রত্যাশায় রয়েছি আমরা কজন মুক্তিযোদ্ধা।

Check Also

সাক্ষাতকার : আল মাহমুদ

পান্থ বিহোস : সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় সাম্প্রতিক লিটলম্যাগগুলোর কার্যক্রম এবং প্রভাব সম্পর্কে বলুন। আল মাহমুদ ...

Leave a Reply