অচিন দরিয়ায় কঠিন হাল ধরেছে শিশু সুমন

নৌকার বৈঠা আঁকড়ে ধরে আছে শিশু সুমন ---কুমিল্লাওয়েব
আরিফুল ইসলাম সুমন, সরাইল থেকে::
অজানা এক পথের মুসাফির শিশু সুমন। গ্রামের স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্র সুমন এখন নৌকার মাঝি। পিতৃ বিয়োগ ও সংসারের অভাব-অনটনই ওই শিশুটিকে ঠেলে দিয়েছে এই কঠিন পথে। ছেলেটির স্বপ্ন ছিল পড়ালেখা করে বড় হয়ে পুলিশে চাকুরি করার। কিন্তু শিশু সুমনের এই স্বপ্ন ভেঙ্গে দিল অভিশপ্ত দারিদ্রতা। দু’মুঠো ভাতের জোগান দিতে রোদ-বৃষ্টি উপো করে সারাদিন আঁকড়ে ধরে থাকে ইঞ্জিন দ্বারা চালিত নৌকার বৈটায়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার চুন্টা ইউনিয়নের ঘাগড়াজুর গ্রামের মৃত আমির ইসলামের পুত্র শিশু সুমন। ভাই বোনদের মধ্যে সবার ছোট সে। মাতা গৃহিনী।
গত বুধবার চুন্টা নৌকা ঘাটে শিশু সুমনের সঙ্গে কথা হয়। সুমন তার নিজের কথা বলতে গিয়ে জানান, ক’বছর আগে পিতা মারা যায়। সংসারের হাল ধরেন বড় ভাই ওলি মিয়া (২২)। তিনি নৌকা চালান। সুমন গ্রামের রেজি: প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শেণীর ছাত্র। অভাবের সংসার। ছোটবেলা থেকেই অর্ধউপোসে দিনাতিপাত করছে। নিজের পছন্দের জামা-কাপড় কখনো ভাগ্যে জুটেনি। পড়ালেখার খরচের জোগান দিতে পারছে না ভাই ওলি। ঘরে খাবার নেই। তাই স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়ে নৌকায় ভাইকে সহযোগিতা করছি। এতে সংসারে কিছু টাকা বাড়তি আয় হচ্ছে। সারাদিন রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে এমন কঠিন কাজ করতে অসুবিধা হয় না। এমন প্রশ্নের জবাবে- শিশু সুমন বলেন, খুব কষ্ট হয়। তারপরও উপায় নেই। কারণ কর্ম না করলে ভাত নেই। সুমন আক্ষেপ করে বলেন, বই-খাতা নিয়ে স্কুলের যেতে তার প্রবল ইচ্ছে করে। তাদের নৌকায় যদি বই-খাতা নিয়ে কোন স্কুলপড়–য়া ছাত্র-ছাত্রী চড়ে, তাদের দিকে শুধু চেয়েই থাকে সুমন। প্রবল ইচ্ছে থাকা সত্বেও আর পড়ালেখার কথা ভাবতেই পারে না সেই ছোট্ট ছেলেটি। শিশু বয়সে এমন চাপ সুমনের জীবন চলার পথকে আরো কঠিন করে দিয়েছে। সুমন তার ভবিষৎত স্বপ্ন সম্পর্কে জানান, স্কুলে পড়ার সময়ে বন্ধুদের নিয়ে প্রায়ই চোর-পুলিশ খেলা খেলতো। সে সবমসয়ই পুলিশের ভূমিকায় খেলতো। কারণ তার ইচ্ছে বড় হয়ে পুলিশ হবে।
শিশু সুমন তার দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কে জানান, টাকা-পয়সা থাকলে আমিও পড়তে পারতাম। অনেক সময় পেটের ক্ষুধায় মাথা চক্কর মারে। তখন পড়ার কথা ভুলে যায়। বেঁচে থাকার চিন্তায় বর্তমানে বড় ভাইয়ের সাথে নৌকা চালায়। দিন শেষে বাড়ি ফিরি। সাবান ছাড়াই হাত মুখ ধুই। পড়নের সেন্ডেল নেই। রাতে পা মুছেই ঘুমিয়ে পড়ি। কখন যে সকাল হয় বলতে পারি না। ডাক পড়ে নৌকায় আসার। তখন খুবই কষ্ট লাগে। আর একটু ঘুমোতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু সেই সুযোগ আমার ভাগ্যে জুটে না। অনেকের অন্তত শুক্রবার সাপ্তাহিক বন্ধ পান। আমার তাও নেই। নৌকার মাঝি বড় ভাই ওলি মিয়ার কাছে সুমন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বর্তমানে সবকিছুর-ই দাম চড়া। আমার একা রোজগারের টাকায় আর সংসার চলছে না। ছোট ভাই সুমন সঙ্গে থাকায় বাড়তি কিছু টাকা আয় হচ্ছে। টাকা-পয়সার অভাবে নিরুপায় হয়ে সুমনের পড়ালেখা বন্ধ করতে হয়েছে। একটু সুবিধা পেলে সুমনকে আবার স্কুলে পাঠাব।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply