সরাইলের পল্লীতে প্রাইমারি স্কুলে বেহাল দশা! বিদ্যালয়ে ঝুলছে তালা : শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দেয় প্রাইভেট পড়ে: উপবৃত্তির টাকা উঠানো হয় কিন্ডার গার্ডেনের শিক্ষার্থী দিয়ে

আরিফুল ইসলাম সুমন, সরাইল
স্যার মাঝে মধ্যে স্কুলে আসেন। গত দুই মাস যাবত আসছেনই না। আমরা বই-খাতা নিয়ে স্কুলে এসে ঘুরে ফিরে বাড়িতে চলে যায়। চলতি বছরের মধ্যে স্কুলে এক মাসও কাশ হয়নি। আমরা পরীক্ষা দেয় স্থানীয় কিন্ডার গার্ডেনের কবির স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়ে। জাতীয় সঙ্গীত কি বুঝি না। স্কুলের মাঠে গোবর ও শুটকির কারণে খেলাধূলা হয় না। স্কুলে নতুন স্যার এসে ক’দিন পর আবার চলে যান। যেদিন স্যার স্কুলে আসেন, সেই দিন দুপুর হলেই স্কুল ছুটি দিয়ে চলে যান। স্কুলের স্যার আমাদেরকে কোনো পড়া দেন না। পড়ার কথা জিজ্ঞেস করলে স্যার বলেন- তোমরা প্রাইভেট পড়ছ। তাতেই চলবে। শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফুর্তভাবে বলে উঠলেন ‘আমরা স্কুলে নিয়মিত ক্লাশ চাই। ভালো স্যার চাই। আমরা পড়ালেখা শিখতে চাই’ গত সোমবার আপে করে কথাগুলো বলছিল ব্রা‏‏হ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার পাকশিমুল ইউনিয়নের প্রত্যন্ত অঞ্চল জয়ধরকান্দি পশ্চিম সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী। উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার উত্তর দিকে জয়ধরকান্দি গ্রাম। যোগাযোগ ব্যবস্থা শুষ্ক মৌসুমে পায়ে হেঁটে। আর বর্যাকালে নৌকায় চড়ে। বিশাল গ্রামটিতে দু’টি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়। কিন্তু শিক্ষার অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। শিক্ষার হার খুবই কম।
সোমবার সরেজমিন জয়ধরকান্দি পশ্চিম সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়টিতে চলছে দৈন্যদশা। শিক্ষক সঙ্কট ও নানাবিধ সমস্যায় শিক্ষার্থীদের ভবিষত জীবন ধ্বংসের পথে। বিদ্যালয়ে দুই শতাধিক শিক্ষার্থী। কিন্তু পাঠদানের জন্য পাঁচ জনের স্থলে রয়েছেন মাত্র একজন শিক্ষক। দুই মাস যাবত বিদ্যালয়ে ঝুলছে তালা। শিক্ষার্থীরা ঘুরে ফিরে বাড়ি চলে যাচ্ছে। পড়ালেখা নেই। বিদ্যলয়ের মাঠে শুকানো হচ্ছে সুটকী ও গোবরের তৈরী লাকড়ি। বেশক’জন অভিভাবক ক্ষোভে প্রকাশ করে বলেন, সরকার স্কুল নির্মাণ করেছেন। কিন্তু শিক্ষক নেই। বছরের আট মাসই স্কুল বন্ধ থাকে। ছেলে-মেয়ের লেখাপড়া হয় না। বিচ্ছিন্ন এলাকা হওয়ায় একে একে শিক্ষকরা টাকার বিনিময়ে বদলি নিয়ে চলে যান। বিদ্যালয় বন্ধ থাকলেও কাগজে-কলমে উপবৃত্তি কার্যক্রম ঠিকই রয়েছে। অভিভাবকেরা এজন্য বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদ, গ্রামের কিছু প্রভাবশালী লোক ও প্রাথমিক শিক্ষার কর্তাব্যক্তিদের ঘুষ বাণিজ্যকে দায়ী করছেন। গ্রামের একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিদ্যালয়ের দাতা সদস্য গ্রামের বাসিন্দা ও সাবেক চেয়ারম্যান মুফতি আলী আজম স্কুলে প্রভাব খাটিয়ে যাচ্ছেন। তার হাতে বিগত দিনে স্কুলের বেশ’জন শিক্ষক-শিক্ষিকা নাজেহাল হয়েছেন। তিনি বিদ্যালয়ের চেয়ার, টেবিল ও বেঞ্চ নিয়ে গ্রামের সালিশ-বৈঠক পরিচালনা করেন। তার ভাইয়ের বাড়িতে এখনো স্কুলের মালামাল পড়ে আছে। তিনি কারণে-অকারণে শিক্ষকদের শাসিয়ে যেতেন। এতে তারা দারুনভাবে ক্ষুব্ধ হন। পরে এখান থেকে চলে যান। তবে মুফতি আলী আজম এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

বিদ্যালয় ঘুরে দেখা যায়, পুরাতন চারটি ভবনে জরাজীর্ণ অবস্থা। নোংরা পরিবেশ। চারিদিকে র্দূগন্ধ ছড়াচ্ছে। মাঠে ১০/১২ জন শিক্ষার্থী বই-খাতা নিয়ে খেলাধূলা করছে। কেউ বাড়িতে যাচ্ছে, আবার আসছে। স্কুলের নতুন ভবনের সবগুলো কক্ষেই ঝুলছে তালা। নেই জাতীয় পতাকা। খোলা জানালা দিয়ে করে ভিতরে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের সবগুলো বেঞ্চ জড়ো করে রাখা হয়েছে। নলকূপটি অকেজো। টয়লেটটি পড়ে আছে অযতেœ অবহেলায়। খেলার মাঠের অবস্থা দেখে মনে হয় যেন গোয়াল ঘর। জানা যায়, বিদ্যালয়টি ১৯৬৯ সালে স্থাপিত হয়। বিদ্যালয়ের আসবাবপত্র এলাকার লোকজনের বাড়িতে ব্যবহার হচ্ছে। বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রী মমতা ও পারমিন আক্তার বলেন, এই বছরে মোট এক মাসও কাশ হয়নি। তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রী নাজমা আক্তার বলেন, স্যার মাঝে মধ্যে স্কুলে আসেন। দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্র আকরাম ও শফিকুল হাসান জানায়, ২/৩ মাস যাবৎ বিদ্যালয় বন্ধ। স্যার আসে না। পড়া লেখা হয় না। বিদ্যালয়ে পতাকা উড়ে না। জাতীয় সঙ্গীত বুঝি না। আমরা কিন্ডার গার্ডেনের কবির স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়েই পরীক্ষা দেয়। দূর্গন্ধের জন্য কাশে বসতে খুব অসুবিধা হয়। আমরা শিক্ষক চাই। নিয়মিত কাশ চাই। পড়তে চাই, সেই ব্যবস্থা করে দেন। বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা পর্ষদের সদস্য মো: শওকত আলী, আলী আকবর ও আবদুল বারি সহ এলাকার লোকজন অভিযোগ করেন- ৫/৬ মাস যাবৎ স্কুলটি বন্ধ। উপজেলা ও জেলার প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের কর্তাব্যক্তিরা ঘুষের বিনিময়ে শিক্ষকদের অন্যত্র বদলি করিয়ে নিয়ে যান। আমাদের ছেলে মেয়ের কথা চিন্তা করার তাদের সময় নেই। উপজেলা প্রশাসনের কোন কর্মকর্তা বিদ্যালয়টির খোঁজখবরও নেন না। এভাবে আর কত দিন। প্রয়োজনে সরকার স্কুলটি উঠিয়ে নিয়ে যাক। তারা আরো জানান, কিন্ডার গার্ডেনের শিক্ষার্থী দেখিয়ে উপবৃত্তির টাকা উত্তোলন করা হচ্ছে। বিদ্যালয় বন্ধ থাকলেও জুলাই মাসে ৯৬ জন, আগস্ট মাসে ৮১ জন ও সেপ্টেম্বর মাসে ৭১ জনকে মোট ২৪ হাজার ৮শ’ টাকা উপবৃত্তি প্রদান করা হয়েছে। চুন্টা কাস্টারের সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা জয় কুমার হাজরা বিদ্যালয় পরিদর্শনে একবারও আসেননি।
বিদ্যালয়ের একমাত্র সহকারী শিক্ষক মাসুদ আলীম রাণা বলেন, আমাকে একাই স্কুল চালাতে হচ্ছে। সহকারী শিক্ষিকা ফারজানা ইসলাম মাতৃত্বকালীন ছুটিতে রয়েছেন। তিনি ডিসেম্বর মাসে যোগদান করবেন। প্রধান শিক্ষকের পদটি শূন্য। অফিসিয়াল কাজ সম্পূর্ণ করতে নিয়মিত ক্লশ নেওয়া সম্ভব হয় না। সকালের নৌকায় স্কুলে আসি। তিনটার মধ্যে যেতে হয়। দেরীর কারণে নৌকা না পাওয়া গেলে গ্রামের মসজিদে রাত্রি যাপন করতে হয়। বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি মো. সিরাজুল ইসলাম শিক্ষক সঙ্কট ও নানা অনিয়মের কথা স্বীকার করে বলেন, এভাবে একটা বিদ্যালয় চলতে পারে না। বিষয়টি বহুবার উপজেলা শিক্ষা অফিসে জানানো হয়। তারা কোনো কর্ণপাতই করেন নি।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মমতা কর্মকার বলেন, বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে একজন শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগপ্রাপ্ত অন্য জেলার দুইজন শিক্ষিকাকে ওই বিদ্যালয়ে পোস্টিং দেয়া হয়েছিল। পরে তারা সরকারী বিধি মোতাবেক নিজ জেলায় বদলি নিয়ে চলে গেছেন। প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। সেখানে কেউ যেতে চান না। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু সাফায়াত মোহাম্মদ শাহেদুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে এই ধরনের অনিয়ম মোটেও সহ্য করা হবে না। আমি দ্রুত ব্যবস্থা নিব।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply