কাজকে সম্মান করলে জাতি উন্নত হয়

মো. আলী আশরাফ খান :

মানুষকে কাজের মধ্যদিয়ে বড় হতে হয়-একথাটি আজ সর্বজনবিদিত। তারপরেও কথা থাকে, মানুষকে বড় হতে হলে কি করতে হয়? কিসে মানুষ বড় হয়? বড়’র সংজ্ঞা কি? দৈর্ঘ্য-প্রস্থ, মোটাতাজাই কি বড় হওয়ার মাপকাঠি? আর তা না হলে, আসলে মানুষ কিভাবে বড় হয়? আর নিজে বড় হলেই কি একে বড় বলা যায়, নাকি সামগ্রীকভাবে নিজ জনগোষ্ঠী তথা জাতিকে বড় করে গড়ে তোলার নাম বড় হওয়া? আর এই বড় হওয়ার পেছনে এমন কি মন্ত্র কিংবা রয়েছে তান্ত্রিকতা? আজ আমাদেরকে এসব বিষয়ে গভীরে গিয়ে ভাবতে হবে। একজন মানুষকে জ্ঞানে-ধ্যানে, চিন্তা-চেতনায়, মনে-শরীরে, যশ-খ্যাতিতে, প্রভাব-প্রতিপত্তি ও সার্বিক উন্নতি লাভে সর্বপ্রথম যে বিষয়টি অত্যাবশ্যক-সেটি হলো কাজ- কাজ ও কাজ। নিরলস কাজের ধারাবাহিকতায় জীবনে সব কিছু-ই অর্জন করা সম্ভব। যদিও আমরা বলে থাকি, সুস্থ চিন্তাচর্চা, সুস্থ দৃশ্যচর্চা, সুস্থ কর্মচর্চার মধ্যদিয়ে মানুষ বড় হয়ে ওঠে, আসলে এসবের মূলে লুকায়িত রয়েছে কাজ প্রকৃত কাজ। সুস্থ চিন্তাচর্চা কি কাজ নয়? আর তেমনি সুস্থ দৃশ্যচর্চা ও সুস্থ কর্মচর্চাও প্রকৃত কাজেরই মূল অংশ।

আমাদেরকে প্রথমেই বুঝতে হবে সুস্থতা, একাগ্রতা, বস্তুনিষ্ঠুতা ও কাজের প্রতি অগাধ ভালোবাসা ব্যতিত কোনো কাজই কাজ নয়। নীতি বর্হিভূত, বিবেক বর্জিত যতরকম কর্মকাণ্ড আমরা দৈনন্দিন জীবনে করে থাকি, এসব কখনই কাজের কোনো অংশ বলে পরিগণিত হতে পারে না। বরং তা অকাজ, অকাজ ও অকাজ হিসেবেই পৃথিবী সৃষ্টি হওয়ার পর থেকে মানুষ প্রমাণ পেয়ে আসছে। যে কাজে বিবেকের কাছে জবাবদিহিতা নেই, নেই প্রকৃত আত্মতৃপ্তি বা থাকবে না কোন সৃজনশীলতা তা আবার কাজ হয়ে কি করে? মানুষকে লম্বা একটা পথ পারি দিয়ে ভুল বোঝার চাইতে শুরুর পূর্বেই বুঝতে হবে কোনটা কাজ আর কোনটা অকাজ। কারণ, মানুষের জীবনটা অতো বড় নয় যে, মানুষ পুনঃ পুনঃ ভুল করে শুধরানোর যথেষ্ট সময় পাবে। আমাদের এমন ভাব্বার কোনে অবকাশ নেই-দেখি না কি হয় এ ভ্রান্ত কর্মমাঝে, আবার না হয় শুরু করবো অন্য কোনো পথে-অন্য কোন অকাজ দিয়ে। এভাবে এ ভ্রান্ত পক্রিয়ায় মূল্যবান সময় নষ্ট হবে, কাজের কাজ তেমন কিছুই হবেনা।

যে কোনো কাজ শুরু করার আগে আমাদের প্রত্যেকই সুর্নিদিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ঠিক করতে হবে। মনে রাখতে হবে পৃথিবীতে কোন কাজই হীন নয়। কোন কাজকে খাটো বা ছোট করে দেখার সুযোগ নেই কারো। আমি নিজ্ েযে কাজই করিনা কেনো, অপরের কোন কাজকে ছোট করে দেখা বা অবমূল্যায়ণ করা মানে নিজেরই মূর্খতার পরিচয়-তা বুঝতে হবে। কাজ যে কোনো কাজই হোক কাজকে সম্মান আমাকে করতেই হবে। আমাকে আরো একটু গভীরে গিয়ে ভাবতে হবে। গ্রামের শ্রমজীবী, কৃষিজীবী, কঠোর পরিশ্রমি এবং শহরের স্বল্প আয়ে জীবীকা নির্বাহকারী-যাদেরকে আমরা সাধারণ মানুষ হিসেবে দেখি, সাধারণ নয় অসাধারণ ভেবে মূল্যায়ণ করতে হবে তাদের। নিজের চেয়ে অপরের কাজ এবং ব্যক্তি হিসেবে যথাযথ সম্মান করতে ভুলে গেলে চলবে না। ভাবতে হবে, একজন রিক্সাচালক আমার চেয়ে অনেক দামি। কারণ, মাত্র দশ টাকার বিনিময়ে যিনি এতোটা পথ আমাকে বহন করেন, আমাকে কেউ যদি পাঁচ শ’ টাকা দেয় তাহলে এ কাজটি কি আমি করতে পারবো? এ কারণেই তার পেশা ও ব্যক্তিত্বকে সম্মান করতে হবে। সে যে পেশারই হোক, আমি যদি তাকে ও তার কাজকে সম্মান করি, ভদ্রচিত ব্যবহার করি তার সঙ্গে তবে সে তার কাজের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে, নিজেকে সমাজের একজন প্রয়োজনীয় ব্যক্তি হিসেবে গর্ব বোধ করবে। কাজের প্রতি অনিহা, নিজেকে নিয়ে হতাশ হবে না কখনো। এভাবে সব পেশার মানুষের সঙ্গে একটি নিবিড় সেতুবন্ধন তৈরি করতে হবে।

আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, কাজের কোনো ভাগাভাগি নেই। সংসার বলি অফিস বলি সকল কর্মক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কাজ ছাড়াও সামনে যে কাজ পড়বে তা সেরে ফেলতে হবে। আমাকে এমন ভাবলে চলবে না, এটা মেয়েদের কাজ, ওটা বয়-বেয়ারার কাজ, আমি কেনো এই কাজটি করবো। ঘর ঘোচানো, ঝাড় দেয়া, কাপড় কাঁচার মতো ছোটখাট কাজগুলোর অংশীদারিত্বে আন্তরিকতা অনেকাংশে বৃদ্ধি পায়, বাড়ে শ্রদ্ধা-ভক্তিও। এই অনুশীলনে যেমন নিজে বড়ো হওয়া যায় তেমনি অন্যরাও তা অনুসরণ-অনুকরণের মধ্যদিয়ে একটি সুন্দর অনিন্দ্য পরিবেশ তৈরি হয়। পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও সুশীতল আভায় ভরে ওঠে। নিজে বড় হতে এবং জাতীকে বড় করে গড়ে তুলতে এই নান্দনিক পদ্ধতির কোনো বিকল্প নেই।

-লেখক: মো. আলী আশরাফ খান

কবি, কলামিস্ট, প্রকন্ধকার ও সংগঠক

গৌরীপুর, দাউদকান্দি, কুমিল্লা।

Check Also

মিনি ওয়াক-ইন-সেন্টারের মাধ্যমে রবি’র গ্রাহক সেবা সম্প্রসারণ

ঢাকা :– গ্রাহক সেবাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে মোবাইলফোন অপারেটর রবি আজিয়াটা লিমিটেড সম্প্রতি মিনি ওয়াক ...

Leave a Reply