ময়মনসিংহ ও কুমিল্লা বিভাগ চাই

আহ্সান-উল-করিম :

আহ্সান-উল-করিম
বাংলাদেশে জননিরাপত্তা, মানবাধিকার, গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও উন্নয়ণের জন্যে ক্রমঃবর্দ্ধমান সন্ত্রাস প্রধান অন্তরায়। এজন্যে পর্যায়ক্রমে সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণ আইন, জননিরাপত্তা আইন ও অপারেশন ক্লীন হার্টের আওতায় বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়। বর্তমানে ‘র‌্যাপিড একশন ব্যাটেলিয়ন (জঅই)’ দিয়ে ক্রমঃবর্দ্ধমান সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। সেমিনার/সভায় জঅই কর্ম-প্রক্রিয়া অগণতান্ত্রিক ও মানবাধিকার বিরোধী হিসাবে অভিযুক্ত হচ্ছে। অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো নিয়ম ও আইন লঙ্ঘনকারী এবং স্বৈচ্ছাচারী ও অমানবিক হিসাবে সমালোচিত হচ্ছে। ক্রমঃবর্দ্ধমান সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রিত না হওয়ার এর দায় সরকারের উপর পড়ছে। দীর্ঘ ১৮ বছরেও বিশেষ ব্যবস্থাগুলো সার্থক না হয়নি। এতে প্রতীয়মান হয় যে, ক্রমঃবর্দ্ধমান সন্ত্রাসের ভিত্তিকারণ বিদ্যমান। কেবল আইনী ব্যবস্থায় এর অবসান সম্ভব নয়। কিভাবে এ ক্রমঃবর্দ্ধমান সন্ত্রাসের অবসান সম্ভব-সেটাই এ নিবন্ধের আলোচ্য বিষয়।

রাষ্ট্রব্যবস্থা অসংখ্য অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিকসহ সকল প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়। এর মূলে রয়েছে প্রত্যেক্ষ বা পরোক্ষভাবে পারিবারিক, রাষ্ট্র-অবকাঠামো ও জাতীয় সরকারব্যবস্থার প্রতিষ্ঠান। এ তিনটি মৌলিক, সার্বজনিন ও সম্পুরক প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত প্রভাবের উপর রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বরূপ প্রধানতঃ নির্ভর করে। এ তিনটি বহুমাত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত প্রভাব গণতন্ত্রমুখী, স্বৈরমুখী ও সন্ত্রাসমুখী হলে রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বরূপ যথাক্রমে গণতন্ত্রমুখী, স্বৈরমুখী ও সন্ত্রাসমুখী হয়। এ তিনটি প্রতিষ্ঠানই গণতান্ত্রিক হলে রাষ্ট্রব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক হয়। উদার, নৈতিক ও সৃজনশীল চেতনা বিকাশের ধারা থাকায় রাষ্ট্র উচ্চমাত্রায় সম্মৃদ্ধিশীল হয়। ৯০% জনগোষ্ঠী মুসলমান হওয়ায় বাংলাদেশের পারিবারিক প্রতিষ্ঠান মূলতঃ সুষম-গণতান্ত্রিক। পলিমাটির কৃষি ও পরিবেশের বাঙালীত্ব, হাজার বছরের সুষম-গণতান্ত্রিক পারিবারিক প্রতিষ্ঠান এবং ১৯৫০-এর গণতান্ত্রিক ভুমি-সংস্কারের জন্যে বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থার ‘ব্যক্তিক প্রতিষ্ঠান’ বিশ্বের সেরা গণতান্ত্রিক। রাষ্ট্র-অবকাঠামো ও জাতীয় সরকারব্যবস্থা গণতান্ত্রিক হলেই বাংলাদেশ উচ্চমাত্রায় সম্মৃদ্ধিশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিনত হবে।

বৃহৎ এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র বিভাগ/অঞ্চল, জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন, ইত্যাদি উপ-এলাকায় ক্রমবিভক্ত। এ ক্রমঃবিভক্ত উপ-এলাকাগুলোর নিয়েই ‘রাষ্ট্র-অবকাঠামো প্রতিষ্ঠান’। এ উপ-এলাকাগুলোর ভিত্তিতেই রাষ্ট্র এলাকা ও জনগণ বিভজিত ও সমন্বিত হয়। এ উপ-এলাকাগুলোর ভিত্তিতেই সরকারী ও বেসরকারী অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক স্থানীয়/বিকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান-সংস্থা-কর্তৃপক্ষসমূহ গড়ে উঠে এবং জাতীয়ভাবে সমন্বিত হয়। এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রে কেন্দ্র-বিভাগ, বিভাগ-জেলা ও/বা জেলা-উপজেলার সমন্বয়ের ভারসাম্য ১ ঃ ৯ হলে ‘রাষ্ট্র-অবকাঠামো’ ও ভিতরকাঠামোর রাষ্ট্রব্যবস্থা সবচেয়ে গণতন্ত্রমুখী হয়। অন্যদিকে সমন্বয়ের ভারসাম্য ক্রমশঃ ১ঃ ৫-এর নিচে বা ১ঃ ৯ এর উর্দ্ধে হলে রাষ্ট্র-অবকাঠামোর ও ভিতরকাঠামোর রাষ্ট্রব্যবস্থার যথাক্রমে ক্রমশঃ অধিকতর স্বৈরমখী বা সন্ত্রাসমুখী হয়। রাষ্ট্র-এলাকা ও জনতার প্রথম বিভক্তি হওয়ায় বিভাগ রাষ্ট্র-অবকাঠামোর ও ভিতরকাঠামোর রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্যে সবচেয়ে প্রভাবশীল (প্রায় দই-তৃতীযাংশ)। বিষয়টি গ্রেটবৃটেন-ফ্রান্স-জাপান-কোরিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে তা সহজেই অনুধাবন করা যাবে।

দ্বাদশ শতাব্দীর শেষভাগে কতিপয় বিভাগ/অঞ্চলে বিভক্তি ছাড়া জাপানকে ৬০টি জেলা ও প্রায় ৭০০টি উপজেলায় (জেলায় গড়ে ১১.৭টি উপজেলা) বিভক্ত করা হয়। এতে রাষ্ট্র-অবকাঠামো ও ভিতরকাঠামোর রাষ্ট্রব্যবস্থা শিথিল/সন্ত্রসমুখী হওয়ায় জাপান দরিদ্র ও সন্ত্রাসী রাষ্ট্রে পরিণত হয়। মেইজী সংস্কারামলে জাপানকে ৩০৩টি উপজেলা (১৮৭১) ও ৪৮টি জেলায় (১৮৮৮) পুনর্বিভক্ত এবং হোক্কাইডো জেলাকে অঞ্চলে উন্নীতসহ ৮টি অঞ্চলে (১৯০৫) পুনর্গঠন করা হয়। এতে জাপান প্রকারান্তে ৮টি অঞ্চল ও ৬০টি জেলায় বিভক্ত হয়। রাষ্ট্র-অবকাঠামো ও ভিতরকাঠামোর রাষ্ট্রব্যবস্থা গণতন্ত্রমুখী হওয়ায় জাপান উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধিশীল রাষ্ট্রে পরিণত হয়। সুদীর্ঘ সন্ত্রাসেরও দ্রুত অবসান হয়। ৯টি বিভাগ/অঞ্চলে বিভক্ত হওয়ায়/থাকায় প্রাচীন বোমরাষ্ট্র, গ্রেটবৃটেন (১৭০৭-১৮০১) ও দক্ষিণ কোরিয়া (১৯৬১) উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধিশীল রাষ্ট্রে পরিণত হয়।

ফরাসী বিপ্লবীরাও বিভাগ/অঞ্চলে বিভক্তি ছাড়াই সংলগ্ন ফ্রান্সকে ৮৩টি ডিপার্মেন্ট ও ১০৮৭টি ক্যান্টন (ডিপার্মেন্ট/জেলায় গড়ে ১৩.১টি ক্যান্টন/থানা) পুনর্গঠন করে (১৭৯০)। ‘রাষ্ট্র-অবকাঠামো’ চরম শিথিল/সন্ত্রাসমুখী হওয়ায় ফ্রান্স দ্রুত একটি বিশৃংঙ্খল/সন্ত্রাসী রাষ্ট্রে পরিণত হয়। নেপোলিয়নামলে এরান্ডেসিমেন্ট (মহকুমা) পুনপ্রতিষ্ঠাসহ ফ্রান্সকে ৯টি সামরিক শাসনাঞ্চলে বিভক্ত করা হয় (১৮০০)। সামরিকাঞ্চলে গড়ে ৯.২টি জেলা হওয়ায় রাষ্ট্র-অবকাঠামো গণতন্ত্রমুখী হয়। ফ্রান্সে বিশৃংঙ্খলা/সন্ত্রাস দ্রুত হ্রাস পায়। নেপোলিয়ন শাসনাবসানে সামরিক অঞ্চলগুলো বিলুপ্ত হওয়ায় ফ্রান্স আবার বিশৃংঙ্খল/সন্ত্রাসী রাষ্ট্রে পরিণত হয়। তবে পুনপ্রতিষ্ঠিত এরান্ডেসিমেন্ট অব্যহত থাকায় সন্ত্রাসের মাত্রা হ্রাস পায়। ১৯৪৬ সালে সংলগ্ন ফ্রান্সকে ১৮টি অঞ্চলে বিভক্ত করায় সন্ত্রাসের মাত্রা আরও হ্রাস পায়।

১৯৪৭ উত্তর ৪টি বিভাগ, ১৮টি জেলা (বিভাগে গড়ে ৪.৫টি জেলা) ও গড়ে ৬৮টি মহকুমা (জেলায় গড়ে ৩.৮টি মহকুমা) ভিত্তিক হওয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্র-অবকাঠামোর স্বৈরমুখী ছিল। এর ভিত্তিতে সরকারী ও বেসরকারী অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক, প্রশাসনিক, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান-সংস্থা-কর্তৃপক্ষসমূহের জাতীয সমন্বয় গড়ে উঠায় বাংলাদেশের ভিতরকাঠামোর রাষ্ট্রব্যবস্থাও স্বৈরমুখী ছিল। পূর্বের জাতীয় ও প্রাদেশিক-এ দ্বিস্তরের স্থলে স্বাধীনতোত্তর জাতীয় সরকারব্যবস্থা এককেন্দ্রিক ও একস্তরের হওয়ায় রাষ্ট্র-অবকাঠামোর স্বৈরমুখী প্রভাব বৃদ্ধি পায়। এতে জনজীবনের গণতান্ত্রিক অধিকার হ্রাস পেতে থাকে। দলীয় রাজনীতি সংঘাতমুখী হয়ে উঠে। সরকারী অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হারও পূর্বদশক থেকে স্বাধীনতোত্তর দশকে গড়ে ১% হ্রাস পায় (৪.৪% থেকে ৩.৪%)।

এ ধারার অবসান এবং গ্রেটবৃটেন-জাপান-কোরিয়ার মত বাংলাদেশকে ‘সমৃদ্ধিশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে’ রূপান্তরের জন্যে রাষ্ট্রবিশেষজ্ঞ ১৯৮২ সালের পুনর্গঠন/সংস্কার কমিটির কাছে ৪৮৭টি থানাকে মহকুমায়, ৭১টি মহকুমাকে জেলায় (জেলায় গড়ে ৬.৯টি মহকুমা) এবং বাংলাদেশকে ৯টি বিভাগে (বিভাগে গড়ে ৭.৯টি জেলা) প্রস্তাব রাখি। পরবর্তীতে ইউনিয়ন এলাকাকে ৯টি ওয়ার্ডে বিভক্তির (১৯৮৬) প্রস্তাব রাখি। বাংলাদেশকে ৪৯১টি থানা/উপজেলা ও ৬৪টি জেলায় (জেলায় গড়ে ৭.৭টি থানা/উপজেলা) পুনর্গঠিত করা হয়। তবে ৯টি বিভাগে বিভক্ত না করায় বিভাগ ও জেলার মধ্যে সমন্বয়ে ভারসাম্য শিথিল হওয়ায় (বিভাগে গড়ে ১৬.০টি জেলা) রাষ্ট্র-অবকাঠামো সন্ত্রাসমুখী হয়। এতে অনিয়মিক বেসরকারীখাতসহ বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সন্ত্রাসের চেতনা ও ধারা ক্রমঃবর্ধমান হয়।

১৯৪৭-৯২ পর্যন্ত ৪৫ বছর ৪টি বিভাগ থাকায় বাংলাদেশের বাজার অর্থনীতিক প্রতিষ্ঠান অগণতন্ত্রমুখী ছিল। এজন্যে বহু বিকল্প নীতিমালাতেও অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির স্থিতিশীল গড় হার প্রায় ৪%-এ আবদ্ধ ছিল। বরিশাল ও সিলেট বিভাগ গঠিত তথা বাংলাদেশ ৬টি বিভাগে বিভক্ত হওয়ায় ১৯৯৫ উত্তর ৮ বছরে এ প্রবৃদ্ধির গড় হারও ক্রমশঃ ৬.৩% এ উন্নীত হয়। ক্রমঃবর্ধমান সন্ত্রাসের ধারাও কিছুটা হ্রাস পায়। সম্প্রতি রংপুর বিভাগ গঠিত হওয়ায় জিডিপির গড় প্রবৃদ্ধির হার ৫ বছরে ক্রমশঃ ৭.৩% এ উন্নীত হবে। ৪টি জেলা নিয়ে সিলেট ও ৬টি জেলা নিয়ে বরিশাল বিভাগ। সুতরাং ৬টি জেলা নিয়ে ময়মনসিংহ ও কুমিল্লা বিভাগ গঠলে আর কোন যুক্তির প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশ ৯টি বিভাগে বিভক্ত হলে বাজার অর্থনীতিক প্রতিষ্ঠান সুষম ও প্রতিযোগী হওয়ায় উচ্চতর উৎপাদন, সুষম আয়-বন্টন ও বিনিয়োগ/পুঁজি বিকাশের ধারা দেবে। ৫ বছরেই জিডিপির স্থিতিশীল গড় প্রবৃদ্ধির হার ক্রমশঃ প্রায় ৯% এ উন্নীত হবে।

রাষ্ট্র-অবকাঠামো প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রাকৃতিক কাঠামো, বিধান, শক্তি ও প্রভাব দেয়। আইনী প্রতিষ্ঠান দিয়ে তা হ্রাস-বৃদ্ধি করা যায়, কিন্তু নিঃশেষ করা যায় না। ১৯৮৪ উত্তর বাংলাদেশ বর্তমান রাষ্ট্র-অবকাঠামো সন্ত্রাসমুখী হওয়ায় রাষ্ট্রব্যবস্থায় ক্রমঃবর্দ্ধমান অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সন্ত্রাসের ধারা অব্যহত রয়েছে। বাংলাদেশ ৯টি বিভাগে বিভক্ত হলে ক্রমঃবর্ধমান বহুমাত্রিক সন্ত্রাসের ধারা দ্রুত অবসান হবে। কমিশনার (ভুমি) ও পুলিশ রেঞ্জ (ডিআইজি) দপ্তরদ্বয় স্থাপন করা হলেই ময়মনসিংহ ও কুমিল্লা বিভাগ গঠনের ভিত্তি সম্পন্ন হয়। এতে বছরে সরকারের মাত্র ৬/৭ কোটি টাকা ব্যয বাড়বে। এত কিঞ্চিৎ ব্যয়ে ক্রমঃবর্ধমান বহুমাত্রিক সন্ত্রাসের ধারা দ্রুত অবসানসহ উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধিশীল রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার আর কোন বিকল্প পথ নেই।

-লেখক :
রাষ্ট্র বিশেষজ্ঞ, মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক সরকারী কর্মকর্তা। প্রগতিশীল গণতন্ত্র (১৯৯১) ও সংবিধান সংশোধনের দিক্গুলোর (২০১০) বইয়ের লেখক । [এমএসএস (অর্থনীতি) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৮২);
এমএস (পলিটিক্যাল ইকনোমি), এমএ (পাবলিক এ্যাফ্য়ার্স), ফেলো (পাবলিক পলিসি) টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়]।





Check Also

মিনি ওয়াক-ইন-সেন্টারের মাধ্যমে রবি’র গ্রাহক সেবা সম্প্রসারণ

ঢাকা :– গ্রাহক সেবাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে মোবাইলফোন অপারেটর রবি আজিয়াটা লিমিটেড সম্প্রতি মিনি ওয়াক ...

Leave a Reply