লাকসামে ভাঙ্গারি ব্যবসার আড়ালে চোরাই মালামালের রমরমা ব্যবসা

লাকসাম প্রতিনিধি :

ভাঙ্গারি ব্যবসার আড়ালে কুমিলা¬র লাকসামে চোরাই মালামালের রমরমা বাণিজ্য জমে উঠেছে। ভাঙ্গারি মালামাল সংগ্রহে শিশু, নেশাগ্রস্থ যুবক-যুবতী ও মহিলাদের ব্যবহার এবং কারখানার অভ্যন্তরে পতিতাবৃত্তিসহ অনৈতিক কার্যকলাপ চলছে। ভাঙ্গারি ব্যবসায়িরা একশ্রেণীর দুষ্টচক্রের যোগসাজসে মদ, গাঁজা, ফেন্সিডিল, পতিতাবৃত্তিসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ড দেদারছে চালিয়ে যাচ্ছে। আইন-শৃংখলা পরিস্থিতিতে এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন মাঝে-মধ্যে অভিযান চালালেও অবস্থা তথৈবচ!

অভিযোগ উঠেছে, লাকসামে ভাঙ্গারি ব্যবসার আড়ালে চোরাই মালে রমরমা বাণিজ্য জমে উঠেছে। ভাঙ্গারি মালামাল সংগ্রহে শিশু, নেশাগ্রস্থ যুবক-যুবতী ও মহিলাদের ব্যবহার এবং একশ্রেণীর দুষ্টচক্রের যোগসাজসে কারখানার অভ্যন্তরেই মদ, গাঁজা, ফেন্সিডিল বিক্রি ও নেশার আসর এবং পতিতাবৃত্তিসহ অনৈতিক কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছেন এক শ্রেনীর ভাঙ্গারি ব্যবসায়ী। পুলিশ এসব নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কদাচিৎ অভিযানে নামলেও অবস্থার তেমন উন্নতি নেই।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগে জানা যায়, শিশুশ্রম আইন অমান্য করে ভাঙ্গারি ব্যবসায়ীরা ৬/৭ বছরের শিশু টোকাই, নেশাখোর, মহিলা চোর ও চোর সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাসাবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি দপ্তরসহ নির্মাণাধীন ভবনের চুরিকৃত মালামাল গুদামজাত করে ঢাকা-চট্টগ্রামের ইস্পাত কারখানাসহ বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করে। একেকজন ভাঙ্গারি ব্যবসায়ীর আওতাধীন বেতনভুক্ত ২৫/৩০ জন টোকাই ও মহিলা দিনের বেলায় পরিত্যক্ত কাগজ, পা¬স্টিক সামগ্রী ও এলুমিনিয়াম কুড়ানোর অজুহাতে বিভিন্ন নির্মাণাধীন ভবন ও বাসাবাড়ি টার্গেট করে। রাতের বেলায় এসব টোকাই চোর চিহ্নিত স্থানে হানা দিয়ে মূল্যবান লৌহজাত নির্মাণ সামগ্রীসহ বসতবাড়িতে ব্যবহৃত নিত্যপ্রয়োজনীয় ও মূল্যবান জিনিষপত্র চুরি করে ভাঙ্গারি ব্যবসায়ীদের কাছে পৌঁছে দেয়। বেতনভুক্ত ও ভ্রাম্যমান এসব টোকাই এবং মহিলা চোরেরা চুরিকৃত ইলেকট্রিকের তার, ট্রান্সফর্মার, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, টেলিফোনের ক্যাবল, টিউবওয়েল, ব্রিজের এ্যাঙ্গেল, এলুমিনিয়াম তার, পানির মোটর, ভাঙ্গা ঢেউটিন, লোহার রড, গাড়ির যন্ত্রাংশ, রেলের হুক, পা¬ষ্টিক পাইপ, তামার তার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বেঞ্চের লোহার ফ্রেম, কাঁটা তারের বেড়া, বসতবাড়ির হান্ডি-পাতিল, থালাবাসন, জগ, বালতি, ঘটি-বাটিসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় ও মূল্যবান মালামাল নামমাত্র মূল্যে ভাঙ্গারি ব্যাবসায়ীদের নিকট বিক্রি করে। এসব মালামাল গুদামজাত করে সুযোগ মতো গাড়ি ভর্তি করে ঢাকা-চট্টগ্রামের বিভিন্ন ইস্পাত কারখানাসহ বিভিন্ন মোকামে মোটা অংকে বিক্রি করে। লাকসামের বেশিরভাগ ভাঙ্গারি কারখানা বড় বড় সড়কগুলোর পাশে। অভিযোগ রয়েছে, মালামালের বিশাল স্তুপের বিভিন্ন ভাঙ্গারি প্রতিষ্ঠানকে নিরাপদ মনে করে এখানে রাতে মদ, গাঁজা, ফেন্সিডিল ব্যবসাসহ মাদকের আসর চলে।

অভিযোগে আরো জানা যায়, কোনো কোনো ভাঙ্গারি কারখানার অভ্যন্তরেই মহিলা চোর দ্বারা পতিতাবৃত্তি চলছে অহরহ। তাদের খদ্দেরের বেশিরভাগই একশ্রেণীর ট্রাক ও রিক্সার ড্রাইভার। এভাবে এখানকার একাধিক ভাঙ্গারি ব্যবসায়ী রাতারাতি কোটিপতি বনে যাওয়ার দৃষ্টান্তও রয়েছে। তম্মধ্যে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, এমএম পা¬স্টিক -এর ভাঙ্গারি কারখানার বিরুদ্ধে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মচারী জানান, ‘এমএম পা¬ষ্টিক কারখানার মালিক দীপংকর সাহা। ভাঙ্গারি ব্যবসার আড়ালে দেহ ব্যবসা, মদ, গাঁজাসহ বিভিন্ন অবৈধ কাজ আমাকে দিয়ে পরিচালনা করেন। অশিক্ষিত হওয়ায় সামান্য ৭ হাজার টাকা বেতন ছাড়া কিছুই পাই না’। তার অভিযোগের প্রেক্ষিতে লাকসামের দক্ষিণ বাইপাসে শান্তা কমপে¬ক্সের উত্তরে মেসার্স আফতাব টাইলস্ হাউজের পশ্চিম পার্শ্বে দীপংকর সাহা ও সুজিত সাহার যৌথ মালিকানাধীন এমএম পা¬ষ্টিক -এর ভাঙ্গারি কারখানায় সরেজমিন গিয়ে দেখা যায় উন্নতমানের বিশাল গেইট। বাইরে থেকে কেউ ভয়েও এ গেইট খুলে ভেতরে প্রবেশ করবে না। বেশ কিছু সময় অপেক্ষার পর গেইট খুলে দেয়া হলে ভেতরে প্রবেশ করার পর সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে ভাঙ্গারি ব্যবসায়ীরা রাঙ্গা চোখে অসংযত আচরণ করেন। এমএম পা¬ষ্টিক -এর ভাঙ্গারি কারখানার পৌরসভার ট্রেড লাইসেন্স ও পরিবেশ দুষণ ছাড়পত্র থাকার কথা বললেও দেখাতে পারেনি। বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মালিকদ্বয়ের অসংলগ্ন কথাবার্তায় অভিযোগের সত্যতা ফুটে ওঠে। এক পর্যায়ে হুমকি দিয়ে এমএম পা¬ষ্টিকের অপর মালিক সুজিত সাহা বিভিন্ন দলের নেতৃবৃন্দের দোহাই দিয়ে বলেন, ‘এসব বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ করলে আমরা অন্য রকম চিন্তা করবো প্রয়োজনে উপরের লেভেলে যোগাযোগ করবো’।

সম্প্রতি নেশা ও নারী নিয়ে পূর্তিকালে উক্ত স্থানে পুলিশ আসার সংবাদ পেয়ে মোটর সাইকেলযোগে তড়িঘরি পালানোকালে পূর্ব লাকসামের টুকু মিয়ার ছেলে কলা ব্যবসায়ী সহিদ (৩৫) নামে এক ব্যক্তি নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। গত ক’দিন পূর্বে উক্ত কারখানার অদূরে দক্ষিণ বাইপাস এলাকার সাহাদাত হোসেন জসিমের নির্মাণাধীন ভবনের ২ ব্যান্ডেল রডসহ ২২ হাজার টাকা মূল্যের বৈদ্যুতিক ক্যাবল চুরি হয়। এছাড়াও পৌর সদরের বিভিন্ন স্থানে হর-হামেশা চুরির ঘটনা ঘটছে।

লাকসামের এসব ভাঙ্গারি ব্যবসায়ীদের গুদামে থানা পুলিশ প্রশাসন নিয়মিত অভিযান চালালে মদ, গাঁজা, ফেন্সিডিল ও পতিতাবৃত্তির মতো ব্যবসাসহ জনসাধারণের বাসাবাড়ি ও প্রতিষ্ঠানের মূল্যবান জিনিষপত্র চুরি বন্ধ হতো বলে ভুক্তভোগিরা জানিয়েছেন। তারা আরো জানান, থানায় কোনো অভিযোগ নিয়ে গেলে বাদীকে টাকা দিতে হয় এবং বাড়তি ঝামেলায় পড়তে হয়। এ কারণে ৫/১০ হাজার টাকা মূল্যের খোয়া যাওয়া মালের জন্য অভিযোগ নিয়ে সাধারণত কেউ থানায় যায় না। তাছাড়া, ভাঙ্গারি ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নিলে লোহজাতসহ বিভিন্ন মূল্যবান সামগ্রী চুরি অনেকটা হ্রাস পেতো।

এ ব্যাপারে লাকসাম থানার ওসি মোঃ আবুল কাশেম চৌধুরী জানান, অতীতের বিভিন্ন সময় ভাঙ্গারি দোকানে অভিযান চালানো হয়েছে। তাছাড়া, অভিযোগের ভিত্তিতে ভাঙ্গারি ব্যবসায়ীদের থানায় ডেকে এনে চোরাই মালামালক্রয়সহ অনৈতিক কার্যকলাপ না করার জন্য সতর্ক করে দেয়া হয়েছে। অভিযোগ পেলে আবারো আমরা এ্যাকশনে যাবো।

Check Also

লাকসাম-মনোহরগঞ্জের বিএনপি’র সাবেক এমপি আলমগীরের জাতীয় পার্টিতে যোগদান

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ– কুমিল্লা-১০ (লাকসাম-মনোহরগঞ্জ) বিএনপি’র সাবেক এমপি এটিএম আলমগীর জাতীয় পার্টিতে যোগদান করেছেন। সোমবার জাতীয় ...

Leave a Reply