দেবিদ্বারে হিল্লা বিয়ে নিয়ে তোলপাড়

মোঃ ফখরুল ইসলাম সাগর, দেবিদ্বার প্রতিনিধি :

‘হিলা বিয়ে’ মানিনা, যে বিয়েতে অন্য একজনের সাথে তিন মাস তের দিন সংসার করে আবারো পুরনো স্বামীর সংসারে আসতে হবে, এটা আমার পক্ষে সম্ভব নয়, এর চেয়ে মৃত্যু ভালো। রাগের মাথায় দেয়া তালাক বৈধ হলে, আদালতের মাধ্যমে তার সমাধান করুন। সরকার হিলা, দোররা ফতোয়া অবৈধ করেছে। এজাতীয় কিছু করার চেষ্টা করলে আইনের আশ্রয় নেব। কথাগুলো বললেন কুমিলা দেবিদ্বার উপজেলার সীমারকান্দা গ্রামের গৃহবধূ রীনা আক্তার(৩০)।

গত বৃহস্পতিবার ওই গৃহবধূর স্বামী মিজানুর রহমান(৩৫) পারিবারিক কলহের জের ধরে তার স্ত্রী রীনা আক্তারকে তালাক দেয়। বিষয়টি নিয়ে এলাকার লোকজন শুক্রবার জরুরি বৈঠকে বসেন। মোঃ রোশন আলী(৭৫)’র সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সালিসের সিদ্ধান্তানুযায়ী ইসলামিয়া শরিয়া অনুযায়ী অনাকাঙ্খীত ঘটনার সমাধানে মতামতের জন্য চার সালিসদারকে ধামতী আলীয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা আলহাজ আব্দুল হালিম পীর সাহেবের কাছে পাঠানো হয়। ওই চার ব্যক্তি তালাক প্রাপ্তা গৃহবধূর স্বামী মিজানুর রহমান(৩৫), ভাসুর মোহাম্মদ আলী(৪৫), প্রতিবেশী আব্দুল মালেক(৬৫) ও নজরুল ইসলাম(৫৫) ধামতী আলীয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা আলহাজ আব্দুল হালিম পীর সাহেব’র মতামত ও সিদ্ধান্তের আলোকে এলাকায় এসে গ্রাম বাসীদের নিয়ে সন্ধ্যায় আবারো বৈঠকে বসেন। বৈঠকে সালিসদাররা জানান, আমাদের বক্তব্য শোনে হুজুর তালাক বৈধ বলে স্বীকৃতী দিয়েছেন। এর সমাধান ইসলামী শরিয়া মতে একমাত্র ‘হিলা বিয়ে’। যেহেতু ‘হিলা বিয়ে’ সরকারি আইনে নিষিদ্ধ, সেহেতু আপনারা পারিবারিক ভাবে বসে ওলামা একরামদের নিয়ে তার সমাধানের ব্যবস্থা করুন।

ওই সিদ্ধান্তের আলোকে ভাসুর মোহাম্মদআলী জানান, হুজুরের সিদ্ধান্তানুযায়ী তালাক বৈধ হয়েছে, ইসলামিয়া শরিয়ানুযায়ী এর সমাধান ‘হিলা বিয়ে’র বিকল্প নেই। তা না হলে কাবিন নামার ধার্যকৃত একলক্ষ টাকার অর্ধেক দিয়ে তাকে বিদায় করতে হবে। তবুও আমরা পারিবারিক ভাবে বসে বিকল্প কি করা যায় এ ব্যাপারে রাতের মধ্যেই সিন্ধ্যান্ত নেব।

কিন্তু ওই সিদ্ধান্ত মানতে নারাজ তালাক প্রাপ্তা গৃহবধূ রীনা আক্তার। তার দাবি হিলা বিয়ে কুসংস্কার, অনেকে হিলা বিয়ে করে ফেরত দেয় না, আমার দু’পুত্র সন্তান সীমারকান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র মোঃ রিফাত হোসেন(১০) ও শিশু শ্রেণীর ছাত্র মোঃ সিফাত হোসেন হৃদয়(৪)’র পিতার- মাতা পরিচয়ে কলঙ্কের প্রলেপ দিতে চাই না। আমাদের বিয়ে কোর্টের মাধ্যমে হয়েছে, আজকের সমাধানও কোর্টের মাধ্যমে চাই, তবে বিবাহ বিচ্ছেদ নয়।

গৃহবধূ রীনা আক্তারের শাশুরী জানান, বিষয়টি ছোট ঘটনা, গ্রামের কিছু লোক আমাদের পরিবারের মান সম্মান ক্ষুণœ করতে বিষয়টিকে অনেক বড় করে দেখিয়েছেন। রাগের মাথায় তালাক দিয়েছে, বাইন তালাকও বলে নাই, তওবা পড়িয়ে সংসার করা যায়, এটাকে নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক করা, মোলাদের কাছে দৌর-ঝাপ উদ্দেশ্য প্রনোদীত।

গৃহবধূ রীনা আক্তারের পিতা তিতাস উপজেলার দুলারাম্পুর গ্রামের সফিকুল ইসলাম জানান, প্রায় ১৩বছর আগে আমার মেয়ের সাথে মিজানের বিয়ে হয়, বিয়ের পর থেকে পারিবারিক কলহ নিয়ে অনেক সালিস হয়েছে, মেয়েটা এখানে শান্তিতে নেই। এখন কি করব বুঝে উঠতে পারছিনা। তার শ্বশুর পরিবারের লোকজন হিলা বিয়ে দিতে চায়। অন্যথায় বিয়ের কাবিন নামার এক লক্ষ টাকার মধ্যে অর্ধেক টাকা দিয়ে মেয়েকে বিদায় করতে চাচ্ছে। গত দুদিন ধরে মেয়েকে গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছে। ঘর থেকে বের হতে দেয়া হয়না, কারোর সাথে কথা বলতে দেয়া হয়না।

সালিসদার আবু তাহের শেখ জানান, আমরা চারজন হুজুরের কাছে গিয়েছিলাম, হুজুর জানতে চেয়েছেন আমরা ‘লা’ মুজাবী’ নাকি ‘হানাফি’, লা’ মোজাবী’ হলে কোন মন্তব্য করবেন না, আর ‘হানাফি’ হলে তালাক বৈধ হবে। এর সমাধান একমাত্র ‘হিলা বিয়ে’, হিলা বিয়ে রাষ্ট্রীয় আইনে নিষিদ্ধ, তাই আপনারা বসেই সিদ্ধান্ত নেবেন। এখন আমরা বিব্রত, কোন সিদ্ধান্তে যাব।

এব্যপারে অসুস্থ থাকার কারণে ধামতী আলীয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা আলহাজ আব্দুল হালিম পীর সাহেব’র সাথে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

দেবিদ্বার থানার কর্মকর্তা ইনচার্জ(ওসি সার্বিক) স্বপন কুমার না- জানান, তালাকের ঘটনায় যদি কেউ রাষ্ট্রীয় আইনে নিষিদ্ধ হিলা বিয়ে দিতে চায়, তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে এব্যপারে লিখিত বা মৌখিকভাবে কেউ প্রতীকার চায়নি। প্রতীকার চাইলে ব্যবস্থা নেব।

Check Also

নিউইয়র্কের চিকিৎসক ফেরদৌস খন্দকারে দেওয়া খাদ্য পাচ্ছে দেবিদ্বারের ১ হাজার পরিবার

দেবিদ্বার প্রতিনিধিঃ করোনা ভাইরাস পরিস্থিতিতে লকডাউনের কারনে কর্ম হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছে দেশের হাজার হাজার ...

Leave a Reply