হিল্লা বিয়ে থেকে রক্ষা পেল সরাইলের সাবিনা

আরিফুল ইসলাম সুমন, সরাইল :
অবশেষে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের সাবিনা হিল্লা বিয়ে থেকে রক্ষা পেল। সাবিনা উপজেলার কালীকচ্ছ ইউনিয়নের মধ্যপাড়া গ্রামের ইউসুফ মিয়ার কন্যা ও সদর উপজেলার বুধল ইউনিয়নের মালিহাতা গ্রামের গৃহবধূ। প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপে পিছু হটেছে হিল্লা বিয়ে দেয়ার জন্য ফতোয়াদানকারী স্থানীয় মাওলানা ও গ্রাম্য মাতাব্বররা। লিখিত ফতোয়া প্রত্যাহার করে নিয়েছেন মাওলানা আবিদুর রহমান। আর ফতোয়ার রায় হিল্লা বিয়ে কার্যকর করার জন্য ব্যস্ত মাতাব্বররা গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছেন। সাবিনা ও তার স্বামী হারুন মিয়ার সংসারে এক মাস পর এখন শান্তি ফিরে এসেছে। সাবিনার তিন শিশুকন্যা সন্তান বাবাকে কাছে পেয়ে বেজায় খুশি। প্রশাসনের কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের কাছে কৃজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন সাবিনা ও হারুন।

গত দুই দিনে বিভিন্ন স্থানীয় ও জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে বিষয়টি নিয়ে নড়ে চড়ে বসেন প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা। ওই গ্রামের মাতাব্বররা শুরু করেন দৌড়ঝাপ। বুধবার দুপুরে মালিহাতা গ্রামে পৌছেন ব্র্যাকের মানবাধিকার আইন ও সালিশ কেন্দ্রের লোকজন।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিপন চাকমা, সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ আবদুর রব ও বুধল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ নূরুল হাসান আলম ফতোয়ার শিকার সাবিনা-হারুনের বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হন। তারা এলাকার গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও ইউপি সদস্যদের নিয়ে আলোচনা বৈঠকে বসেন। বৈঠকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন ব্যাখ্যা করেন। বৈঠকে উপস্থিত সবাইকে হারুন মিয়া জানান, তিনি রাগের মাথায় তার স্ত্রীকে তালাক দিয়েছেন। এখন তাকে নিয়ে সংসার করতে চান। এই বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রচলিত আইনের ব্যাখ্যা দেন। ব্যাখায় তিনি বলেন, রাগের মাথায় তালাক দিলে তালাক হবে না। তালাক দিলে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে নোটিশ দিতে হবে। ইউপি চেয়ারম্যান নোটিশ পেয়ে দু’পক্ষকে নিয়ে আলোচনায় বসবেন। সেখানে সমঝোতা না হলে ৯০ দিন পরে তালাক কার্যকর হবে। যেহেতু হারুন মিয়া ইউপি চেয়ারম্যানকে কোন নোটিশ দেননি সেহেতু তাদের তালাক হয়নি।

তিনি আরো বলেন এই বিষয়টি নিয়ে কেউ যদি প্রচলিত আইনের পরিপন্থী কোন কাজ করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। পরে নির্বাহী কর্মকর্তা স্বামী-স্ত্রীকে পূর্বের ন্যায় মিলে মিশে সংসার করার কথা বলেন। মালিহাতা গ্রামের সিরাজ মিয়া (৬০) ফতোয়া নিয়ে সর্দারদের বাড়াবাড়ি প্রসঙ্গে বলেন, “গোস্সা কইরা বউ ছাইরা হারুন অহন বেকায়দায়, কিছু সর্দার সর্দারি কইরা অহন পড়ছে ছিপায়, আর ফতোয়া দিয়া হুজুর অহন দৌড়ায়। গ্রামে এই কি আলামত শুরু অইছে।”

এ বিষয়ে গতকাল ফতোয়াদানকারী মালিহাতা মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক মাওলানা মোঃ আবিদুর রহমান বলেন, আমি আমার দেয়া ফতোয়া প্রত্যাহার করেছি। প্রশাসনের লোকজন গ্রামের গন্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে সাবিনা-হারুন দম্পতিকে মিলিয়ে দিয়েছেন।

বুধল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ নূরুল হাসান আলম বলেন, প্রচলিত আইনে তাদের তালাক হয়নি। গতকাল দুপুরে ইউএনও এবং ওসির উপস্থিতিতে আমি তাদেরকে মিলিয়ে দিয়েছি। সুন্দর করে সংসার করার কথা বলেছি।

ফতোয়ার শিকার সাবিনা ও হারুন মিয়া বলেন, প্রশাসনের ভূমিকায় আমরা খুব খুশী। ন্যায় বিচার পেয়েছি। আমরা প্রশাসন ও সাংবাদিকদের কাছে কৃতজ্ঞ। গৃহবধূ সাবিনার পিতা মো. ইউসুফ মিয়া বলেন, প্রশাসন ও মিডিয়ার সহযোগিতায় আমার মেয়ের জীবন রক্ষা হয়েছে। আমি সবার কাছে চিরকৃতজ্ঞ।

সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ আবদুর রব বলেন, প্রচলিত আইনে তাদের তালাক হয়নি। আমরা তাদেরকে মিলেমিশে সংসার করার কথা বলেছি। যদি কেউ প্রচলিত আইন অমান্য করে তাদেরকে হিল্লা বিয়ে দিতে চায়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।
সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, বিষয়টির সমাধান করে দিয়ে এসেছি। এই বিষয়টি নিয়ে কেউ বাড়াবাড়ি করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Check Also

আশুগঞ্জে সাজাপ্রাপ্ত আসামির মরদেহ উদ্ধার

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি :– ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে মো. হারুন মিয়া (৪৫) নামে দুই বছরের সাজাপ্রাপ্ত এক আসামির ...

Leave a Reply