ডা. সজীবের রহস্যজনক মৃত্যু : থামছে না মায়ের আহাজারি

আরিফুল ইসলাম সুমন, সরাইল :

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের সন্তান ডা. সজীব আল ইসলামের মৃত্যুকে ঘিরে নানা রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। ঢাকার ধানমন্ডিতে বসবাসকারী ডা. সজীব প্রথমে নিখোঁজ দুই দিন পর ঢাকা ধানমন্ডির লেক থেকে তার লাশ উদ্ধার পুরো বিষয়টি ছিল পরিবারের লোকদের অজানা। স্ত্রী ফারিয়া হক মীম স্বামীর নিখোঁজ ও লাশ উদ্ধারের বিষয়টি তার শ্বশুরবাড়ির লোকদের জানান নি। লাশ দাফনের সময় সজীবের পরিবার খবর পান। সজীবের নিখোঁজ ও লাশ উদ্ধার পর্যন্ত স্ত্রী মীম তার বাবার বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। ধানমন্ডির বাসা ছিল তালাবদ্ধ। লাশ মর্গে রেখেই স্ত্রী মীম স্বামীর ভাড়া ফ্ল্যাটে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মালামাল নিয়ে এসে দরজায় তালা ঝুলিয়ে দেন। এরকম আরো বিষয় উল্লেখ করে নিহতের স্বজনরা জানান মৃত্যুর পুরো বিষয়টি রহস্যে ঘেরা ও পরিকল্পিত।

গতকাল ডা. সজীবের গ্রামের বাড়ি উপজেলার কুট্টাপাড়া গিয়ে দেখা যায়, পুত্রহারা মা আমেরিকা প্রবাসী খালেদা আক্তার মৃত ছেলের ছবি বুকে জড়িয়ে কাঁদছে। অসহায় মায়ের আর্তনাদে প্রতিবেশীরা চোখের পানি ধরে রাখতে পারছেন না। ক্রমেই ভারী হয়ে উঠছে কুট্টাপাড়া গ্রামের আকাশ বাতাস। স্বজনদের অনেকেই ঢুকরে ঢুকরে কাঁদছে। অনেকে নির্জন স্থানে দাঁড়িয়ে রুমাল দিয়ে চোখের পানি মুচছে। বাড়ির লোকজন জানান, গত ২৪ সেপ্টেম্বর শনিবার ছিল ডা. সজীব ও তার স্ত্রী মীমের প্রথম বিবাহ বার্ষিকী। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস ? সেই দিনই সজীবের লাশ ভেসে উঠলো ধানমন্ডির লেকে।

পারিবারিক সূত্র জানায়, প্রথম স্ত্রী নাফিজা মারা যাওয়ার পর গত ১ বছর আগে সজীব দ্বিতীয় বিয়ে করেন মীমকে। উচ্চ শিক্ষিত ফারিহা হক মীম ঢাকার রাজাবাজার এলাকার প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ফজলুল হক বেলালের কন্যা। বিয়ের পর সজীব ও মীম ধানমন্ডিতে ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে থাকতেন। মীম চলাফেরা ছিল উশৃঙ্খল। স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির কাউকে পাত্তা দিতেন না তিনি। এসব কারণে সজীবের পরিবারের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ তেমন ছিল না। পান্থপথের শমরিতা হাসপাতালে মেডিকেল অফিসার পদে চাকুরীরত ডা. সজীব ধনীর দূলালী স্ত্রী মীমের আনুষাঙ্গিক চাহিদা মিটাতে বেগ পেতে হতো। তাই উচ্চ বিলাসী মীম ধনাঢ্য পিতার সংসারের দিকে ঝুঁকে থাকতেন। অসহায় সজীব শ্বশুরবাড়ির লোকদের কাছে ছিলেন অবহেলিত। এদিকে পুত্র শোকে পাথর হয়ে পড়েছেন অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম। মা খালেদা আক্তার হাউমাই করে কেঁদে বলেন, হঠাৎ কেন জানি সজীবের কথা মনে হতেই খুব খারাপ লাগছিল। ২২ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার রাত ৯টা। সজীবের নাম্বারে ফোন করলাম। কথা শুনে মনে হল বিপদে আছে। আমি বললাম তোকে দেখতে ইচ্ছে করছে। আমার কাছে আয়। তোর সাড়া মুখে আমি চুমু খাব। তোর জন্য আমার বুক ধড়পড় করছে। তোকে মাছ খাওয়াবো। সজীব আমাকে বলল মা আমি ভাল আছি। আগামি ৩০ সেপ্টেম্বর আমি আসবো। সারাদিন তোমার সাথে থাকব। কম করে রান্না করিও। এটাই সজীবের সাথে আমার শেষ কথা। দেখাও হল না, মাছ খাওয়াও হল না। তিনি অভিযোগ করে বলেন, বিয়ের আগে মীমের সঙ্গে এক ধনাঢ্য পরিবারের যুবকের প্রেম ছিল। সজীব পরে বিষয়টি জেনেছেন। প্রায় দিনই মীম বাসার বাহিরে রাত্রি যাপন করত। সজীব এ বিষয়ে কিছু বললে তার শ্বশুরবাড়ির লোকজন এসে শাসিয়ে যেত। বাসায় দু’জনের ঝগড়াজাটি ছিল নিত্য দিন। চুন থেকে পান খসলে মীম চলে যেতেন পিতার বাড়িতে। শ্বাশুড়ি আছমা বেগম সজীবকে নির্যাতন করতেন। এই সুযোগে মীম জনৈক যুবকের সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন। পোশাক পরতেন আপত্তিজনক। এসব সজীব সহ্য করতেন না। বিষয়গুলো নিয়ে প্রতিবেশী লোকজন সমালোচনা করতেন। খালেদা বলেন, ময়না তদন্তের রিপোর্ট হাতে পেয়ে মামলা করবো। তারা প্রভাবশালী হওয়ায় রিপোর্টটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছেন। ডা. সজীবের ভাড়া বাসার গার্ড মোস্তফা জানান, সজীব স্যার অত্যন্ত ভাল মানুষ ছিলেন। কথা কম বলতেন। ওনার সাথে ৫ বছর ছিলাম। নেশা করতে কখনো দেখিনি। সজীবের বাসার কাজের ভূয়া ফরিদা বেগম জানান, সজীব স্যারের তুলনা হয় না। ম্যাডাম মীম বাসায় থাকতেন না। কলেজে চলে যেতেন। সন্ধ্যায় ফিরতেন। অনেক দিন রাতে ফিরতেন না। স্যার রাগ করতো না। শুধু চুপচাপ বসে থাকতেন। গত সোমবার(১৯ সেপ্টেম্বর) কাজ শেষে চলে আসি। ম্যাডাম মঙ্গলবারে যেতে বলেন নি। কিন্তু আমি মিসকল দেই। ম্যাডাম ফোন করে বলেন, তোমাকে আসতে হবে না। প্রয়োজন হলে বলব। শনিবার দিন স্যার মারা যাওয়ার খবর পায়।

এ বিষয়ে জানতে মীমের পরিবারে যোগাযোগ করলে শ্বাশুড়ি আছমা বেগম বলেন, তাঁর মেয়ের জামাতা মাদকাসক্ত ছিল। তাঁর ভাগ্য সে বেছে নিয়েছে। সজীবের শ্বশুর ফজলুল হক বলেন, মাদকাক্ততাই তার কাল হয়েছে।

Check Also

আশুগঞ্জে সাজাপ্রাপ্ত আসামির মরদেহ উদ্ধার

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি :– ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে মো. হারুন মিয়া (৪৫) নামে দুই বছরের সাজাপ্রাপ্ত এক আসামির ...

Leave a Reply