সরাইলে জনবসতি এলাকায় ইট তৈরীর ধুম : ’রক্ত দিব তবুও ইটভাটার কাজে কৃষি জমি দিমু না‘

আরিফুল ইসলাম সুমন, সরাইল :

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার কালীকচ্ছ ইউনিয়নের ধর্মতীর্থ গ্রামে জনবসতি এলাকায় ক’জন প্রভাবশালী ব্যক্তি গড়ে তুলছেন ‘রুপালী ব্রিকস্’ নামে একটি ইটভাটা। এ জন্য তারা তিন ফসলি প্রায় নয় একর কৃষি জমি স্থানীয় কতিপয় লোকের কাছ থেকে ভাড়ায় নিয়েছেন। চার গ্রামের অতিসন্নিকটে এই ইটভাটার তিন দিকে রয়েছে শতাধিক একর ফসলি জমি। রুপালী ব্রিকস্ নামে ওই ইটভাটার বৈধ কোনো কাগজপত্র নেই। পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো অনুমতিও তারা নেয়নি। ইটভাটায় চিমনি তৈরী ও চুলা প্রস্তুতের আগেই ইট তৈরীর কাজ শুরু করে দিয়েছেন। ইটভাটায় যানবাহন চলাচলের সুবিধার্থে স্থানীয় বেশকিছু কৃষকের জমির ওপর দিয়ে তারা জোরপূর্বক সড়ক নির্মাণ করে যাচ্ছেন। এলাকার তিন শতাধিক কৃষকের আকুতি-মিনতি ও তাদের কোনো বাঁধাকেই পাত্তা দিচ্ছেন না প্রভাবশালীরা। উল্টো নিরীহ কৃষকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে হয়রানি করে আসছেন। শেষ পর্যন্ত এই অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছেন গ্রামবাসী। বিষয়টিকে কেন্দ্র করে গত সোমবার দু’গ্রামবাসীর মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। এতে পুলিশসহ অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হয়। মঙ্গলবার কালীকচ্ছ ইউনিয়নের পাঁচ গ্রামের প্রায় তিন শতাধিক কৃষক-কৃষানী ক্ষোভের সাথে বলেন, ‘প্রয়োজনে শরীরের রক্ত দিব, তবুও ইটভাটার কাজে কৃষি জমি দিমু না’।

সরেজমিনে জানা যায়, রুপালী ব্রিকস্ নামে ওই ইটভাটাটি উপজেলার কালীকচ্ছ ইউনিয়নের চাকসার, বিলের পাড়, দৌলতপাড়া, দীঘিরপাড় ও মুলবর্গ এই পাঁচ গ্রামের প্রায় ছয় সহস্্রাধিক মানুষের চরম দুঃখ-দুর্দশা ও হাজারো সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইটভাটার মালিক পাঁচ ব্যক্তি। তারা হলেন-সদর উপজেলার সুহিলপুরের মো. খসরু মোল্লা, সফিকুল ইসলাম মুন্সি, মমিন ভূইঁয়া, সরাইল নোয়াগাঁও গ্রামের সফিক মিয়া ও টিটু মুন্সি। মঙ্গলবার ইটভাটা প্রসঙ্গে খসরু মোল্লা ও সফিকুল ইসলাম মুন্সি জানান, রুপালী ব্রিকস্ নামে ওই ইটভাটার কোনো বৈধ কাগজপত্র তাদের কাছে নেই। তারা অনুমোদন পাওয়ার জন্য আবেদন করেছেন মাত্র। সবকিছুই প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এরই মধ্যে ইটভাটা তৈরীতে প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয় করে ফেলেছেন। তারা দাবি করেছেন সেখানে পরিবেশ বান্ধব অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হবে। কৃষকদের জমির উপর দিয়ে ইটভাটার সড়ক নির্মাণের বিষয়ে তারা জানান, শুনেছি এখানে রেকর্ডভূক্ত একটি সড়ক রয়েছে। এলাকার কিছু লোককে ম্যানেজ করেই আমরা সড়কটি নির্মাণ করছি। জনবসতি এলাকায় ইটভাটা করার নিয়ম আছে কি না ? এমন প্রশ্নের জবাবে মালিকপক্ষ জানান, সবকিছু পরিবেশ বান্ধব হলে কোনো নিয়মের বাঁধা নিষেধ নেই।

মঙ্গলবার দুপুরে ইটভাটায় গিয়ে দেখা যায়, ইট পোড়ানোর জন্য চুলা নির্মাণের কাজ শেষ। চিমনি নির্মাণের কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে। ইটভাটার মাঠের উত্তর ও পশ্চিম পাশে পুড়ানোর জন্য সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়েছে প্রচুর পরিমাণের দুই ধরনের কাঁচা ইট। কিছু কাঁচা ইটের গায়ে রুপালী (বাংলায়) এবং বাকিগুলোর গায়ে আর বি সি (ইংরেজীতে) লেখা রয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইটভাটায় আড়াই শত শ্রমিক ইট তৈরীর কাজ করছে। ইট তৈরীর কারিগর সুহিলপুর গ্রামের লিটন মোল্লা, আব্দুল খালেকসহ একাধিক শ্রমিক জানান, গত আড়াই মাস যাবত এই ইটভাটায় আড়াই শত শ্রমিক কাজ করছে। এরই মধ্যে প্রায় দুই লাখ ইট বানানো হয়েছে। চুলায় আগুন দেয়ার পর এইসব ইট পোড়ানো হবে। ওই ইটভাটার চিমনির নির্মাণ শ্রমিক ধর্মতীর্থ গ্রামের ইয়াকুব হোসেন জানান, নির্মাণাধীন চিমনিটির উচ্চতা মাত্র ৭৫ ফুট।

ইটভাটা সংলগ্ন ধর্মতীর্থ বিলেরপাড় গ্রামের হাসেনা বেগম জানান, বসতবাড়ি সংলগ্ন শ্রমিকদের টয়লেট নির্মাণ করা হয়েছে। এতে বাড়ি-ঘরের নারীদের চলাফেরায় অসুবিধা হচ্ছে। শ্রমিকরা যুবতি নারী দেখলেই কটুক্তি করে। ট্্রাক চলাচল করার কারণে উড়ন্ত ধূলায় ছেঁয়ে যায় বাড়ি-ঘর। এতে বাড়ির শিশুসহ অন্যান্যরা নানা রোগব্যধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। গ্রামের শিরিনা বেগম, জেসমিন বেগমসহ ২০/২৫ জন কৃষানী ক্ষোভের সাথে জানান, ইটভাটায় চুলায় আগুন দেয়ার আগেই যেই পরিমাণ ধুলা-বালু উড়ে ঘর-বাড়ি ও ফসলি জমিতে পড়ছে, তাতেই আমাদের চরম ক্ষতি ও দুর্দশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা সর্বনাশা এই ইটভাটার বিরুদ্ধে রুঁেখ দাঁড়াবো। একই গ্রামের আব্দুর রহমান, মাইদুল ইসলামসহ একাধিক কৃষক জানান, ধুলার কারণে ফসলি জমি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমাদের কৃষি জমির ওপর দিয়ে জোরপূর্বক তারা সড়ক নির্মাণ করে যাচ্ছে। জীবন থাকতে ইটভাটার জন্য কৃষি জমি দিব না। দিঘিরপাড় গ্রামের জামাল মিয়া জানান, ষাট বছর বয়সেও কখনো শুনি নাই এখানে রেকর্ডভূক্ত সড়ক আছে। তারা অর্থের লোভ দেখিয়ে কিছু লোকের জায়গা ভাড়া নিয়ে ইটভাটা তৈরী করছেন। এতে এলাকার সাধারণ কৃষকদের চরম ক্ষতি হবে। গ্রামের জিল্লুর রহমান, পাশা মিয়া, বাচ্চু মিয়া, আরিজ মিয়া, ইউসুফ মিয়াসহ দুই শতাধিক কৃষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের বাপ-দাদার পৈত্তিক সম্পত্তি কৃষি জমির ওপর দিয়ে সড়ক নির্মাণ করতে দেয়া হবে না। শরীর থেকে রক্ত ঝরিয়ে হলেও আমরা তা প্রতিহত করব। এখানে ইটভাটা মানে আমাদের সর্বনাশ। আশপাশের শত শত একর জমির ফসল নষ্ট হবে। ধর্মতীর্থ গ্রামের মো. জজ মিয়া জানান, জনবসতি এলাকায় এই ইটভাটার কারণে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হবে। কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এটা কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না। প্রয়োজনে কৃষকদের নিয়ে আন্দোলন করব। তবুও এখানে ইটভাটা করতে দেয়া হবে না।

এ ব্যাপারে কালীকচ্ছ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. তকদীর হোসেন বলেন, ইচ্ছে থাকলেও বিভিন্ন কারণে অনেক কিছুই বলতে পারছি না। তবে আমি এলাকাবাসীর বিপক্ষে নয়।

কালীকচ্ছ ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা মো. সোহরাব হোসেন বলেন, রুপালী ব্রিকস্-এর বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না। বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই ইটভাটাটি কিভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন, এটা তারাই ভাল জানেন। হাওরের ওই এলাকায় রেকর্ডভূক্ত সড়ক আছে কি না তা আমার জানা নেই।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু সাফায়াত মো. শাহেদুল ইসলাম বলেন, অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। রুপালী ব্রিকস্ এর বিষয়ে আমার জানা নেই।

Check Also

আশুগঞ্জে সাজাপ্রাপ্ত আসামির মরদেহ উদ্ধার

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি :– ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে মো. হারুন মিয়া (৪৫) নামে দুই বছরের সাজাপ্রাপ্ত এক আসামির ...

Leave a Reply