কুমিল্লার বিজয়পুরে মানুষ বিক্রির হাট জমজমাট

জামাল উদ্দিন স্বপন:

কুমিল্লা জেলার সদর দক্ষিণ মানুষ বিক্রির হাট বিজয়পুর এখন জমজমাট হয়ে উঠেছে। ধানকাটা শুরু হলেই এখানে শ্রমিক ও ক্রেতাদের ভিড় জমে ওঠে। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। ঢাকা-লাকসাম-নোয়াখালী সড়কের পাশে কুমিল্লার বিজয়পুর বাজার। বর্তমানে বিজয়পুর বাজার মানুষ বিক্রির হাট নামে সবার কাছে পরিচিত। অভাবি মানুষরা নিজেদের শ্রম বিক্রি করতে এ হাটে জড়ো হন। ৪০ বছর ধরে এখানে ভিড় করছেন কাজের সন্ধানে আসা মৌসুমী শ্রমিকরা। ধানকাটা, জমি চাষসহ নানা কাজে শ্রমিকদের দরদাম করে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কাজ করতে শর্তসাপেক্ষে কিনে নেন জমির মালিক ক্রেতা-গৃহস্থরা। স্বাধীনতার পর থেকে রংপুর, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট অঞ্চল থেকে অভাবি মানুষরা ছুটে আসেন এ হাটে। দাঁড়িয়ে থাকেন ক্রেতার (গৃহস্থের) আশায়। সপ্তাহে তিনদিন এখানে হাট বসে। সারাবছরই এ হাটে চলে শ্রম বিকিকিনি। তবে ধানকাটা ইরি-বোরো রোপা মৌসুমের সময় বেচাকেনার ধুম পড়ে যায়। ৪ জন, ৮জন, ১০ জনের গ্রুপে ভাগ হয়ে দল বেঁধে জড়ো হন শ্রমিকরা। দামাদামি হয়, দরকষাকষি হয় সবকিছু ঠিকঠাক হলে ক্রেতার সঙ্গে তারা চলে যান।

বাজারে ক্রেতার সংখ্যা বাড়লে শ্রমের দাম বেড়ে যায়। কথা হয় কাজের সন্ধানে আসা দিনাজপুরের দুলাল, লালমনিরহাটের আবু তালেব, কুড়িগ্রামের জাহাঙ্গীর আলমসহ বেশ কয়েকজন শ্রমিকের সঙ্গে। তারা এসেছেন পেটের দায়ে নিজেদের শ্রম বিক্রিতে। শ্রমিকরা আরও জানান, এলাকায় কাজকর্ম নেই, অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাতে হয় পরিবার-পরিজন নিয়ে। ক্ষুধার তাড়নায় প্রিয় গ্রাম, পরিবার-পরিজন ছেড়ে অন্য জায়গায় কাজ খুঁজতে হয়। থাকতে হয় ক্রেতার বাড়িতে। গৃহস্থ বাড়িতে তিন বেলা খাবার জোটে। প্রতিদিন ১৫০ টাকা করে পারিশ্রমিক জোটে। নুর আলম রংপুরের মানুষ। কয়েক বছর হলো তিনি আসেন এ হাটে। ধানকাটার মৌসুমে। মৌসুম শেষে বাড়ি ফেরেন। প্রতি মৌসুমে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা বাড়িতে পাঠাতে পারেন। শাহ আলমসহ আরও কয়েকজন জানান, দু’দিন হলো এখানে এসেছেন। সঙ্গে আরও ৫০ জন। কোনোমতে যাতায়াত খরচ জোগাড় করে এসেছেন তারা। কপাল মন্দ হাট ধরতে পারেননি। শনি, সোম আর বুধবারে হাট বসে শুধু। তাদের টাকা-পয়সা শেষ। বাজারের পাশে মসজিদে আশ্রয নিয়েছেন। মুড়ি-চিড়া খেয়ে কোনোমতে বেঁচে আছেন। এইচএসসি পাস রুবেলের সঙ্গে কথা হয়। ২০ দিন আগে হাটের দিন এসেছিলেন রুবেলসহ ৫ জন। প্রথম দিনেই লাকসামের এক লোক তাদের কিনে নেন। প্রতিদিন ১৫০ টাকাসহ তিন বেলা খাবার পাচ্ছেন তারা। তবে খাটতে হয় সকাল থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত। দিনের বেলায় মাঠে ধান কাটেন। লাকসাম, মনোহরগঞ্জ, সদর দক্ষিণ, হাজীগঞ্জ, কচুয়া, নাঙ্গলকোট এলাকা থেকে হাটে আসা ক্রেতাদের সঙ্গেও কথা হয়। কথা বলার সময় একজন কেঁদে ওঠেন। পেটের দায়ে শ্রম বিক্রি করতে সকালে হাটে আসেন। এভাবে কুমিল্লার বিজয়পুর বাজার এখন মানুষ বিক্রির হাট জমজমাট হয়ে উঠেছে।

Check Also

দেবিদ্বারে অগ্নিকান্ডে ১কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি

দেবিদ্বার প্রতিনিধিঃ– কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার ফতেহাবাদ ইউনিয়নের জগন্নাথপুর গ্রামে রান্না ঘরের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরনে ১৫টি ...

Leave a Reply