সরাইলে তিতাস নদীতে চুন বোঝাই ট্রলার ডুবি ॥ নিখোঁজ-১

অবৈধ কারখানায় উৎপাদিত চুন যাচ্ছে পুলিশ ফাঁড়ির ওপর দিয়েই

আরিফুল ইসলাম সুমন, সরাইল :

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে তিতাস নদীতে চুন বোঝাই ট্রলার ও মাটি বোঝাই নৌকার মুখোমুখি সংঘর্ষে ৩ শত ৭৫ বস্তা চুন নিয়ে ট্রলার ডুবে যায়। এতে ট্রলারের ৬ শ্রমিক আহত ও এক শিশু শ্রমিক নিখোঁজ রয়েছে। গতকাল রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত নিখোঁজ শ্রমিকের সন্ধান মেলেনি। শনিবার রাত ৮টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। নিখোঁজ শ্রমিকের নাম হাকিম মিয়া (১৫)। সে সদর উপজেলার মজলিশপুর ইউনিয়নের আনন্দপুর গ্রামের মৃত সমুজ আলীর পুত্র। স্থানীয় লোকদের ধারণা শিশু শ্রমিকটি আর বেঁচে নেই। স্বজনরা তিতাস নদীতে লাশের সন্ধান করছে।

এলাকাবাসী জানান, শনিবার রাতে মজলিশপুরের বাকাইল থেকে অতিরিক্ত চুন বোঝাই একটি ইঞ্জিন চালিত ট্রলার সরাইল উপজেলার শাহবাজপুরের পুলিশ ফাঁড়ির ঘাটে যাওয়ার পথে মৌলভীপাড়া এলাকায় পৌঁছলে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি মাটি বোঝাই নৌকার সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষে চুন বোঝাই ট্রলারটি ডুবে যায়। এসময় ট্রলারের মাঝিসহ ১৬ শ্রমিকের মধ্যে ১৫ জন লোক সাঁতরে তীরে উঠতে সক্ষম হয়। এদের মধ্যে ৬জন শ্রমিক আহত হয় ও শিশু হাকিম নিখোঁজ হয়। আহতরা স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নেয়। স্থানীয় লোকজন জানান, তিতাস নদীর তীরবর্তী বাকাইল গ্রামে কোনো অনুমোদন ছাড়াই ৩০/৩৫টি অবৈধ চুন উৎপাদন কারখানা গড়ে উঠেছে। এসব কারখানায় স্থানীয় গ্যাস কোম্পানির কূপ থেকে লিকেজ হয়ে বেরিয়ে আসা গ্যাস ব্যবহৃত হচ্ছে। গ্রামের লোকজনও মাটির নিচ থেকে নিগৃহীত গ্যাসে রান্না-বান্নার কাজ করছেন। কারখানার মালিকরা সংশ্লিষ্ট সকলকে ম্যানেজ করেই অবৈধভাবে এ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিদিন ওই কারখানাগুলোর উৎপাদিত হাজার হাজার বস্তা চুন ট্রলারে করে নদী পথে এনে শাহবাজপুর পুলিশ ফাঁড়ির ঘাটে রাখা হয়। সেখান থেকে ট্্রাকে করে এসব চুনের বস্তাগুলো দেশের বিভিন্ন স্থানে নেয়া হয়।

ডুবে যাওয়া ট্রলার মাঝি মো. বাচ্চু মিয়া জানান, ট্্রলারে ৩৭৫ বস্তা চুন ও চুনা পাউডার ছিল। ট্রলারে বাতির আলো কম থাকায় রাতের আঁধারে সামনের নৌকাটি দেখা যায়নি। ডুবে যাওয়া মালের মালিক নারায়নগঞ্জ জেলার আনোয়ার হোসেন জানান, বাকাইল এলাকার মেসার্স স্টার লাইমস ও বাংলাদেশ কেমিকেলস নামে দুই চুন কারখানা থেকে ৩৭৫ বস্তা চুন ও চুনা পাউডার ক্রয় করি। প্রতি বস্তায় ৪০/৫০ কেজি চুন রয়েছে।

শনিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে তিতাস নদীর পাড়ে শাহবাজপুর পুলিশ ফাঁড়ির ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, স্টার লাইমস চুন কারখানার বস্তা ভর্তি চুন ট্্রাকে তোলা হচ্ছে। ঘাটে আরো তিনটি ট্্রাক অপেক্ষা করছে। ট্্রাক চালক কিছুই বলতে নারাজ। শুধু এটুকু জানান, চুনের বস্তাগুলো ঢাকার সদরঘাটে যাবে। ঘাট এলাকার মেসার্স মায়ের দোয়া ষ্টীল-এর সত্বাধিকারী শাহবাজপুর গ্রামের মো. রফিক মিয়া জানান, এই ঘাট থেকে প্রতিদিন ১০/১২টি ট্্রাকে করে চুন নেয়া হয়। মালবোঝাই ট্্রাকগুলো পুলিশ ফাঁড়ির ওপর দিয়ে যায়। প্রতি ট্্রাক থেকে পুলিশ ৩শ’ টাকা আদায় করেন। ঘাটেই কথা হয় বাকাইল এলাকার শাপলা চুন কারখানার ম্যানেজার মো. শামীম মিয়ার সঙ্গে। তিনি জানান, কারখানায় ব্যবহৃত গ্যাসের বিল দিতে হয় না। শুধু পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি মাসে ৬০ হাজার টাকা দিতে হয়। ঘাট ব্যবহারের জন্য সকল কারখানা থেকে সরাইল থানাপুলিশকে প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা দিতে হয়। ফাঁড়ির পুলিশ ট্্রাক প্রতি ৩ শত টাকা নেন। এ টাকা সংশ্লিষ্ট চুন কারখানা পরিশোধ করে থাকেন। এ বিষয়ে জানতে শাহবাজপুর পুলিশ ফাঁড়িতে গেলে ফাঁড়ির ইনচার্জ (এস আই) আবুল হাশেম জানান, চুন ভর্তি ট্্রাক প্রতিদিনই যাচ্ছে। এগুলো বৈধ না অবৈধ তা আমার জানা নেই। আমি এই ফাঁড়িতে নতুন এসেছি। টাকা নেয়ার বিষয়টি অমি জানি না।

এ ব্যাপারে সরাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ গিয়াস উদ্দিন বলেন, আমরা এক শিশু নিখোঁজ হওয়ার কথা শুনলেও তার লাশ পাওয়া যায়নি। মালবোঝাই ট্্রলারটি উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। টাকা লেনদেনের বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা। সরাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু সাফায়াত মো. শাহেদুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি আমি জেনে ওসি সাহেবকে জরুরি ব্যবস্থা নিতে বলেছি।

Check Also

আশুগঞ্জে সাজাপ্রাপ্ত আসামির মরদেহ উদ্ধার

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি :– ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে মো. হারুন মিয়া (৪৫) নামে দুই বছরের সাজাপ্রাপ্ত এক আসামির ...

Leave a Reply