বাংলাদেশে গণতন্ত্র,মানবাধিকার ও উন্নয়নে গণমাধ্যমে’র ভূমিকা

দেলোয়ার জাহিদ :

দেলোয়ার জাহিদ
বাংলাদেশে গণতন্ত্র,মানবাধিকার ও উন্নয়নে গণমাধ্যমে’র ভূমিকা’র উপর আজকের এ মৌলিকপত্র। সমাজতত্ববিদরা হয়তো একে পৃথক পৃথক বিষয় বলে চিন্হিত করবেন, কিন্তু এগুলো মূলতঃ একই সূত্রে গাঁথা। যেখানে এ বিষয়গুলো’র সমন্বয় বা সন্মিলন ঘটে সেখানে আইনের শাসন বা “রুল অব ল” প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে ধরে নেয়া হয়। আইনের শাসনে আইন-ই সর্বোচ্চ। বর্তমানে গণমাধ্যম এবং এর নতুন ও সম্প্রসারিত ভূমিকায় রেডিও, টিভি, সংবাদপত্র, ও ইন্টারনেট এর সাথে যোগ হয়েছে মুঠোফোন। সামাজিক নেটওয়ার্কের এক বৈপ্লবিক যুগে আমরা পা রেখেছি। গণমাধ্যমে সেবা দান ও গ্রহন উভয় ক্ষেত্রেই কিছু প্রতিবন্ধকতা ও প্রতিযোগিতা এসেছে. দেশে’র ব্যাপক জনগোষ্টীর মধ্যে ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা সত্বেও মিডিয়া টেকনোলজি বিশেষতঃ ইন্টারনেট ও মুঠোফোন জনগনের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহনকে কিছুটা হলেও অগ্রগামী এবং উৎসাহব্যঞ্জক করে তুলেছে। তথ্য অধিকার, অগ্রাধিকার বাছাই, বিচক্ষণভাবে মতামত প্রদান এবং গ্রুপ মোবিলাইজশনের মতো কাজগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক দ্রুততার সাথে করা যাচ্ছে।

আইনের শাসন কায়েমে প্রয়োজন সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক সমতা প্রতিষ্ঠা। দারিদ্র ও বৈষম্য অবসানের নিরন্তর এ সংগ্রামে এদেশের গণমাধ্যম ও মানবাধিকার কর্মীরা নিরন্তর প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন। এ প্রচেষ্টায় সফলতার মাত্রা ও সম্ভাবনাকে বাড়াতে প্রয়োজন উপযুক্ত প্রশিক্ষন, প্রয়োজন সামাজিক ও রাজনৈতিক উদ্যোগ, প্রয়োজন যুগ উপযোগি শিক্ষা ও গণ সচেতনতা সৃষ্টি।

মানব ও তার অধিকার হলো মানবাধিকার। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে মাতৃভাষা ও অধিকার আন্দোলনের লড়াইয়ের মাধ্যমে। এ বিশ্বে যা নজিরবিহীন। সাড়ে ৭ কোটি মানুষ তাদের অধিকার বঞ্চনার প্রতিবাদে সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মাধ্যমে স্বাধীনতাকে ছিনিয়ে এনেছে। গণতন্ত্রের ভিত্তিমূলে দাড়িয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ আজ এক প্রতিষ্ঠিত সত্য। এদেশের নিকট অতীত ও সহিংস রাজনৈতিক ইতিহাস এক বেদনাবিধুর যন্ত্রনার ইতিহাস। প্রাসাদ ষড়যন্ত্র এবং নানাহ ঘটনা প্রবাহের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার প্রয়াস আজো খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলছে। এ অহিংস অভ্যুত্থান ও পালাবদলের নিরন্তর সংগ্রামে এদেশের কলম সৈনিকেরা প্রতিনিয়তই যুদ্ধ করে চলেছেন।

আমাদের জীবনযুদ্ধের বিশাল এই ক্যানভাসে রয়েছে কিছু কিছু ব্যর্থতা, সে সাথে খণ্ড খণ্ড কিছু সাফল্যের চিত্র। প্রতিটি গণতান্ত্রিক অধিকার আন্দোলনের মাঝে সুপ্ত রয়েছে মানবাধিকারের বীজ। মানুষের আশা, আকাঙ্খা, চাওয়া, পাওয়া কোন কিছুই তার অধিকারপুঞ্জের বাইরের নয়।

মূলতঃ সাইরাস দি গ্রেট এর সময়ে ৫৩৯ বিসিতে বেবিলন সিটি বিজয়ের পর দাস মুক্তি ও ধর্মাধিকারের ঘোষনার মাধ্যমে মানবাধিকারের গোড়া পত্তন।

রাজাকে আইনের আওতায় এনে ১২১৫ সালে ম্যাগনাকার্টা’র ঘোষনা মানবাধিকারের আরো এক স্বীকৃতি।
১৬২৮ সালে পিটিশন অব রাইটস এর মাধ্যমে- অধিকারের সুবিন্যাস,
১৭৮৯ সালে ফ্রান্সে, রাষ্ট্রের সকল নাগরিককে সম-অধিকারের স্বীকৃতি,
১৯৪৮ সালে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ভাবে অধিকার প্রতিস্ঠার ধারাবাহিকতায় জাতিসংঘের ৩০টি সর্বজনীন ঘোষনাপত্র পাশ ও প্রকাশ পেয়েছে।
সংক্ষিপ্তাকারে এগুলো হলোঃ
১-মানুষ জন্মগত ভাবে স্বাধীন ও সমান,
২-বৈষম্যহীনতা,
৩-জীবনধারনের অধিকার,
৪-দাসত্ব বিলোপ,
৫-নির্যাতন নিষিদ্ধ,
৬-যাতায়তের স্বাধীনতা,
৭-আইনের চোখে সমতা,
৮-মানবাধিকারকে আইন দ্বারা সংরক্ষন,
৯-অযৌক্তিক আটক নিষিদ্ধ,
১০-ট্রায়ালের অধিকার,
১১-দোষী সাব্যস্থ হওয়ার আগ পর্যন্ত নির্দোষ বিবেছনা,
১২-প্রাইভেসি’র অধিকার,
১৩-ভ্রমন বা মুভ করার স্বাধীন,
১৪-নিরাপদ স্থানে বসবাসের অধিকার,
১৫-জাতিসত্তার অধিকার,
১৬- বিবাহ ও পরিবারের অধিকার,
১৭-নিজ সম্পত্তিতে অধিকার,
১৮-চিন্তার স্বাধীনতা,
১৯-মত প্রকাশের স্বাধীনতা,
২০-সমাবেশে’র অধিকার,
২১-গণতন্ত্রের অধিকার,
২২-সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার,
২৩-শ্রম অধিকার,
২৪-খেলাধুলার অধিকার,
২৫-সকলের জন্য খাদ্য ও শেল্টারের অধিকার,
২৬-শিক্ষার অধিকার,
২৭-কপি রাইট অধিকার,

২৮- মুক্ত ও অবাধ বিশ্ব,
২৯-দায়িত্বশীলতা,
৩০-কেউ কাউকে অধিকার বঞ্চিত না করা,

জাতিসংঘ মানবাধিকারের ঘোষনাপত্রের সাথে স্যামন্জস্য রেখে প্রায় প্রত্যেকটি রাষ্ট্রের সংবিধানেই মৌলিক অধিকারের ধারাগুলো সন্নেবেশিত থাকে। বাংলাদেশের সংবিধানে ও তা’ই আছে।

১৯৭২ সালের ৪ঠা নবেম্বর এ সংবিধান পাশ হয়েছে এবং ১৬ ডিসেম্ভর ’৭২ থেকে তা কা্র্য্যকর হয়েছে।

বাংলাদেশের সংবিধানই হলো সর্ব্বোচ্চ আইন। জাতীয়তা, গনতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতার ভিত্তি’র উপর দাড়িয়ে এ সংবিধান। ২০১১ সাল অর্থাৎ বর্তমান সময় পর্যন্ত সংবিধানে মোট ১৪টি সংশোধনী এসেছে। এর মাধ্যমে কোন কোন ক্ষেত্রে সংবিধানের মূল চেতনার সাথে দ্বান্ধিক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিলো। উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনগুলোর মধ্যে-১৯৭৩ সালে গণহত্যা ও মানবতা’র বিরুদ্ধে অপরাধ সংগঠনের শাস্তি বিষয়ক সংশোধনী, ১৯৭৯ সালে সামরিক আইনের বৈধতা সংক্রান্ত ৫ম সংশোধনী, এবং ১৯৮৮ সালের ৭ই জুন ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করা বিষয়ক সংশোধনী।

রাষ্ট্রের আইন, প্রশাসন ও বিচার এই ৩ বিভাগের মধ্যে সমন্বয়তা, দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে পরিচালিত হয় সরকার।

বাংলাদেশের সংবিধানে ১১ ধারায় গণতন্ত্র, ১৭ ধারায় শিক্ষা এবং ১৮ থেকে ২৫ ধারায় মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে।

সংবিধানে ধর্মবিশ্বাসের উপর গুরুত্ব দেয়ার কারনে এ কথা এখানে প্রাসঙ্গিক যে মূলতঃ ইসলামী সংস্কৃতি গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের পরিপন্থী নয় যদি এর অপ-ব্যাখ্যা বা অপ-প্রয়োগ না হয়। ইসলামের আবিধানিক অর্থ হলো সৃষ্টিকর্তার কাছে আত্মসমর্পন, আর ইসলামী “আদাব” সংস্কৃতি হলো শান্তি কামনা, যা সারা বিশ্বে মুসলমানদের একমাত্র শুভেচ্ছার মাধ্যম। ইসলামী ব্যবস্থায় ও পরমত সহিষ্ণুতা এবং জবাবদিহিতার অনেক নজীর রয়েছে। হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত মোহাম্মেদ (সাঃ) এর উত্তরাধিকার হিসাবে দেয়া তার প্রথম ভাষনে বলেছিলেন –“যদি আমি সঠিক হই আমাকে সহায়তা করুন, ভ্রান্ত হই তবে আমাকে সংশোধন করুন, আর যদি আল্লাহ ও তার রাসুলকে অমান্য করি তবে আপনাদের মান্যতা দাবীর অধিকার আমার নেই”।

হযরত ওমর (রাঃ) মানবাধিকার ও ইসলামে গণতন্ত্রের উল্লেখযোগ্য নজীর স্থাপন করেছেন। তার সময়ে জেনারেল এ্যাসেম্বলী ও কমিটি সমূহ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও উন্নয়ন বিষয়ে কাজ করতো। সেখানে সর্বধর্মের লোকদের অংশগ্রহন ছিলো। শাসক হযরত ওমর (রাঃ) একজন সাধারন নাগরিকের মতোই তৎসময়ে একদা বিচার প্রার্থনা করেছিলেন যার দ্বারা আইনের চোখে সমতার এক উজ্বল দৃষ্টান্ত মিলে। মহাত্মা গান্ধী ভারতের জন্য হযরত ওমরের মতো একজন নীতি পরায়ন ও সংস্কারক শাসক কামনা করেছিলেন।

আজকের এ মৌলিকপত্রে আলোচ্য বিষয় হলো গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও গণমাধ্যম। যেকোন গণতন্ত্রিক রাষ্ট্রে মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করা হয়, আর এর ব্যতিক্রম ঘটলে গণমাধ্যমগুলো সরব ও সোচ্চার হয়ে উঠে।

বাংলাদেশের তৃণমূলে মানবাধিকার লংঘনের ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করা গেলে এর কার্য্য পরিধির কথা আলোচনা করা সহজ হবে। যেমনঃ রাজনৈতিক অস্থিরতা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা নিয়ে এ্যামনেষ্টী ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এর প্রশ্ন উত্থাপন,-বিচার বর্হিভূত হত্যাকান্ড ও পুলিশ হেফাজতে নির্যাতন, ধর্মীয় সংখ্যালঘু বা আদিবাসীদের অধিকার সুরক্ষায় ব্যর্থতা, উগ্র মৌলবাদীতা ও ফতোয়া, মানবাধিকার ও সংবাদকর্মীদের নাজেহাল, ভূমিদস্যুতা, এবং বিরোধী দলীয় কর্মীদের হয়রানী, হত্যা, ধর্ষন ও ইভটিজিং এখন সমাজে নৈমিত্তিক ব্যাপার। গণমাধ্যমের বদৌলতে প্রত্যাহিক জীবনে ঘটে যাওয়া এ বিষয়গুলো আমাদের সামনে চলে আসে। এ ছাড়া অধিকার এমন আরো ১৫টি বিষয় চিহ্নিত করেছে যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য- রাজনৈতিক সহিংসতা, হরতাল, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, গার্মেন্টস শ্রমিকদের অধিকার, বিএসএফ কর্তৃক মানবাধিকার লংঘন, বিডিআর বিদ্রোহীদের আইন বর্হিভূত হত্যাকান্ডের মতো অভিযোগ ও রয়েছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মানবাধিকার বিষয়ে অজ্ঞতা এবং তা চর্চার অভাব এবং সংস্কৃতির কারনে সংকট ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে। জানুয়ারী ৮, ২০১১ জাতীয় প্রেসক্লাবে অধিকার প্রকাশিত এক বার্ষিক প্রতিবেদনে প্রকাশ-২০১০ সালে ১২৭ জন বিচার বর্হিভূত হত্যাকান্ডের শিকার, ২২০ জন রাজনৈতিক সংঘর্ষের শিকার, ১৭৪ জন আইন বর্হিভূত হত্যাকান্ডের শিকার, এগুলো বন্ধে সরকার তার অঙ্গীকার রক্ষায় ব্যর্থ বলে অধিকারের দাবী।

জানামতে, অধিকারের প্রকাশিত এ প্রতিবেদনে’র ভিত্তি হলো সারা বছর গণমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনাপুন্জের সমিষ্টিক সংগ্রহ, কিছু পর্যবেক্ষন ও সুপারিশমালা।

এর থেকে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়নে গণমাধ্যমের ভুমিকা সহজেই অনুধাবন করা যায়। সংবাদকর্মীদের প্রস্তুতকৃত প্রতিবেদনগুলো কিভাবে অধিকতর বস্তুনিষ্ট, তথ্যনির্ভর ও আইনানুগ করা যায় এর প্রক্রিয়া জানা এবং তা চর্চা করা। কারো অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে আমরা যেন অন্য কারো অধিকার কেড়ে না নেই। অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তি হয়ে আমরা যেন কারো অধিকার লংঘন না করি।

সময় স্বল্পতার কথা বিবেচনায় নিয়ে এবং বিদগ্ধ আলোচকদের চিহ্নিত বিষয়গুলোর উপর আলোচনার সুযোগ রেখে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান’র ২০০৫ সালে এক বক্তৃতার উদ্ধৃতি দিয়ে শেষ করবো। তিনি বলে ছিলেন “ আমরা সকলে জানি সমস্যাগুলো কি, আমরা সকলে জানি আমাদের অঙ্গীকারগুলো কি, এখন যা প্রয়োজন তা হলো আর শুধু ঘোষনা বা অঙ্গীকার নয়, কিন্তু ব্যবস্থা নেয়া, যে সমস্ত অঙ্গীকারগুলো আমরা এরই মধ্যে করেছি তার উপর”.

আমরা ও আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্নিল অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়নে এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে।

লেখক :
রিসার্চ ফেলো, সেন্ট পলস কলেজ, ইউনিভার্সিটি অব ম্যানিটোবা, ও নোটারী পাবলিক অব সাস্কাচুয়ান, কানাডা এবং সাবেক সভাপতি, কুমিল্লা প্রেসক্লাব ও কুমিল্লা সাংবাদিক ইউনিয়ন

Check Also

মিনি ওয়াক-ইন-সেন্টারের মাধ্যমে রবি’র গ্রাহক সেবা সম্প্রসারণ

ঢাকা :– গ্রাহক সেবাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে মোবাইলফোন অপারেটর রবি আজিয়াটা লিমিটেড সম্প্রতি মিনি ওয়াক ...

Leave a Reply