চৌদ্দগ্রামে গৃহবধুকে পুড়িয়ে হত্যার অভিযোগ ॥ স্বামী-শ্বাশুড়িসহ পরিবারের লোকজন পলাতক

জামাল উদ্দিন স্বপন:

এবার দাবীকৃত যৌতুকের টাকা ও মালামাল পরিশোধ করতে না পারায় শিরিনা আক্তার নামের এক গৃহবধুকে নির্যাতন শেষে হত্যার উদ্দ্যেশ্যে আগুন ধরিয়ে দেয় পাষন্ড স্বামী ও শ্বাশুড়ি। গত শনিবার রাতে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের উজিরপুর ইউনিয়নের চাঁন্দশ্রী চেয়ারম্যান বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। গতকাল রোববার সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অগ্নিদগ্ধ ওই গৃহবধুর মৃত্যু হয়। ঘটনার পর থেকে স্বামী-শ্বাশুড়িসহ পরিবারের লোকজন পালিয়ে গেছে।

এলাকাবাসী সুত্রে জানা গেছে, উপজেলার উজিরপুর ইউনিয়নের মিয়াবাজার এলাকার চাঁন্দশ্রী গ্রামের মৃত সৈয়দ আহমদের ছেলে সৌদি প্রবাসী খোরশেদ আলম সুমনের সাথে আড়াই লাখ টাকা দেনমোহরে পাশ্ববর্তী ঘোলপাশা ইউনিয়নের সৈয়দপুর গ্রামের আবদুল মতিনের মেয়ে শিরিনা আক্তারের বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকে স্বামী সুমন, শ্বাশুড়ি মনোয়ারা বেগম ও ননদ রেহানাসহ পরিবারের লোকজন শিরিনাকে বাবার বাড়ি থেকে ফ্রিজ, টিভি, ফার্ণিচার ও বিভিন্ন জিনিসপত্রসহ যৌতুক হিসেবে মোটা অংকের টাকা দাবী করে। এনিয়ে শিরিনাকে একাধিকবার বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেয় শ্বাশুড়ি। তার কৃষক বাবা দাবীকৃত সামগ্রী পরিশোধ না করায় দীর্ঘ ৭/৮ মাস যাবৎ তাকে বাবার বাড়িতেও যেতে দেয়া হয়নি। বিয়ের পর স্বামী সুমন বিদেশ গেলেও ২ মাস আগে সে আবার ফিরে আসে। বিদেশ থেকে আসার পর থেকেই শিরিনার উপর দাবীকৃত যৌতুকের জন্য চলে নানা প্রকার নির্যাতন। এক পর্যায়ে গত শনিবার রাত সাড়ে ৯টায় স্বামী সুমন ও শ্বাশুড়ি মনোয়ারাসহ পবিবারের লোকজন তাকে টয়লেটে আটকে রেখে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেয় এবং শিরিনা আত্মহত্যার জন্য নিজেই গায়ে আগুন লাগায় বলে প্রচার করতে থাকে। তার আত্মচিৎকার শুনে আশ-পাশের লোকজন এসে তাকে উদ্ধার করে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়। অবস্থা আশংকাজনক হওয়ায় রাতে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল রোববার সকালে তার মৃত্যু হয়।

গতকাল রোববার দুপুরে চাঁন্দশ্রী গ্রামে নিহত গৃহবধুর হত্যার ঘটনা জানতে সরেজমিনে গেলে সেখানে কাউকে পাওয়া যায়নি। তবে ঘরের বারান্দায় গৃহবধুর পোড়া চুল ও কাপড়ের অংশ বিশেষ পড়ে থাকতে দেখা গেছে। পাশ্ববর্তী ঘরের সুমনের চাচাতো ভাই আমিন উল্লাহ স্ত্রী রাশেদা জানান, মেয়েটি খুবই শান্ত প্রকৃতির ছিল। কিন্তু কখনো ঝগড়া বিবাদের কথা শুনিনি। কিভাবে মারা গেছে বলতে পারবো না। ওই বাড়ির বসবাসকারী একাধিক ঘরের লোকজনের সাথে কথা মেয়েটি কিভাবে মারা গেছে জানতে চাইলে তারা কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি। অগ্নিদগ্ধের খবর শুনে ছুটে আসা পাশ্ববর্তী বাড়ির ব্যবসায়ী আলী আশ্বব জানান, আমি নিজ থেকে টাকা দিয়ে মেয়েটিকে চিকিৎসা করতে দ্রুত হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করি। তার গায়ে কিভাবে আগুন লাগলো এ বিষয়ে তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজি হন নি।

নিহত গৃহবধুর বাবার বাড়ি সৈয়দপুরে গেলে বাবা আবদুল মতিন, মা ফাতেমা বেগম ও স্বজনদের আহাজারীতে এক হৃদয় বিধারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। তাদের দাবী যৌতুকের দাবীকৃত মালামাল ও টাকা না দেয়ায় শিরিনাকে দীর্ঘ ৭ মাস আটক রেখে বাবার বেড়াতে পর্যন্ত আসতে দেয়নি। স্বামী, শ্বাশুড়ি ও ননদ মিলে শিরিনার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন পুড়িয়ে হত্যা করে বলে তারা অভিযোগ করেন।

গৃহবধুর পারিবারিক সুত্রে জানা গেছে, শিরিনার লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে রয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে তার লাশ নিয়ে আসা হবে।

চৌদ্দগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কামরুল ইসলাম জানান, খবর পেয়ে এসআই অলক বড়–য়ার নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল পরিদর্শনে পাঠানো হয়েছে। মেয়ের পরিবার থেকে অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সন্ধ্যায় এরিপোর্ট লেখা পর্যন্ত মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলে জানা গেছে।

Check Also

চৌদ্দগ্রামে শেখ রাসেল জাতীয় শিশু কিশোর পরিষদের প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত

মোঃ বেলাল হোসাইন, চৌদ্দগ্রাম :– প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও মন্ত্রীপরিষদের প্রভাবশালী ব্যাক্তিবর্গকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ ছবি ...

Leave a Reply